রাজপথে রিকশা বন্ধ :কতটুকু যৌক্তিক

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৯, ২১:৪০

তাহমিদ উল ইসলাম

রাজধানীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন গতকাল রিকশাচালকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের এক জায়গায় পড়ে থাকলে চলবে না। গ্রামে ধান কাটার মানুষ পাওয়া যায় না। পৃথিবীর কোনো দেশে রাজধানীতে রিকশা চলে না।’ নগরবাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানান, ‘অল্প দূরত্বের পথ হেঁটে চলুন। স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।’

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। এ বছরই আমাদের কৃষকরা ধানের ন্যায্য দাম পাননি। প্রতিবাদ করেন, ক্ষেতে আগুন দিয়ে। এই হলো কৃষকদের অবস্থা। যদি কৃষিকাজ করা লাভজনক হতো, ভালোভাবে বাঁচতে পারত কৃষক গ্রামেই, তাহলে তো আর শহরে এসে বস্তিতে থাকত না? ধান কাটা যদি লাভজনকই হতো, কৃষক যদি ন্যায্য দাম পেত ধানের, তাহলে কি আর সে ঢাকায় এসে রিকশা চালাত?

পৃথিবীর কোনো দেশে রাজধানীতে রিকশা চলে না। কিন্তু আর দশটা দেশের রাজধানীর সঙ্গে ঢাকার তুলনা হয় কীভাবে? এই শহরে যানজট? বায়ুদূষণ জীবনযাত্রার মান? এসব কি বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো? উন্নত বিশ্বে নগরের ফুটপাত কি দখল হয়ে আছে অবৈধ ব্যবসায়ীদের হাতে?

বিশ্বের বহু দেশেই এত নির্মম অবস্থা আমরা দেখতে পাই না। তাহলে কেন আমাদের ঐ সব দেশকে অনুকরণ করতে হবে? আমরা কি পারি না আমাদের নিজেদের মতো করে সমাধান খুঁজে নিতে?

নগরবাসীকে অল্প দূরত্বে মেয়র সাঈদ খোকন হাঁটতে বলেছেন। কিন্তু ঢাকার সড়ক কি সত্যিই হাঁটার উপযোগী? বাদ দিলাম অন্য সড়কের কথা। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, হর্নের আওয়াজ আর শব্দ দূষণে আমার ক্যাম্পাসেই আমি হেঁটে চলতে পারি না নির্বিঘ্নে। অন্যান্য সড়কেও তো হাঁটা যায় না ফুটপাত দখল হয়ে থাকার কারণে। আর এই পরিস্থিতিতে একজন মানুষ যে বাসে যাবে, তাও সম্ভব না। রাজধানীর সিটিং বাসগুলো অনেক সময়ই অল্পদূরত্বের যাত্রী বহন করতে রাজি হয় না। আর লোকাল বাসে বহন করা হয় অতিরিক্ত যাত্রী আর সেই অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী লোকাল বাসও সব সময় পাওয়া যায় না। বৃদ্ধ ব্যক্তি, অসুস্থ রোগী বা পিরিয়ড চলাকালীন অবস্থায় নারীদেরও হেঁটে চলা খুব সহজ ব্যাপার নয়। ঢাকায় সিটিং বাস বলে যে বাসগুলো চলে, তাতেও প্রায় সময়ই লোকাল বাসের মতো অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়। এই শহরে যে পরিমাণ প্রাইভেটকার নামানো হয়েছে, তা কি সত্যিই অপরিহার্য? দুটি প্রাইভেটকার একটি বাসের জায়গা দখল করে। অথচ একটি বাসে চল্লিশজন যাত্রী যাতায়াত করতে পারলেও প্রাইভেটকারে করতে পারে আটজন, অবশ্য, সে পরিমাণ যাত্রীও আমরা দেখি না প্রায় সময়ই। অথচ এই প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিনিয়ত বহিরাগত যান চলাচলে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, সেটিইবা কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে?

সুতরাং রাজপথে রিকশা বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান না। বরং প্রাইভেটকারের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে গিয়েছে। হর্নের নিয়ন্ত্রণ চাই; বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতাল এলাকায়। বাড়াতে হবে পাবলিক পরিবহনের সংখ্যাও। যানজট নিরসনে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ দরকার বেশি বেশি। রিকশার জন্য আলাদা লেন করলে সেটি যানজট নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে বলে মনেকরি। ফুটপাতে হাঁঁটার পরিবেশ তৈরি করা চাই। হকার ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দখল থেকে মুক্ত করতে হবে আমাদের হাঁটার পথকে। চাই গ্রামের কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্যও, যাতে শহরে বস্তি তৈরি না হয়। এই দেশে বাঁচার অধিকার আছে প্রতিটি শ্রেণি, পেশার মানুষের।

n লেখক :শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।