কুসুম কুমারী দাশ 'আদর্শ ছেলে' কবিতায় যেভাবে কাজে বড় হওয়া ছেলে চেয়েছেন, ঠিক সেভাবেই নিজের মনোবাসনা ব্যক্ত করেছেন বিসিবির নতুন সভাপতি ফারুক আহমেদ। গতকাল দুপুর সাড়ে ৩টায় মিরপুরে এসে ঘণ্টাব্যাপী আলাপ করেছেন গণমাধ্যকর্মীদের সঙ্গে। দিয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নানা প্রশ্নের উত্তর। যেখানে তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন কাজের ওপর। কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণের কথা বলেছেন, মুখে অনেক কিছুর স্বপ্ন দেখানো থেকেও বিরত থাকবেন বলে জানিয়েছেন।
ক্রিকেটের উন্নতির জন্য যে জায়গাগুলো খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন নতুন সভাপতি। জাতীয় দল, এইচপি, গেম ডেভলপমেন্ট, ফ্যাসিলিটিস, গ্রাউন্ডস-এসব জায়গা নিয়ে আগে কাজ করতে চান। এছাড়া বিভিন্ন আলোচিত-সমালোচিত বিষয়েও আলোকপাত করেছেন। মিরপুরে বিসিবি প্রাঙ্গণে নতুন সভাপতি কথা বলতে আসবেন, সেটি আগে থেকেই জানা ছিল। দুপুর থেকেই স্টেডিয়াম এলাকায় রাখা হয়েছিল সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা।
সংবাদ সম্মেলনকক্ষে পরিচালকদের নিয়ে প্রবেশ করে শুরুতেই উপস্থিত শতাধিক গণমাধ্যমকর্মীকে নিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন নতুন সভাপতি। এরপর কথা বলা শুরু করেন। সংক্ষিপ্তভাবে সেটি শেষ করতে চাইলেও এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তাকে কথা বলতে হয়েছে। বিসিবির নতুন সভাপতি হিসেবে তার মূল বার্তা ছিল, এমন কাজ তিনি করতে চান, যেখানে তিন থেকে চার বছর পরও যেন একই কথা বলতে না হয়।
নজর গঠনতন্ত্রে
গতকাল বিসিবির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মিরপুরে পৌঁছে ফারুক আহমেদ বলেছেন, 'বাংলাদেশের মতো একটা সম্ভাবনাময় দেশে যতটুকু করার কথা ছিল, ততটুকু করতে পারিনি। আবার এটাও বলতে চাচ্ছি, আমাদের সাফল্য একদম কম না। হয়তো আমাদের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় আরও উন্নতি করার কথা ছিল, কিন্তু সেটি আমরা করতে পারিনি। আমাদের দায়িত্ব হবে, এটিকে পুনর্গঠন করা। অনেক সময় অনেক কাজ করা যায় না, বাইরের অনেক চাপ থাকে। আমি আশা করব, এবার আমি সভাপতি থাকা অবস্থায় যতটুকু সম্ভব, একটা সুন্দর সিস্টেম দাঁড় করাতে চাই।'
বিসিবির গঠনতন্ত্র নিয়ে বলেছেন, 'আমাদের যে গঠনতন্ত্র রয়েছে, যার মাধ্যমে আমরা পরিচালকরা নির্বাচিত হই, সেই বিষয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। এই গঠনতন্ত্রের ব্যাপারে আমাদের চিন্তা করতে হবে, আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো কী হয়। আগামী বছর আমাদের নির্বাচন রয়েছে। তার আগে আমাদের গঠনতন্ত্রে হাত দিতে হবে। সেটাকে এমন করতে চাই, যাতে সত্যি সত্যি যারা ক্রিকেট ভালোবাসেন এবং ক্রিকেটের জন্য কিছু করতে চান, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।'
সাকিব-তামিম প্রসঙ্গ
বাংলাদেশের ক্রিকেট পাড়ায় সাকিব-তামিমকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। দুজনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব থেকে জাতীয় দলে খেলা কিংবা না খেলা নিয়ে সরগরম থেকেছেন সবাই। সাকিব রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েও আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি আর দেশে ফেরেননি। এই মুহূর্তে পাকিস্তানে টেস্ট খেলছেন তিনি। তার বিষয়ে ফারুক আহমেদ বলেছেন, 'সাকিব বাইরে থেকে খেলতে পারবে কি না, এটা আমরা খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখব। আমি আমার পরিচালকদের সঙ্গে আলাপ করব, পলিসি কী হওয়া উচিত সাকিব আল হাসানের ব্যাপারে। বোর্ডে আলোচনা করব, সাকিব এখন কী অবস্থায় আছে, এ অবস্থায় সে খেলা চালিয়ে যেতে পারবে কি না। অবশ্যই এটা নির্ভর করবে যে দুটি টেস্ট ম্যাচ আছে, তার ওপর। তখন এটা একটা বোর্ডের পলিসি ম্যাটার হবে।'
