আগামী ১২ জুলাই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে দেশ নাটকের সফলতম প্রযোজনা ‘নিত্যপুরাণ’-এর বিকাল ৪টায় নিরানব্বই এবং সন্ধ্যা ৭টায় শততম মঞ্চায়ন হবে। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল নাটকটি। এটি লিখেছেন এবং নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের অন্যতম নাট্যকার মাসুম রেজা। ‘নিত্যপুরাণ’ ছাড়াও নাট্যকার মাসুম রেজা এ পর্যন্ত প্রায় পনেরটি নাটক লিখেছেন মঞ্চের জন্য। এই নাট্যকারের মঞ্চস্থ হওয়া অন্যান্য নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘সুরগাঁও’, ‘বিরসা কাব্য’, ‘আরজ চরিত্রামৃত’, ‘জলবালিকা’। নাট্যকার মাসুম রেজার সঙ্গে ‘নিত্যপুরাণ’-এর শততম মঞ্চায়ন নিয়ে কথা বলেছেন মাহবুব আলম
‘নিত্যপুরাণ’ রচনার অনুপ্রেরণা কী?
আমি তো ক্লাসিক বা এপিকগুলোর মুগ্ধ পাঠক। সেইসূত্রে ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ পাঠ করা হয়েছে। যখন ‘মহাভারত’ পাঠ করছি, তখন দেখলাম—অর্জুন, কর্ণ, ভীমের নাম পাঠের আগে থেকেই জানি। তাঁরা সব অনেক বড় বড় চরিত্র। ‘মহাভারত’জুড়ে তাঁদেরই কথা। সেই তুলনায় মহাভারতে একলব্যের তেমন জায়গায় নেই। খুব ছোট্ট একটা অংশে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি বিসর্জনের কথা উল্লেখ আছে। অথচ সমগ্র ‘মহাভারত’-এ যদি কোনো বীর থাকেন, যিনি গণ মানুষের বীর, সাধারণ মানুষের বীর, তিনি হলেন একলব্য। এই বিষয়টিই আসলে আমাকে ধাবিত করেছে বা তাড়িত করেছে বা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে ‘নিত্যপুরাণ’ লিখতে। একলব্যকে নিয়ে এক নয়া আখ্যান ‘নিত্যপুরাণ’, যা মহাভারতেরই একটা অংশ মনে হবে।
একলব্য চরিত্রে দুজন অভিনেতার অভিনয় কিভাবে আলাদা করেন?
ব্যক্তি হিসেবেই যখন একজন অভিনয় করছেন, তখন আরেকজন হাজার চেষ্টা করলেও অন্যজনের মতো অভিনয় করতে পারবে না। ন্যাচারাল কারণেই এটা আলাদা হয়ে থাকে। একটা বিষয়কে খুবই গুরুত্ব দিয়েছি, সেটা হলো অভি নয় বা অনুকরণ নয়। আগে আমাদের দিলীপ চক্রবর্তী যেটা করেছেন, সেটা তাঁর মতো। আবার মামুন চৌধুরী রিপন যেটা করবেন, সেটা তাঁর মতো। তিনি চরিত্রটা যেভাবে বুঝে করবেন, সেটা তাঁর অভিনয়। এই ভাবনা থেকেই আসলে পরের একলব্যকে তৈরি করেছি। ফলে অনেক কিছুতেই তাঁরা ভিন্ন, আবার অনেক কিছুতেই তাঁরা এক। কারণ একই সংলাপ প্রক্ষেপণ।
‘নিত্যপুরাণ’ নাটকের কোন দিকটি আপনাকে বেশি প্রাণিত করে এবং কেন?
‘নিত্যপুরাণ’ নাটকের সবচেয়ে বড় দিক হলো পঞ্চপাণ্ডবের অখণ্ডতা, যেটা সমগ্র ‘মহাভারত’-এ দেখানো হয়েছে। সত্যিকার অর্থেই যদি তাঁরা নিজেদের ভেতরে কোনো সংকটে পড়তেন, তাহলে সেই সংকটে তাঁদের সেই অখণ্ডতা হয়তো আর থাকত না। এটা একটা দিক, যেটা খুব গভীরভাবে আমার নাটকে আছে। আরেকটা দিক হলো নারীর অবস্থান। দ্রৌপদীর সঙ্গে একলব্যের কথোপকথনে আবহমানকালের নারীর যে অবস্থান বা চিত্র, সেটা যেভাবে তুলে ধরা হয় বা বেরিয়ে আসে, আমি মনে করি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো এটাই।
বাংলা নাট্যে ‘নিত্যপুরাণ’ কোন বিবেচনায় ভিন্ন?
এ যাবত যতজন নাট্যকার বা লেখক ‘মহাভারত’ নিয়ে কাজ করেছেন, সেই রবীন্দ্রনাথ থেকে বুদ্ধদেব বসু পর্যন্ত, তাঁরা সবাই ‘মহাভারত’-এর ভেতরে থেকে ‘মহাভারত’কে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। আমি মহাভারতের বাইরে এসে নয়া আখ্যান রচনা করেছি, যেটা ‘মহাভারত’-এরই অংশ হয়ে ওঠে। এটা ‘মহাভারত’-এর ভিন্ন পাঠ।
শততম মঞ্চায়নে বিশেষ আয়োজন কী থাকছে?
শততম মঞ্চায়নে আমাদের বিশেষ আয়োজনে থাকছে—সকাল ১০টায় একটা সেমিনার। সেটি নিত্যপুরাণ নাটক নিয়ে। বিষয় ‘শিল্প বিচারে নিত্যপুরাণ’। সেমিনারের মূল প্রবন্ধ পাঠ করবেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। এর সঙ্গে ৪টার সময় এবং সন্ধ্যা ৭টার সময় একটা প্রদর্শনী থাকছে। সন্ধ্যা ৭টার শততম বিশেষ মঞ্চায়নে ‘দ্রোণাচার্য্য’ চরিত্রে আমি নিজে অভিনয় করছি। প্রথমবারের মতো আমার লেখা কোনো নাটকের শততম মঞ্চায়ন হচ্ছে। আর আমি মঞ্চে প্রায় দুই যুগ পরে অভিনয় করছি।
