স্মরণ

শ্রদ্ধা আহসান হাবীবের প্রতি

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৯, ২১:৪৬

বৈরী ও প্রতিকূল পরিবেশের প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গকে যিনি কবিতায় তুলে আনতে পেরেছেন, সব রকম শোষণ-জুলুম, দুঃশাসন নির্যাতন যিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, তিনি হলেন কবি আহসান হাবীব। আজ ১০ জুলাই বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান কবি ও লেখক আহসান হাবীবের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা গভীরভাবে শ্রদ্ধা জানাই তাঁর প্রতি। শৈশবেই তাঁর ভেতরে কবিতার বীজ, শেকড় গড়ে ওঠে। ১৯৩৩ সালে স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ছাত্রাবস্থায় কলকাতার কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হলে নিজের সম্পর্কে আস্থা বেড়ে যায়। স্কুলে পড়াকালীন তিনি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তুকে কবিতায় উপস্থাপিত করে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। বাবার সঙ্গে মনোমালিন্য, পারিবারিক আর্থিক অসচ্ছলতা আর কবি হওয়া বাসনায় কলেজে পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই ১৯৩৬ সালের শেষের দিকে পাড়ি জমান কলকাতায়। কলকাতা গিয়ে সাংবাদিকতার পেশা গ্রহণ করেন এবং আজীবন ঐ পেশাতেই নিয়োজিত ছিলেন। ‘দৈনিক তদবীর’ পত্রিকায় মাসিক ১৭ টাকায় শুরু করেন কর্মজীবনের প্রথম চাকরি। তারপর তিনি বিভিন্ন সময় দৈনিক, মাসিক, পাক্ষিক পত্রিকাসহ শিশু, শওগাত, দৈনিক কৃষক ইত্যাদি কাগজেও কাজ করেন।

সেই যৌবনে কলকাতায় মেসবাড়ির দুর্বিষহ জীবনের মধ্যে তিনি সময় বের করে নিভৃতে কাব্যচর্চা চালিয়ে ফলিয়েছেন কবিতার সোনার ফসল। বাংলা কবিতার ভুবনে যুক্ত করেছেন এক হিরন্ময় অধ্যায়। তিনি কলকাতার বুলবুল পত্রিকা, মাসিক সওগাত পত্রিকায়, আকাশবাণীতে কলকাতা কেন্দ্রে কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকায় এসে তিনি বিভিন্ন সময়ে আজাদ, মোহাম্মদী, কৃষক, ইত্তেহাদ প্রভৃতি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কমরেড পাবলিশার্স থেকে ১৯৪৭ সালে আহসান হাবীবের প্রথম কবিতার বই  ‘রাত্রি শেষ’ প্রকাশিত হয়। জীবনের গভীর দুঃখ-কষ্টের সময়ে লেখা কবিতাগুলো স্থান পায় তাঁর এই গ্রন্থে। ১৯৫০ সালে পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি ‘কথাবিতান’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থাও গড়ে তোলেন। সেই প্রকাশনা থেকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আহসান হাবীবের কবিজীবন রোমান্টিকতার অনুসারী। তবে তা সমাজ ও সমাজের ভাবনার বিষয়বস্তুর বাহিরের ছিল না। সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল প্রায় প্রবাদতল্য। এদেশের বহু লেখক ও কবির জীবনের প্রথম রচনা তাঁর হাত দিয়েই প্রকাশিত হয়। সাহিত্য ক্ষেত্রে তাদের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে তাঁর প্রচেষ্টা ছিল অগ্রগণ্য। প্রচণ্ড জীবনসংগ্রামের মধ্যে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন সাহিত্য সাধনায়।

মধ্যবিত্তের সংকট ও জীবনযন্ত্রণা ছিল তাঁর কবিতার মুখ্য বিষয়। কবিতার ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতে নাগরিক মননের ছাপ খুঁজে পায় তাঁর ভক্ত ও কবিতাপ্রেমীরা। খ্যাতিমান কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে আহসান হাবীব দীর্ঘদিন দৈনিক বাংলা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক পদের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনেও অভিভাবকের ভূমিকা রেখেছেন। সমকালীন জীবন ও সমাজের বাস্তবরূপ তাঁর কবিতায় সহজ-সরলভাবে উঠে এসেছে। তাঁর কবিতার স্নিগ্ধতা পাঠকচিত্তে এক মধুর আবেশ সৃষ্টি করে। তিনি সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং আর্ত-মানবতার পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন।

n লেখক : প্রাবন্ধিক