ইন্দো চীন বাণিজ্যযুদ্ধে প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৯, ২১:৩৯

মাহমুদুর রহমান মানিক

বিশ্ব এখন বাণিজ্যনির্ভর, বিশ্ব রাজনীতির বড়ো শক্তিগুলো রাজনীতিকে এক পাশে রেখে বাণিজ্যের উপর গুরুত্বারোপ করছে। শুধু বাণিজ্যের উপর গুরুত্বারোপই নয় পার্শ্ববর্তী ছোটো ছোটো দেশগুলো নিয়ন্ত্রণও করছে বাণিজ্যের মাধ্যমে। আর অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোও বৃহত্ শক্তির বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে উপকৃত হচ্ছে। একবিংশ শতকে এসে পৃথিবী আর যুক্তরাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণে নেই, অঞ্চলভেদে বিভিন্ন দেশ বাণিজ্যের মাধ্যমে তার পার্শ্ববর্তী ছোটো দেশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপে জার্মানি ও রাশিয়া, এশিয়ায় চীন, জাপান ও ভারতের মতো দেশগুলো নিজ নিজ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ বাণিজ্য ও একটি বড়ো বাজার ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি মিলবে না।

আমাদের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় চীন ও ভারত রীতিমতো বাণিজ্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। ১৯৫০-এর দিকে ইন্দো-চীন ভাই ভাই স্লোগান কাশ্মীর, তিব্বত ও ডোকলাম প্রশ্নে অনেকটাই ভাটা পড়েছিল। এ দুদেশের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব্ব এখনো বিদ্যমান, এ যুদ্ধ এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্য প্রসারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিকে রূপ নিয়েছে। চীন তার বাণিজ্য নীতি ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর) ও ভারত তার প্রাচীন কটন রোডকে নিয়ে ঘোর বাণিজ্য পরিকল্পনা সাজাচ্ছে, যার ফলে উপকৃত হবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াসহ পৃথিবীর প্রায় ৬৫টি দেশ। চীনের মতো ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী  নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের সঙ্গে ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে বাণিজ্যের প্রসার ও বিনিয়োগে নজর দিয়েছেন।

বিশ্ব অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি চীন ও পঞ্চম বৃহত্তম শক্তি ভারতের বাণিজ্য যুদ্ধের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে উভয় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসবে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি সবচেয়ে বেশি ভারতের সঙ্গে একই অবস্থা। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও যেকোনো কাজে সাপোর্টের জন্য উভয় দেশের কাছেই বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। চীনের স্ট্রিং অফ পার্লস ও ভারতের কটন রোডের যে পরিকল্পনা তাতে বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগর ব্যতিরেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আর এই ফ্যাক্টরই কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দরের দিকে নজর রয়েছে ভারত ও চীনের, উভয় দেশই তাদের পণ্য আমদানি রপ্তানিতে ব্যবহার করতে চায়। এই সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশ কয়েক হাজার কোটি টাকা ট্রান্সশিপমেন্ট ও চার্জ বাবদ আয় করতে পারবে। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে চীন ভারত উভয় দেশই শক্তি বাড়াচ্ছে, নীতিনির্ধারকদের বহুপাক্ষিক নীতির মাধ্যমে দুদেশের কাছ থেকে বুঝে নিতে পারবে প্রাপ্য সুবিধা। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট অথবা বিনা শুল্কে ভারত ও চীনে পণ্য রপ্তানি করা। ইন্দো-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের জন্য দুটো দেশই বাংলাদেশকে হাতে রাখার জন্য এ সুবিধা দিতে পারে। ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ দেশে উত্পাদিত নতুন নতুন কৃষিজ ও শিল্প পণ্য নিয়ে হাজির হতে পারবে ক্রয়ক্ষমতায় শীর্ষে অবস্থানকারী দেশ চীন ও ভারতের মতো বিশাল অর্থনীতির বাজারে। ২০২৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের লিস্টে প্রবেশ করবে এজন্য চাই প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের পাশাপাশি দেশের ইনফ্রাস্ট্রাকচারের উন্নয়নে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। নয়া বাণিজ্যিক বিশ্বে চীন ভারতের অর্থ ব্যবহূত হচ্ছে সুদূর আফ্রিকাতে। এসব দেশের ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব। ভারত চীনের বাণিজ্য যুদ্ধের জন্য এসব দেশের সরকার প্রধানরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। সম্ভাবনাময় একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ। কারণ কাঁচামাল, জনশক্তি সবই এখানে অল্প মূল্যে পাওয়া যায় এবং গত এক দশক ধরে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীলতা দেশকে আরো সম্ভাবনাময় একটি দেশে রূপান্তর করেছে। তাদের এই বিনিয়োগ দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি ভূমিকা রাখবে জাতীয় অর্থনীতিকে আরো সমৃদ্ধ করতে। আমাদের জ্বালানি সমস্যা দীর্ঘদিনের আর এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে, ভারত এবং চীন উভয় দেশই বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে চীনের সান্নিধ্য বিশ্ব আসরে আমাদের অবস্থান আরো শক্ত করছে। ঐতিহাসিক বন্ধু রাষ্ট্র ও ভূরাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত দেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইন্দো চীন বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় প্রাপ্তির সম্ভাবনা নিশ্চিত করবে। অর্থাত্ ছোটো দেশ হিসেবে ভারত ও চীনের প্রভাব বলয়ের মধ্যে না পড়ে দুদেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।