দিনকয়েক আগে এক সাক্ষাৎকারে ভিনিসিয়ুস জানিয়েছেন, প্রশ্নাতীতভাবে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টুর্নামেন্ট হলো চ্যাম্পিয়নস লিগ। শুধু এই ব্রাজিলিয়ান নন, ফুটবল ভালোবাসেন এমন যে কেউ একবাক্যে মেনে নেবেন চ্যাম্পিয়নস লিগের শ্রেষ্ঠত্ব।
ক্লাব ফুটবলে ইউরোপিয়ান ফুটবলের দাপট-আধিপত্য সবাইকে ছাড়িয়ে। সেই ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতার সবচেয়ে মর্যাদা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টুর্নামেন্ট হলো চ্যাম্পিয়নস লিগ। ইউরোপসেরার প্রতিযোগিতাটির মাহাত্ম্য বোঝানোর আসলে কোনও প্রয়োজন নেই। এরপরও এটি নিয়ে কথা হচ্ছে কারণ, নতুন মৌসুমে নতুন রূপে হাজির হচ্ছে চ্যাম্পিয়নস লিগ।
সেপ্টেম্বরে শুরু হচ্ছে চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন মৌসুম। প্রত্যেকবারের মতো এবারও ইউরোপসেরার লড়াইয়ে নামবে ইউরোপের ঘরোয়া ফুটবলের সেরা দলগুলো। কিন্তু এবার থাকছে নতুনত্ব, চমক ও বাড়তি অর্থ পুরস্কারের হাতছানি। চ্যাম্পিয়নস লিগের কাঠামো পাল্টে ফেলে নতুন ঢঙয়ে মাঠে গড়াচ্ছে ইউরোপের এলিট প্রতিযোগিতাটি। সেখানে দল যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ম্যাচ সংখ্যা ও পুরস্কারের অর্থ।
কী পরিবর্তন আসছে
প্রথমত, চ্যাম্পিয়নস লিগে কোনও গ্রুপ পর্বই থাকছে না! ২০২৪-২৫ মৌসুমে গ্রুপ পর্বের জায়গায় খেলা হবে প্রথম রাউন্ড। যেখানে একক পয়েন্ট তালিকায় ভিত্তিতে নির্বাচন করা হবে শীর্ষ দলগুলো। দল বেড়েছে আগের বারের তুলনায় ৪টি। আগে ৩২ দল গ্রুপ পর্বে ভাগ হয়ে খেলতো, আর এবার থেকে অংশ নিচ্ছে ৩৬টি দল। যারা পয়েন্টের ভিত্তিতে শেষ ষোলোর লড়াইয়ের নামবে।
আগে গ্রুপ পর্বে একটি গ্রুপে থাকতো চারটি দল। সেই জায়গা থেকে সরে এসে পয়েন্টের ভিত্তি শুরু হতে যাওয়া চ্যাম্পিয়নস লিগে একটি দল প্রথম পর্বে সর্বোচ্চ আটটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবে। কোন আট দলের বিপক্ষে একটি দল খেলবে, সেটা নির্ধারণ হবে ড্রয়ের মাধ্যমে। ওই ড্র অনুষ্ঠানই আজ (২৯ আগস্ট) হতে যাচ্ছে মোনাকোয়।
কীভাবে হবে ড্র
চ্যাম্পিয়নস লিগের ড্র-ও পাল্টে যাচ্ছে। নতুন পদ্ধতিতে হবে প্রথম রাউন্ডের ড্র। উয়েফার র্যাংকিং অনুযায়ী চারটি পাত্রে রাখা হবে দলগুলোকে। কোন ক্লাব কোন পাত্রে থাকবে সেটিও নির্ধারিত হবে র্যাংকিং অনুযায়ী। তবে ব্যতিক্রম থাকবে কেবল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ। লস ব্লাঙ্কোস থাকবে এক নম্বর পাত্রে।
প্রতিটি দল প্রতিটি ভাগ থেকে দুটি করে প্রতিপক্ষ পাবে। প্রত্যেক ভাগ থেকে পাওয়া প্রতিপক্ষের একটির বিপক্ষে ঘরের মাঠে ও অন্যটির বিপক্ষে অ্যাওয়েতে খেলবে। পুরো ড্র অনুষ্ঠিত হবে ভার্চুয়াল সফটওয়ারের মাধ্যমে।
ড্র শুরু হবে এক নম্বর পাত্র থেকে। প্রতিটি দল আটটি করে প্রতিপক্ষ না পাওয়া পর্যন্ত এই ধারা চলতে থাকবে। এখানে দুটি বিষয় নজরে রাখা হবে। প্রথমত, একই দেশের দুটি দল যেন মুখোমুখি না হয়। দ্বিতীয়, একটি দল একটি দেশের দুটির বেশি প্রতিপক্ষ যেন না পায়।
নতুন ফরম্যাট কী
চ্যাম্পিয়নস লিগে গত ২১ মৌসুমেই ছিল গ্রুপ পর্ব। আট গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলতো ৩২ দল। প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল উঠতো শেষ ষোলোতে। আর তৃতীয় হওয়া দল চলে যেত ইউরোপা লিগে। গ্রুপ পর্বে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৬ ম্যাচ খেলার সুযোগ পেতো।
