সাম্প্রতিক সহিংতায় নিহত

খুলনার চার পরিবারে শুধুই কান্না

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৪, ০৪:৩০

কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঢাকায় সহিংস ঘটনায় পুলিশের গুলিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থীসহ চার জনের প্রাণ গেছে। এখন এই চার পরিবারে শুধুই কান্না আর স্বজন হারানোর বেদনা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন মুগ্ধ। পুরো নাম মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। ভালো খেলোয়াড়, গায়ক, সংগঠক হিসেবে গত চার বছর ধরে খুবি ক্যাম্পাসে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন তিনি। গণিতে স্নাতক শেষ করে গত মার্চে ঢাকায় যান। এমবিএতে ভর্তি হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি)।

মৃত্যুর মাত্র ১৫ মিনিট আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সড়কে ছোটাছুটি করছেন শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে হাতে পানিভর্তি বাক্স ও বিস্কুট নিয়ে ছুটছেন মুগ্ধ। ছাত্রদের ডেকে ডেকে বলছেন, ‘পানি লাগবে কারো, পানি?’

ভিডিওতে দেখা যায়, অনেকেই তার কাছ থেকে পানি পান করছেন। কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁজালো ধোঁয়ায় বেশ কয়েক বার চোখ মুছতেও দেখা যায় মুগ্ধকে।

মুগ্ধর গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। জন্ম ১৯৯৮ সালে ঢাকার উত্তরায়। ২০১৯ সালে ভর্তি হন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখাপড়ার পাশাপাশি ফুটবল খেলোয়াড়, গায়ক, গিটারিস্ট ও সংগঠক হিসেবে সুনাম ছিল তার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান শিক্ষা সমাপনী-২০২৩-এর কনভেনর ছিলেন। ছিলেন স্কাউট গ্রুপের ইউনিট লিডার। শ্রেষ্ঠ সংগঠক হিসেবে বাংলাদেশ স্কাউটস থেকে ‘ন্যাশনাল সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিলেন। খুবির কয়েক জন শিক্ষার্থী জানান, ক্যাম্পাস খুললে খুবির প্রধান ফটকের নাম ‘শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ফটক’ করার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাবেন তারা।

ইয়াসিন শেখ যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকায় মা ও বোনকে নিয়ে ছোট একটি ঘরে ভাড়া থাকতেন। তিনি একটি এলপি গ্যাসের দোকানে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করতেন। তার জন্ম খুলনার রূপসা উপজেলায়। গত শুক্রবার তাকে রূপসার রহিমনগরে তার নানাবাড়িতে দাফন করা হয়েছে।

গত ২০ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনের সহিংসতার মধ্যে পুলিশের গুলিতে আহত হন ইয়াসিন। মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ছয় দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ২৫ জুলাই তার মৃত্যু হয়। তার পেটে গুলি লেগে পেছন দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল।

পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরানো অবস্থায় ইয়াসিন শেখ তার মাকে বলেছিলেন, ‘আমি তো মিছিলে যাইনি মা। গ্যাস নিয়ে কাস্টমারের বাড়ি যাচ্ছিলাম, আমাকে পুলিশ গুলি করল কেন?’

ইয়াসিনের মা মনজিলা বেগম বলেন, ‘সেদিন সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে হঠাত্ একটি ফোন আসে। অন্য প্রান্ত থেকে বলা হয়, আপনার ছেলের গায়ে গুলি লেগেছে। রিকশাভাড়া না থাকায় রিকশাওয়ালার হাতে-পায়ে ধরে কোনো রকম ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে পৌঁছাই। গিয়ে দেখি গুলিবিদ্ধ ছেলের দেহ পড়ে আছে। আমাকে কাছে পেয়ে বলে, ‘আমি তো মিছিলে যাইনি মা! গ্যাস নিয়ে কাস্টমারের বাড়ি যাচ্ছিলাম, আমাকে পুলিশ গুলি করল কেন?’ তারপর তাকে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই, সেখানে তাকে আইসিইউতে রাখা হয়।’

ইয়াসিনের মা মনজিলা বেগমের জীবন সংগ্রামময়। ইয়াসিনের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখনই ব্রেইন স্ট্রোকে মারা যান তার বাবা নূর ইসলাম শেখ। মনজিলা বেগম মানুষের বাড়িতে কাজ করে তার তিন মেয়ে নূরজাহান, নাসরীন ও শারমিনকে কোনো রকমে বিয়ে দেন। ছোট মেয়ে শারমিনের সংসার না টেকায় তিনি শারমিন ও ১৫ বছরের ইয়াসিনকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।

মাঝপথে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে ঢাকায় গিয়ে চাকরি শুরু করেন শেখ মো. সাকিব রায়হান। মা-বাবা বারবার খুলনায় ফিরে আসতে বললেও রাজি হননি। বলতেন, খুলনায় কিছু করার সুযোগ কম। ঢাকায় চাকরি অথবা ব্যবসা করে তোমাদের মুখে হাসি ফোটাব। এরপর ফিরব। কিন্তু সেই সুযোগ তিনি পাননি।

গত ১৯ জুলাই পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের মাঝে পড়ে প্রাণ হারান ২২ বছর বয়সী সাকিব। তার বুকের ডান পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। বিকাল ৪টার দিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সাকিবের মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে ফোন করা হয় তার বাবাকে। পরে ঢাকায় থাকা অন্য স্বজনেরা লাশ নিয়ে রাতেই খুলনায় ফেরেন। ২০ জুলাই ফজরের পর জানাজা শেষে তার লাশ খুলনা মহানগরীর বসুপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়।

সাকিবের বাড়ি খুলনা মহানগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের নবপল্লী এলাকায়। মা নুরুন্নাহার বেগম বলেন, ‘গত ১৭ জুলাইও ফোন করেছিল। কত কথা বলল। এখন আমার সাকিব চলে গেছে, এখন এসব বলে কী হবে?’

কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ঢাকার সাভারে পুলিশের গুলিতে নিহত হন খুলনার পাইকগাছার নবীনুর। গত ২০ জুলাই নিহত হওয়ার পরদিন লাশ বাড়িতে এনে দাফন করা হয়। গেল এক সপ্তাহ ধরে শোকাহত দুই মেয়েসহ পাগলপ্রায় নবীনুরের স্ত্রী আকলিমা বেগম। সহায়সম্বলহীন নবীনুরের স্ত্রী ও মেয়ে এখন উঠেছেন বড় জামাইয়ের বাড়িতে।

ইত্তেফাক/এনএন