নতুন করে পানিবন্দি ৬৭ হাজার পরিবার

বন্যা পরিস্থিতির কোথাও উন্নতি, কোথাও অবনতি, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি, সংকটে বানভাসিরা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতি ২ হাজার কোটি টাকা, পানিতে ডুবে আরও তিন শিশুর মৃত্যু 

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৪, ০৮:০০

দেশের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ১১ জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে পানিবন্দি হয়েছে ৬৭ হাজার ১২৮টি পরিবার। শনিবার ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৯০১ পরিবার পানিবন্দি ছিল। গতকাল রবিবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৪৭ হাজার ২৯ পরিবারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা গত এক দিনে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৬৮ জন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ লাখ ৯ হাজার ৭৯৮ জনে।

গতকাল রবিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো হলো—ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার। বন্যায় এখন পর্যন্ত ২০ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে কুমিল্লায় ছয় জন, ফেনীতে এক জন, চট্টগ্রামে পাঁচ জন, নোয়াখালীতে তিন জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক জন, লক্ষ্মীপুরে এক জন ও কক্সবাজারে তিন জন নিহত হয়েছেন। মৌলভীবাজারে দুই জন নিখোঁজ রয়েছেন। বন্যাদুর্গত ১১ জেলায় মোট ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০ হাজার ৬৫০ টন। এছাড়া ১৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। শিশুদের খাবারের জন্য ৩৫ লাখ টাকা এবং গোখাদ্য কেনার জন্য ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পানিবন্দি/ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের আশ্রয় প্রদানের জন্য মোট ৩ হাজার ৬৫৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মোট ৪ লাখ ১৫ হাজার ২৭৩ জন মানুষ এবং ২২ হাজার ২৯৮টি গবাদি পশুকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যদের সংগৃহীত ৭ হাজার ২০০ ব্যাগ/বস্তা ত্রাণসামগ্রী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় ইতিমধ্যে দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে এবং ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া ও পরশুরাম উপজেলায় সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নৌ ও সড়ক পথে এবং তাদের হেলিকপ্টারসহ বিমান বাহিনী, র‍্যাব ও বিজিবির হেলিকপটারযোগে প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে। পাশাপাশি উদ্ধার কার্যক্রম চলমান আছে। ফেনীতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করার জন্য ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে এবং সেনাবাহিনী ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসকবৃন্দ সেবা প্রদান করছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে কন্ট্রোল রুম সার্বক্ষণিক খোলা রয়েছে। তথ্য ও সহযোগিতার জন্য ০২৫৫১০১১১৫ নম্বর চালু রয়েছে।

সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য-সহায়তা প্রদানের জন্য আগ্রহী ব্যক্তিগণ প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের অ্যাকাউন্টে সহায়তার অর্থ প্রেরণ করতে পারেন: হিসাবের নাম : ‘প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল’, ব্যাংক: সোনালী ব্যাংক করপোরেট শাখা, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, হিসাব নম্বর: ০১০৭৩৩৩০০৪০৯৩।

আকস্মিক বন্যায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। এর মধ্যে দুধ, ডিমে প্রায় ৪১১ কোটি টাকা এবং অবকাঠামোসহ অন্যান্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫৯০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।

পানিতে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু

তিতাস (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লার তিতাসে পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না শিশু সামিয়া ও আয়েশা আক্তারের। রবিবার বেলা ১১টার দিকে মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফেরার পথে দুই চাচাতো বোন বাঘাইরামপুর ও দুঃখিয়ারকান্দি রাস্তার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির স্রোতে পাশের গর্তে পড়ে নিখোঁজ হয়। দেড় ঘণ্টা পর সামিয়া আক্তার (১০) এবং তিন ঘণ্টা পর আয়েশা আক্তারের (১০) লাশ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। উপজেলার জিয়ারকান্দি ইউনিয়নের বাঘাইরামপুর গ্রামের রাজমিস্ত্রি মুক্তার হোসেনের মেয়ে সামিয়া আক্তার এবং আয়েশা আক্তার একই গ্রামের মালদ্বীপ প্রবাসী মনির হোসেনের মেয়ে। 

সেনবাগ (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, বন্যার পানিতে ডুবে রবিবার সকালে সেনবাগের কেশারপাড় ইউনিয়নের বীরকোট গ্রামে স্কুল শিক্ষক মো. গিয়াস উদ্দিনের একমাত্র পুত্র মোহাম্মদ আব্দুর রহমানের (২) মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের লোকজনের অজান্তে শিশুটি তাদের বসতঘরের দরজার সামনে বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায়।

