ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ডিএমসি-এর চক্ষু বিভাগের ৩০৫ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছে মোহাম্মদ সাব্বির। ১৯ তারিখে কোটা আন্দোলনের সহিংসতার মধ্যে তার শরীরে গুলি লাগে। এই পর্যন্ত তার দুই দফা অপারেশন হয়। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তার একটি চোখ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। অপর চোখটিও ধীরে ধীরে দৃষ্টিহীন হয়ে যাবে। সাব্বিরের মা রহিমা বেগম জানান তিনি একটি গার্মেন্টেসে কাজ করেন। তার স্বামীও গার্মেন্টসকর্মী। তাদের দুই ছেলের মধ্যে ১৫ বছরের সাব্বির বড়। কোটা সংস্কার আন্দোলনেই যার দুই চোখ হারাতে বসেছে।
শুধু সাব্বির নয়, নগরীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) , জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং জাতীয় বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউউটে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোটা আন্দোলনের সময় সহিংসতায় হাতে-পায়ে ও চোখে গুলি লাগা অনেকেই স্থায়ীভাবে অঙ্গ হারিয়ে প্রতিবন্ধী হয়েছেন। অনেকে আবার প্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। অধিকাংশ নিম্নবিত্ত হওয়ায় অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের ঝুঁকিতে আছেন তারা।
ভুক্তভোগীরা যা বলেন: ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩০৫ নম্বর ওয়ার্ডে শুয়ে ইশান ব্যথায় কাতরাচ্ছে। রবিবারে তার চোখের অস্ত্রোপচার হয়। টঙ্গি সিরাজ উদ্দিন বিদ্যা নিকেতনের সপ্তম শ্রেণীর (১৩) ইসান বন্ধুদের সাথে ৫ তারিখের বিজয় মিছিলে গিয়ে সবাইকে পানি পরিবেশন করছিল। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে তার নাকের ডান দিক দিয়ে গুলি ঢুকে বা চোখের মধ্য দিয়ে বের হয়ে গেলে চোখটি নষ্ট হয়ে যায়। বাবা বাবুল সিকদার একমাত্র সন্তানের জন্য বার বারই বলছিলেন একটা চোখ কি পাওয়া যাবে না। মা পাপিয়া বলেন, তার পাথরের চোখ লাগানো হয়েছে। কোনদিনই হয়তো চোখ আর ভালো হবে না।
অন্যদিকে, মোহাম্মদ শীবপুর সরকারি শহীদ আসাদ কলেজের উচ্চমাধ্যমিক ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী। বন্ধুদের সাথে যাত্রাবাড়ি এলাকায় গিয়ে সে গুলিবিদ্ধ হয়। হাসপাতালে পায়ে অস্ত্রোপচারের পর রড ঢুকিয়ে টানা দিয়ে বাঁধা রয়েছে। চিকিৎসকের মতে তার পা ঠিক হতে দীর্ঘদিন লাগবে। তার মতো আরও বহু কিশোর-যুবক বিভিন্ন হাসপাতালে শরীরের নানা স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন। তাদের সামনে যেন রাজ্যের আধার। অনেকের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য পর্যন্ত নেই।
কিছু তথ্য:জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এর ক্লিনিক্যাল সার্জারি বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. আসমা আহমেদ জানান, তাদের কাছে চার জন গুলিবিদ্ধ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রেফার্ড হয়ে আসেন। এদের মধ্যে একজনের হাতের সবগুলো আঙ্গুল কেটে ফেলতে হয়েছে। বাকি ৩ জনের হাত-পায়ে গুলি লাগলেও স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য মতে, জুলাই মাসের ১৫ তারিখ থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত ৭০০ জন চিকিৎসা নেন এই হাসপাতালে। বর্তমানে ভর্তি রয়েছে ১৯৪ জন। আইসিইউতে আছে ১০ জন। মারা গেছে ১১২ জন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানকে জানান তাদের চক্ষু বিভাগের মধ্যে তিনজন দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে ৭ জন। অনেকেই হাতে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে এসেছেন। তাদের মধ্যে একজনের একটি কৃত্তিম পা প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বেশ কয়েকজন হাত পা হারানোর ঝুঁকিতে আছে। নিটোর-এর তথ্য মতে ১৫ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলনে আহত ৬৩৭ আসে জরুরী বিভাগে চিকিৎসার জন্য। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ ৩৮৬ রোগী, আঘাতপ্রাপ্ত ২৫১ জন ছিল। তাদের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ২৯৫ জন। ৮ জন রোগীর অঙ্গ প্রতিস্থাপন করতে হবে বলে জানান নিটোর পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম উজ্জমান।
চিকিৎসকেরা যা বলেন : ডিএমসির অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, আমাদের বিভাগে ৬০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে সবারই অস্ত্রোপচার হয়। অনেকেই স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে নাও পেতে পারে। চক্ষু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো: মোস্তাক আহমেদ বলেন, ১৮-১৯ জুলাই ৪১ জন ভর্তি হয় যাদের ৩০ জনের অস্ত্রোপচার করতে হয়। ৪ জনের দুই চোখই ক্ষতিগ্রস্ত ছিলো। ৪-৬ আগস্ট তারিখে ৪৫ জন ভর্তি হয় যাদের ৪১ জনের অস্ত্রোপচার হয়। তিনি বলেন, যাদের চোখে গুলি লেগেছে তাদের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ চোখ নষ্ট হলে প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম দায়িত্ব গ্রহণের পর কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহতদের পরিবারবর্গকে সহযোগিতা এবং আহতদের বিনা পয়সায় চিকিৎসায় আগ্রহের কথা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন।