আবার দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের বাইরে রয়েছেন ওপেনার তামিম ইকবাল। তার বিষয়ে তিনি বলেছেন, 'আমার ব্যক্তিগত মত, তামিম ইচ্ছা করলে আরও দুই-তিন বছর খেলতে পারে। আমি চাই, সে অন্তত আরও দুই বছর ক্রিকেট খেলুক। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেট খেলার চাপ এখন সে নিতে পারবে কি না, আমি জানি না। সেটা তামিমই ভালো বলতে পারবে।'
অন্যদিকে তিনি আরও বলেছেন, 'খেলোয়াড়দের ব্যাপারে কিছু নিয়ম যোগ করা হবে। তারা কী করতে পারবে, কী করতে পারবে না, এটা আমি আজকেই এখানে ঢোকার আগে ইনফরমালি আলাপ করেছি। বিশেষ করে, সফর চলাকালে, সফরের আগে-পরে ক্রিকেটাররা কী করতে পারবে, নাকি পারবে না, এসব থাকবে। আপনার যদি লিখিত থাকে, সফর চলাকালে আপনি কোনো বিজ্ঞাপন করতে পারবেন না, তাহলে এটার জন্য আপনার কাছে কেউ আসবে না। এটা যদি পরিষ্কার লেখা থাকে, তাহলে সুবিধা হবে।'
গোপনীয়তা নিয়ে কঠোর অবস্থান
বিসিবির বিভিন্ন গোপন বিষয় হুটহাট করে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হতো। খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত বিষয়ও সেখানে মাঝেমধ্যে উঠে আসত। সেসব বিষয়ে নতুন সভাপতি বলেছেন, 'অনেক গুরুত্বপূর্ণ খেলার আগে আমরা এমন কিছু ছোট বিষয়ে নজর দিই, যেটা আমাদের খেলায় প্রভাব ফেলে। ড্রেসিংরুমের কথা বাইরে চলে আসে, সিলেক্টরদের মিটিংয়ের কথা বাইরে চলে আসে। আমি যখন কাজ করেছি, তখন আমার প্রশ্ন ছিল, এমন কেন হয়। এগুলো হওয়া তো উচিত না। আমি চেষ্টা করব, সেগুলো যেন ঠিকভাবে করতে পারি। এভাবেই আগানোর চেষ্টা থাকবে।'
দল নির্বাচনে থাকবে স্বচ্ছতা
ফারুক আহমেদ জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক থাকাকালীন কাজের স্বাধীনতা না পেয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। এখন থেকে নির্বাচকদের কাজের বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না বলে মত দিয়েছেন তিনি। তার মতে, 'হস্তক্ষেপের বিষয়ে আমার আপত্তি ছিল। খুব বেশি মানুষ আমার পাশে পাইনি। এবার আমি নিশ্চিত করতে চাই, ঐ (নির্বাচকদের কাজে হস্তক্ষেপ) বিষয়ে সম্ভাবনা শূন্য বলব না, নাই বললেই চলে।'
এই বিষয়ে আরও বলেছেন, 'দল নির্বাচন আর পলিসি মেকার মিলিয়ে ফেলবেন না। পলিসি মেটার নিয়ে কাজ করা হবে। যেমন ইনজুরড খেলোয়াড় খেলতে পারবে না, এমন। এটা এমন হবে না যে, সাকিবকে রেখো না, তামিমকে নাও কিংবা শান্ত থাকবে কি থাকবে না, এমন না। খেলোয়াড় নির্বাচন করবে নির্বাচক দল। সেটা স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই হবে। যদি কোনো খেলোয়াড় সুযোগ না পায়, তাহলে অবশ্যই তার একটা বিশ্লেষণ বোর্ড থেকে থাকবে।'
হাথুরুর ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই
বিসিবি সভাপতি হওয়ার আগেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের থাকার কারণ ফারুক আহমেদ দেখেন না। এবার সভাপতি হওয়ার পরও একই জায়গাতে আছেন বলে জানিয়েছেন, 'তার চুক্তির ব্যাপারে আমি সবকিছু জানি না। তবে আমি আমার আগের জায়গাতেই আছি (তাকে কোচ থেকে বিদায় করার পক্ষে)। আমি যেটা বলেছি, সেখান থেকে বের হয়ে যাইনি। এখন আমার অফিশিয়াল বিষয়টি একটু দেখার দরকার। তার রিপ্লেসমেন্ট দেখব, তারপর কথা বলব।'