কুমিল্লায় বন্যাদুর্গতদের সীমাহীন দুর্ভোগ

কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, গোমতীর ভাঙন এলাকা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে বুড়িচং উপজেলার বাকশীমুল ইউনিয়নের পিতাম্বর গ্রাম। রবিবার দুপুরে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় লোকজন রেললাইনে ছুটে যাচ্ছেন। সহায় সম্বল হারিয়ে কেউবা ছুটছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। দুর্গত লোকজন জানিয়েছেন এক দিন আগেও ঐ এলাকায় পানি ছিল না। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ঘরের ভেতর পানি উঠে গেছে। বন্যায় এ উপজেলার অধিকাংশ গ্রামের লোকজনই এখন পানিবন্দি। এদিকে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পাচ্ছে না মানুষ। নৌকার অভাবে কেউ ত্রাণ নিয়ে গহিন গ্রামে যেতে পারছেন না।

জনমানবশূন্য ফেনীর গ্রামের পর গ্রাম

স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার ছোবলে এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়ের শিকার ফেনী জেলার মানুষ। ফেনী সদর, ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী, পরশুরাম, সোনাগাজী ও দাগনভূঞা—এ ছয় উপজেলা পুরোপুরি বন্যাকবলিত। গ্রামের পর গ্রাম বন্যার পানিতে ডুবে আছে। বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের গেছেন অসংখ্য মানুষ। তাই বাড়িঘর অনেকটাই জনমানবশূন্য। বন্যাকবলিত কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে স্থানীয় স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও মন্দিরের ভবনে উঠেছেন। সুপেয় পানি ও খাবারের সংকট আরও প্রকট হয়েছে। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় একাধিক সংবাদকর্মী জানান, পানির জন্য কোথাও যাওয়া যাচ্ছে না। মোবাইলের নেটওয়ার্কও পাওয়া যাচ্ছে না অনেক জায়গায়। এখানকার দুর্গম এলাকায় ত্রাণসামগ্রীও নিয়ে যেতে পারছেন না অনেকে।

লক্ষ্মীপুরে চারিদিকে শুধু অথই পানি

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, জেলার  যেদিকে চোখ যায়, সেদিকে শুধু অথই পানি। জেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৭ লাখ মানুষ। এর মধ্যে পানি কমতেও শুরু করেছিল জেলা শহরসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোতে। কিন্তু শুক্রবার থেকে নোয়াখালীর বন্যার পানি রহমতখালী খাল দিয়ে ও বিভিন্নভাবে ঢুকে পড়ে লক্ষ্মীপুরে। এতে লক্ষ্মীপুর পৌরসভা ও পূর্বাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোর অধিকাংশ এলাকার মানুষ নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে শনিবার সকাল থেকে বন্যার পানির চাপ বেড়ে গিয়ে নতুন করে আরও কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। 

মিরসরাইয়ে মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা

মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে টানা পাঁচ দিনের বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ২ লাখেরও বেশি মানুষ। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এখানকার ফেনী নদীর পানির উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় গত বুধবার থেকে উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় ১৬৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিতে প্লাবিত ১১টি ইউনিয়নে নেই বিদ্যুত্সংযোগ। উপজেলার গ্রামীণ সড়কগুলো পানিতে ডুবে থাকায় আশ্রয়কেন্দ্রে আসা পানিবন্দিদের মধ্যে পৌঁছানো যাচ্ছে না ত্রাণ। ফেনী-কুমিল্লার কয়েকটি অংশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পানি ওঠায় দেখা দিয়েছে যানজট। বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান ও পর্যাপ্ত ত্রাণসহায়তা না পেলে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বেচ্ছাসেবী ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা। এদিকে গত কয়েক দিন বন্যার কারণে দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন হিসেবে বিবেচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যান চলাচল করছে অনেক ধীরগতিতে। গত কয়েক দিন পথে আটকে থাকার কারণে মালবাহী অনেক যানবাহনে থাকা নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচা ভোগ্যপণ্য নষ্ট হয়ে গেছে।

নোয়াখালীতে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। দুই দিন বৃষ্টি বন্ধ থাকার পর শনিবার রাত থেকে আবার বৃষ্টি শুরু হলে এবং উজানের পানি ঢুকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এতে করে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বেড়ে ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। গতকাল রবিবার দুপুর পর্যন্ত সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ লাখ ৬৩ হাজার ২৯১ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এখনো ছুটছে বানভাসি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।

এদিকে বন্যাকবলিত এলাকার  অধিকাংশ টিউবওয়েল পানির নিচে থাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে রয়েছে খাদ্য ও ওষুধ সংকট। পাশাপাশি ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব ও সাপের উপদ্রব বেড়ে চলছে। এ অবস্থায় বাড়িঘরে আটকে পড়া হাজার হাজার মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। বন্যার কারণে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ১১৮ জন ভর্তি হয়েছে। গত তিন দিনে নোয়াখালীতে ৫৩ জনকে সাপে কেটেছে। 

ইত্তেফাক/এমএএম