রাজধানীর বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও বেড়ে যাওয়া চালের দাম এখনো কমেনি। উলটো সপ্তাহের ব্যবধানে দাম আরো বেড়েছে। দাম বাড়ার এ তালিকায় আরো রয়েছে: চিনি, কাঁচা মরিচ ও কোনো কোনো সবজি। তবে ব্রয়লার মুরগি ও ফার্মের ডিমের দাম কমেছে।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাজারে এখন সব ধরনের নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সরবরাহ সমস্যায় বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। বর্তমানে কোনো কোনো পণ্যের দাম কমলেও চালসহ কিছু পণ্যের দাম এখনো বাড়তি। এসব পণ্যের মিলার ও পাইকারি পর্যায়ে তদারকি করলে দাম কমে আসবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক খুচরা ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, নিত্যপণ্যের বাজারে যে সিন্ডিকেট হয় তা মিলার ও পাইকারি পর্যায়েই হয়ে থাকে। তাই এখানে সিন্ডিকেট ভাঙতে পারলে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল থাকবে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজার ও নিউ মার্কেটসহ কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি সরু চাল নাজিরশাইল/মিনিকেট ৬০ থেকে ৮০ টাকা, মাঝারিমানের চাল পাইজাম/লতা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা ও মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা সপ্তাহের ব্যবধানে চালের মানভেদে কেজিতে এক থেকে দুই টাকা বেশি। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশও (টিসিবি) গতকাল তাদের বাজারদরের প্রতিবেদনে চালের দাম বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরেছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, চালের বর্তমান এই দর গত বছরের এই সময়ের তুলনায়ও বেশি। গত এক বছরের ব্যবধানে দেশের বাজারে মোটা চাল ৯.১৮ শতাংশ, মাঝারি মানের চাল ৭.৪৮ শতাংশ ও সরু চাল ৪.৪৮ শতাংশ বেড়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এখন চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। সারা দেশে স্বল্প মূল্যে খোলা বাজারে (ওএমএস) চাল বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া, সরকারের গুদামেও চালের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে সরকারের গুদামে মোট ১৮ লাখ ৬৫ হাজার ৮১৪ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে চাল মজুত রয়েছে ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৮৪৬ টন। আর গমের মজুত ৪ লাখ ২০ হাজার ৪০১ টন।
রাজধানীতে চালের সবচেয়ে বড় পাইকারিবাজার বাবুবাজার বাদামতলী ও বাবুবাজার চাল আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি নিজামউদ্দিন এ প্রসঙ্গে গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ব্যবসায় ফ্লো-টা একটু কম। অনেকের কাছে আগে থেকে যে চাল ছিল, তাই বিক্রি করছে। এখনো কেউ কেউ নতুন মাল উঠায়নি। এসব কারণে দাম একটু বেড়েছে। তবে এখন চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। আশা করছি, সপ্তাহখানেকের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। এদিকে চালের পাশাপাশি গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে চিনি ও কাঁচামরিচের দাম বেড়েছে। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ২৪০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। যা গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেশি। কাঁচা মরিচের পাশাপাশি কোনো কোনো সবজির দামও কিছুটা বেড়েছে। এছাড়া, সপ্তাহের ব্যবধানে চিনির দর বেড়েছে। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয় ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায়। যা গত সপ্তাহে ছিল ১২৫ থেকে ১৩৫ টাকা। ভোক্তাদের জন্য স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, সপ্তাহের ব্যবধানে আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম কিছুটা কমেছে। এর মধ্যে আলু কেজিতে ৫ টাকা কমে ৫৫ টাকা, আমদানিকৃত পেয়াজ কেজিতে ১০ টাকা কমে ৯০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকা। এছাড়া, ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ টাকা কমে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা ও ফার্মের বাদামি রংয়ের ডিম হালিতে ৩ থেকে ৪ টাকা কমে ৪৮ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে এখন ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও দাম কমেনি। এছাড়া অন্যান্য মাছের দামের তেমন হেরফের নেই।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী নিত্যপণ্যের দাম কমাতে করণীয় প্রসঙ্গে গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের নিত্যপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। আর যেসব পণ্য আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়, সেসব পণ্যের যেন ঘাটতি না হয় সেজন্য আগে থেকেই সরকারের পরিকল্পনা থাকতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাজারে অভিযান চালিয়ে তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে পাওয়া যাবে না। তাই বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। এজন্য দেশে নিত্যপণ্যের বিপণন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। এতে সিন্ডিকেট ভাঙবে। যার সুফল পাবে সাধারণ মানুষ।