তবে এবার আরও বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবে দলগুলো। একটা দল সর্বনিম্ন ৮ ম্যাচ খেলতে পারবে। ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৩৬ দলের চ্যাম্পিয়নস লিগ করার পাশাপাশি প্রথম রাউন্ড একেবারেই পাল্টে ফেলেছে উয়েফা। আলাদা গ্রুপের প্রথা ভেঙে একক পয়েন্ট তালিকা নিয়ে এসেছে তারা। যে পয়েন্ট তালিকায় অবস্থান বিবেচনার মাধ্যমে নকআউট বা শেষ ষোলোতে যেতে পারবে দলগুলো।
টেবিলের শীর্ষ আট দল সরাসরি চলে যাবে শেষ ষোলোতে। বাকি আট দল নির্ধারণ হবে প্লে অফের মাধ্যমে। পয়েন্ট টেবিলের ৯ থেকে ২৪ নম্বর- এই ১৬ দলের মধ্যে যারা নকআউট প্লে-অফ পর্ব জিতবে, তারা যোগ দেবে সরাসরি সুযোগ পাওয়া ওই আট দলের সঙ্গে। এই প্লে-অফের প্রতিপক্ষ নির্ধারণ হবে ড্রয়ের মাধ্যমে।
এ কারণে প্রথম রাউন্ডে ম্যাচের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আগে গ্রুপ পর্বে হতো ৯৬ ম্যাচ, আর এবার প্রথম পর্বে ম্যাচের সংখ্যা ১৪৪টি। পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষ আট দলের সঙ্গে প্লে অফ জিতে যাওয়া আট দল মিলিয়ে শুরু হবে শেষ ষোলোর লড়াই। এরপর আগের ফরম্যাটেই এগোবে চ্যাম্পিয়নস লিগ। শেষ ষোলোতে দুই লেগ মিলিয়ে জয়ী দল চলে যাবে কোয়ার্টার ফাইনালে। এরপর সেমিফাইনাল ও ফাইনাল।
বেড়েছে প্রাইজমানি
পরিবর্তন আছে আরও। প্রথমবারের মতো জানুয়ারিতে হবে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচ। এছাড়া প্রাইজমানি বাড়ানো হয়েছে মোট পুরস্কারের ২৫ শতাংশ। তাতে প্রাইজমানি এখন বেড়েছে ২৫০ কোটি ইউরো।
এবারের চ্যাম্পিয়ন দল পেতে পারে ১৫ কোটি ইউরো। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া চূড়ান্ত পর্বে সুযোগ পাওয়া প্রতিটি দল পাবে ১ কোটি ৮৬ লাখ ইউরো করে। প্রতিটি জয়ের জন্য ২১ লাখ ও ড্রয়ের জন্য থাকবে ৭ লাখ ইউরো।
কেন এত পরিবর্তন
ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের চাহিদা অনুযায়ীই চ্যাম্পিয়নস লিগে পরিবর্তন এনেছে উয়েফা। প্রতিযোগিতাটি আরও আকর্ষণীয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার লক্ষ্য তাদের। তবে এখানে মুখ্য বিষয় হলো অর্থ।
চ্যাম্পিয়নস লিগ আকর্ষণীয় সব ম্যাচ উপহার দিয়ে বাড়িয়েছে প্রাইজমানি। এখন পরিমাণটা হাজার হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। তবে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর চাহিদা আরও বেশি। প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাপকাঠিতে সবাই সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। এজন্য খেলোয়াড় কিনতে আরও টাকার প্রয়োজন।
দর্শক চাহিদার সঙ্গে অর্থের জোগানোর ব্যবস্থা করতে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো সুপার লিগ আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল। উয়েফার নিষেধাজ্ঞা কিংবা সমর্থকদের তোপের মুখে পড়ায় ওই লিগ এখনও আলোর মুখ দেখিনি।
ওদিকে উয়েফাও কাজ শুরু করে দেয় চ্যাম্পিয়নস লিগ নিয়ে। কীভাবে প্রতিযোগিতাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে ক্লাবগুলোর আয়ের পরিমাণ বাড়ানো যায়, সেই পরিকল্পনা শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে মে মাসে নতুন কাঠামো চূড়ান্ত করে উয়েফা।
