সাধারণত বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটিয়া থাকে। অধিক বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ের মাটি আলগা হইয়া পাহাড়ধস ঘটে। এইবারও বর্ষা শুরু হইতেই পাহাড়ধসের আশঙ্কা করা হইতেছে। পাহাড়ধস মূলত চট্টগ্রাম, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ঘটে। এই বত্সরও কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসের আশঙ্কার খবর প্রকাশিত হইয়াছে সহযোগী একটি পত্রিকায়। ইহার কারণ অনুসন্ধান করিলে দেখা যাইবে, কারণটি মনুষ্যসৃষ্ট। বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য এলাকায় পাহাড় কাটা হইয়াছে অপরিকল্পিতভাবে। রোহিঙ্গাদের আগমনের পর তাহা তীব্র হইয়া উঠিয়াছে। মানুষের এই অপরিণামদর্শী কাজের ফলও নামিয়া আসিয়াছে মানুষেরই উপরে। পাহাড়ধসে প্রাণহানি রোধে স্থানীয় প্রশাসন নিচু এলাকা ও পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিতদের নিরাপদে সরিয়া যাইতে মাইকিং করা হইতেছে। জানা গিয়াছে, এক সপ্তাহ ধরিয়া সেখানে ভারী বর্ষণ চলিতেছে, যে কোনো মুহূর্তে ঘটিতে পারে পাহাড়ধসের ও প্রাণহানির ঘটনা। স্বেচ্ছায় না সরিলে অভিযানের মাধ্যমে স্থানীয়দের সরানো হইবে বলিয়া হুঁশিয়ারিও দেওয়া হইয়াছে প্রশাসনের পক্ষ হইতে।
প্রশাসনের এই তত্পরতাকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু কেবল শেষ মুহূর্তে সক্রিয়তা প্রদর্শনই যথেষ্ট নহে, প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে আরো মনোযোগ প্রদান করিতে হইবে। যেহেতু পাহাড়ধস মূলত একটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, সেহেতু এই দুর্যোগ রোধে আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। যথেচ্ছভাবে পাহাড় কাটা, পাহাড়ে বৃক্ষ ধ্বংস করা বন্ধ করিতে হইবে। প্রয়োজনে পাহাড় কাটা হইলেও যেন পাহাড় শাসন সঠিকভাবে করা হয়। উন্নত দেশসমূহে পাহাড় ভেদ করিয়া টানেল দিয়া যানবাহন চলাচল করিতে দেখা যায়। আমরাও সেইরূপ পাহাড় কাটিতে পারি পাহাড়কে রক্ষা করিয়া। যে কোনোভাবেই হউক, পাহাড়ধসের ঘটনা রোধ করিতে হইবে। কারণ ইহাতে প্রাণ হারাইতেছেন অনেকেই। ২০০৭ সালের ১১ জুন ঘটে যাওয়া পাহাড়ধসে যেই অবস্থার সৃষ্টি হয় তাহা বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি। এই দুর্যোগে পৃথক সাতটি স্থানে পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। এরপর ২০১১ সালের ১ জুলাই বাটালি হিলের প্রতিরক্ষা-দেওয়াল ধসিয়া নিহত হন ১৭ জন। ২০১২ সালের ২৬ জুন পাহাড়ধসে প্রাণ হারান ১৮ জন। ২০১৭ সালে ১২০ জনের মৃত্যু ঘটে। রাঙ্গামাটি সড়ক জনপথ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে রাঙ্গামাটি জেলায় প্রায় ১২৮টি স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটিয়াছে এবং পাঁচটিরও অধিক স্থানে সড়ক ভাঙিয়া গিয়াছে। ইহাতে নিহতের সংখ্যা ১১ জন। এইভাবে প্রতি বত্সরই চলিতেছে পাহাড়ধস আর দীর্ঘ হইতেছে নিহতের তালিকা।
২০০৭ সালের পাহাড়ধসের ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করিয়া গঠিত হয় ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি’। তাহারা পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ, পুনর্বাসন ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও ঘোষণা প্রদান করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে দেখা যায় নাই। পাহাড় কাটা রোধে বন মন্ত্রণালয় ও সিডিএ কর্তৃপক্ষ ২০০৫ সালে একটি সার্কুলার জারি করিয়াছিল। ১০০টির বেশি মামলাও দায়ের হয়। কিন্তু তাহা আর আগায়নি। আমরা আশা করি পাহাড়ধস রোধে কর্তৃপক্ষ দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে।
