কোটা আন্দোলন

‘আমার পেটের বাচ্চা কারে বাপ ডাকব? আমি কেমনে মানুষ করমু ওরে?’

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৪, ১৬:৪০

১১ মাস আগে আসাদুল্লাহ (২৫) ও নুরানি খাতুন (২০) বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জীবিকার তাগিদে তারা ঢাকায় এসে দক্ষিণখান মাজার রোডে বাসা ভাড়া নেন। আসাদুল্লাহ লেগুনা চালাতেন। তাদের দাম্পত্য জীবনে নুরানি খাতুন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু হঠাৎ করেই সুখের পরিবারে নেমে এল অন্ধকার।

আসাদুল্লাহ শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়নের পশ্চিম চাউলিয়া গ্রামের জয়নুদ্দীনের ছেলে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) দুপুরে খাবার খেয়ে লেগুনা নিয়ে বাসা থেকে বের হন আসাদুল্লাহ। উত্তরার আজমপুর কাঁচাবাজারে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে গুলি লাগে তার। পরে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

আসাদুল্লাহর স্ত্রী নুরানি খাতুন বলেন, ‘আমার জামাই ড্রাইভার, লেগুনা চালাতো। এই আন্দোলন সম্পর্কে কিছুই জানত না। প্রতিদিন বাসা থেকে গাড়ি নিয়ে বের হত, সারাদিন গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরত। কারও সাথে তেমন মিশতো না। হঠাৎ করেই আমার জামাই মারা যাবে জানলে আমি সেদিন তাকে বাইরে যেতে দিতাম না। আমার আট মাসের সন্তান পেটে, কিছুদিন পরই বাচ্চা হবে। এখন আসাদুল্লাহ মারা গেছে। আমার সন্তানকে কে দেখবে? আমার জামাই কোনো পক্ষের ছিল না, সে শুধু গাড়ি চালাতো। কিছুদিন পর আমার বাচ্চা হবে, তার বাবাকে দুনিয়ায় পাবে না, কাকে বাবা ডাকবে? আমি কিভাবে মানুষ করব তাকে?’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিয়ে হয়েছিল এগারো মাস আগে। পরিবারের মতেই বিয়ে হয়। আমার স্বামীর কোনো দোষ ছিল না। এখন আমাকে আর আমার বাচ্চাকে কে দেখবে?’

আসাদুল্লাহর বাবা জয়নুদ্দীন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার ছেলে ঢাকার উত্তরায় লেগুনা চালাতো। হঠাৎ করে রাস্তায় উঠেছে আর পুলিশ চারটা গুলি করেছে। দুইটা গুলি দুই হাতে আর একটা পেটের সামনে দিয়ে লেগে পেছন দিয়ে বের হয়ে গেছে। আরেকটা নাভির নিচে। আমার ছেলে কোনো পক্ষের ছিল না। আমাদের নিজের কোনো বাড়ি নাই, তাই ছেলে ঢাকায় থাকতো। তার বউয়ের পেটে আট মাসের বাচ্চা, কিছুদিন পর বাচ্চা হবে। আর এখন আমার ছেলে নেই। আমার একটাই ছেলে ছিল। চার সদস্যের পরিবার ছিল আমাদের, কিন্তু এখন ছেলেই নেই।’

প্রতিবেশী সুরুজ আলী বলেন, ‘বৃহস্পতিবার আমাদের কাছে ফোন আসে আসাদুল্লাহ গুলি খেয়ে মারা গেছে। আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি। সে আমাদের এলাকার ভাইস্তা (ভাতিজা)। কোনো পক্ষে ছিল না, লেগুনা চালাতো। লেখাপড়া কোনোমতে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে, আন্দোলন কী জানে না। পেটের ভাত জোগাতে গাড়ি চালাতো। বছরখানেক আগে গ্রামে বিয়ে করে বউ নিয়ে ঢাকা গিয়েছিল, এখন লাশ হয়ে এলো। তার বউ আট মাসের গর্ভবতী, বাচ্চার মুখটাও দেখে যেতে পারল না আসাদুল্লাহ।’

শ্রীবরদী থানা পুলিশের ওসি কাইয়ুম খান সিদ্দিকী বলেন, শুক্রবার (১৯ জুলাই) আমরা ঢাকা থেকে গড়জরিপা ইউনিয়নের চাউলিয়া গ্রামে দুটি লাশ আসার সংবাদ পাই। পরে টিম পাঠিয়ে তাদের তথ্য নিয়েছি।

গড়জরিপা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গণমাধ্যমকে বলেন, আসাদুল্লাহ ঢাকায় লেগুনা চালাতো। কোটা সংস্কার আন্দোলনে গুলিতে মারা গেছে। আমি খবর পেয়ে তার জানাজায় গিয়েছি, পরে এলাকার লোকজনসহ তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তার স্ত্রী আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আমি জানিয়েছি, গর্ভবতী কার্ডসহ যে সুযোগ-সুবিধাগুলো দেওয়া যায় আমি দেব। তাদের যেকোনো সহযোগিতায় আমি পাশে আছি।

ইত্তেফাক/টিএইচ