সুখ বলিয়া কি কিছু আছে? মান্না দের গানের মতন—‘সবাই তো সুখী হতে চায়’। মহাভারতে দুর্যোধন যখন আত্মীয়দের হটাইয়া অখণ্ড রাজ্য অর্জন করিলেন তখন তাহার পিতা ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করিলেন—এখন হইয়াছ সুখী? দুর্যোধন দম্ভ ভরিয়া বলিয়াছেন—‘সুখ চাহি নাই মহারাজ! জয়, জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।’ সুতরাং সুখ বলিয়া কিছু আছে কি না এবং তাহার স্থায়িত্ব কতখানি—ইহা চিরাচরিত এক জিজ্ঞাসা। এইজন্য গুণীজনেরা বলিয়া থাকেন—সুখের দরকার নাই, স্বস্তিই যথেষ্ট। অর্থাত্ স্বস্তির সহিত জীবন পার করিয়া দেওয়াটা কম সৌভাগ্যের নহে।
আমরা যত তথাকথিত সভ্য এবং আধুনিক হইতেছি, ততই যেন স্বস্তিময় জীবন চলিয়া যাইতেছে বহু যোজন দূরে। সুখে বা স্বস্তিতে থাকিবার জন্য এই সময়ে তাই গবেষণাও হইতেছে বিস্তর। এমনই একটি গবেষণার কথা জানাইয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষকরা বলিয়াছেন—সুখী হওয়াটা একটি চর্চার বিষয়। অর্থাত্ একজন মানুষের মৌলিক চাহিদা মিটাইবার মতো সবকিছু থাকিলেও তিনি সুখী নাও হইতে পারেন। আবার কাহারো খুব সামান্য কিছু থাকিলেও তিনি সুখী হইতে পারেন। প্রাসঙ্গিক আমাদের মনে পড়িয়া যাইতে পারে সেই সুখী মানুষের জামার গল্পটি—যেইখানে রাজার এমন অসুখ হইয়াছিল যে রাজচিকিত্সক নিদান দিলেন একটি ‘সুখী মানুষের জামা’। নিদান অনুযায়ী রাজ্যব্যাপী সুখী মানুষ খুঁজিতে গিয়া যাহাকে পাওয়া গেল, দেখা গেল সেই সুখী মানুষের কোনো জামা নাই। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য সুখী হওয়ার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়াছেন। সেইখানে বলা হইয়াছে—প্রথমত, একটি ‘কৃতজ্ঞতা’র তালিকা তৈরি করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, খুব ভালো মানের ঘুম হইতে হইবে। যদিও ইহা একটি বিতর্কিত বিষয়। ইহাকে একটি কৌতুকের সহিত তুলনা করা যায়। এক যুবকের চুল পড়িতেছিল খুব বেশি। চিকিত্সক জানাইলেন, দুশ্চিন্তায় আপনার চুল পড়িতেছে। অতঃপর যুবকের নিকট চিকিত্সক জানিতে চাহিলেন—কীসের এত দুশ্চিন্তা? যুবক বিরস বদনে বলিলেন—চুল পড়িতেছে ইহাই তাহার সবচাইতে বড়ো দুশ্চিন্তা। স্পষ্টতই ইহা অনেকটা ভাইস-ভার্সার মতো। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় আরো বলিয়াছে ‘ধ্যান’ করিবার কথা। প্রতিদিন ১০ মিনিট ধ্যান করিলে উহা নাকি সুখী হওয়ার জন্য অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। কারণ হিসাবে বলা হয়, ধ্যানের সময় একজন মানুষকে পূর্ণ মনোযোগ প্রদান করিতে হয়, যাহা তাহাকে সুখী হইতে সাহায্য করিতে পারে। ঐ গবেষকদের মতে, পরিবার ও বন্ধুদের সহিত বেশি বেশি সময় কাটানোটাও সুখী হওয়ার পথকে সুগম করে। কারণ, গবেষণায় পরিষ্কার একটি বিষয় দেখা গিয়াছে যে, পরিবার ও বন্ধুদের সহিত ভালো সময় কাটাইলে সুখের অনুভূতি বৃদ্ধি পায়। আর শেষ পরামর্শ হিসাবে বলা হইয়াছে, ইন্টারনেটে সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগের পরিবর্তে বাস্তবে এই যোগাযোগ বৃদ্ধি করিতে হইবে। কারণ, সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গিয়াছে, যাহারা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মতন সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যম ব্যবহার করেন, তাহারা, যাহারা এইগুলি খুব বেশি ব্যবহার করেন না, তাহাদের চাইতে কম সুখী।
সুতরাং পাওয়া গেল সুখের সূত্র, এইবার জোগাড় করা যায় একমুঠো সুখ? নাকি সুখ আসলে স্টেট অব মাইন্ড?
