জাবালাবি

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৯, ১৮:৩২

শেষ পর্যন্ত আমি ঠিক করলাম যে শাইখ জাবালাবিকে আমার খুঁজে বের করতে হবে।

সর্বপ্রথম একটা গানের লাইনে আমি জাবালাবির নাম শুনতে পাই :

‘পৃথিবীর কী হয়েছে জাবালাবি?

তারা পৃথিবীকে ওলটপালট করে ফেলেছে আর নিচ্ছে এর স্বাদ’

 শিশুকালে এটা আমার খুব প্রিয় একটা গান ছিল। শিশুরা যেভাবে তাদের বাবাকে বিরামহীন প্রশ্নে জর্জরিত করে আমিও সেভাবে একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম—

‘জাবালাবি কে?’

মনে হলো বাবা আমার দিকে একটু দ্বিধা নিয়ে তাকালেন। ভাবছিলেন হয়তো আমি তাঁর উত্তর নেওয়ার মতো সক্ষম কি না। যা-ই হোক, তিনি উত্তরে বললেন, ‘তাঁর করুণা তোমার ওপর বর্ষিত হোক। তিনি একজন খোদার সাধু বান্দা। দুঃখ ও সমস্যা দূরকারী। তিনি না থাকলে আমি নিশ্চিত ধ্বংস হয়ে যেতাম।’

এরপর থেকে অসংখ্যবার এই সাধু দরবেশের প্রশংসা আর অলৌকিক ক্ষমতার কথা বাবার মুখে শুনেছি আমি। একবার আমার খুব অসুখ হলো। কিছুতেই সেই অসুস্থতা থেকে মুক্তি পাচ্ছিলাম না। সবকিছুর চেষ্টা শেষ করে প্রায় হতাশ যখন হয়ে পড়লাম, তখন আমার ছেলেবেলার সেই সাধু দরবেশের কথা মনে পড়ল। নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার কি শায়েখ জাবালাবির কাছে যাওয়া উচিত না?’

বাবার সঙ্গে যখন কথা বলতাম, তখন মনে পড়ে বাবা বলেছিলেন যে ধর্মীয় কোর্টের আইনবিদ শেখ কামারের সঙ্গে দরবেশ জাবালাবির জানাশোনা আছে।

আমি শেখ কামারের বাড়িতে গেলাম। বাড়ির নিচে একজন মটরশুঁটি বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম শেখ কামারের কথা।

‘শেখ কামার!’ খুব অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে মটরশুঁটি বিক্রেতা বলল, ‘বছর তিন হলো এখান থেকে চলে গেছেন তিনি। লোকে বলে শেখ কামার এখন গার্ডেন সিটিতে থাকেন। আর তাঁর অফিস হলো আল আজহার স্কয়ারে।’

আমি ঠিকানা নিয়ে শেখ কামারের অফিসে গেলাম। শেখ কামারের কথা জিজ্ঞেস করতেই আমাকে একটা কক্ষের দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। খুব সুন্দর একটা কক্ষে আমি হাজির হলাম। একজন লোক বেশ উষ্ণ অভ্যর্থনায় আমাকে গ্রহণ করলেন। দামি চেয়ারে বসতে বললেন। লোকটা হয়তো ভাবছেন আমি কোনো দামি ক্লায়েন্ট হতে পারি। মনে মনে আমি বেশ অপ্রস্তুত হয়ে উঠলাম। তাঁর মূল্যবান সময় নষ্ট করার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না।

‘আপনাকে স্বাগতম।’ তিনি কথা বলা শুরু করলেন।

‘আমি আপনার পুরাতন বন্ধু শেখ আলি আল তাতাবির ছেলে।‘ নিজের অবস্থা পরিষ্কার করার জন্য আমি বললাম।

তিনি আমার দিকে তাকালেন আর তাতে নিশ্চিত একটা নিস্পৃহভাব ফুটে উঠল। তবে মনে হলো তিনি আমার ওপর থেকে আশা হারাতে চাইছিলেন না।

‘আল্লাহ তাঁর আত্মাকে শান্তিতে রাখুক। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন।’ তিনি বললেন।

এবার অবশ্য কষ্টকর কথাটা আমাকে বলতে হবে।

‘বাবা আমাকে শায়েখ জাবালাবি নামের একজন দরবেশের কথা বলেছিলেন। আপনার বাসাতেই সেই দরবেশের সঙ্গে বাবার সাক্ষাত্ হয়েছিল। তিনি যদি বেঁচে থাকেন তাঁকে আমার খুব দরকার।’ আমি বললাম।

আমার কথা শুনে তাঁর চেহারায় চূড়ান্ত অনীহা ভাবটুকু ফুটে উঠল।

‘এটা তো অনেক আগের কথা।’ তিনি কথা শেষ করতে চাইলেন।

আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তিনি কি সত্যিই একজন দরবেশ ছিলেন?’

‘আমরা তাঁকে একজন অলৌকিক ক্ষমতার মানুষ বলে মনে করতাম।’

দরজার দিকে পা বাড়িয়ে আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাঁকে কোথায় পেতে পারি?’

আমার জানামতে তিনি এখন আল আজহারের বিরগাবি বাসায় থাকেন।’ শেখ কামার টেবিলের ওপর রাখা কাগজের স্তূপে মন দিলেন। বোঝাতে চাইলেন তিনি আর কথা বলবেন না। আমি মাথা নত করে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে এলাম।

বিরগাবি আবাসিক ভবনে গেলাম আমি। খুব জনবহুল এলাকায় বাসা। যত্নের অভাবে জীর্ণ হয়ে আছে। বাসায় ঢোকার মুখে একজন লোক সৃষ্টিতত্ত্ব আর মরমিবাদের ওপর পুরাতন কিছু বই বিক্রি করছেন।

জাবালাবির কথা জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার দিকে সরু চোখে তাকালেন। তারপর খুব অবিশ্বাসের সুরে বললেন, ‘শায়েখ জাবালাবি! আহ্ তিনি এই বাসাতেই থাকতেন যখন এটা বাসযোগ্য ছিল! তাঁর সঙ্গে আমার কত কথা হয়েছিল। তাঁর উপস্থিতিতে আমি আশীর্বাদপুষ্ট হয়েছিলাম। তিনি এখন কোথায় আছেন কে জানে?’

লোকটা মন খারাপ করে তাঁর কাঁধ ঝাঁকালেন। তারপর আমাকে ফেলে ক্রেতাদের দিকে চলে গেলেন।

আমি সেখানকার অনেক দোকানদারকে জাবালাবির কথা জিজ্ঞেস করলাম। অধিকাংশ লোকজনই তাঁর কথা জানে না বা শোনে নাই কিছু। কেউ কেউ অবশ্য তাঁকে নিয়ে মজা করল আবার কেউ কেউ ভণ্ড পণ্ডিত বলল। অনেকে আমাকে পরামর্শ দিল—আমি যেন ডাক্তারের কাছে যাই।

দিন যতই যাচ্ছিল অসুস্থতার কারণে আমার ব্যথার প্রকোপ তত বাড়ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম বেশিদিন হয়তো আমি এভাবে থাকতে পারব না। জাবালাবির কথা আমার আবার মনে পড়ল।

হঠাত্ মনে পড়ল, স্থানীয় একজন শেখের কাছ থেকে আমি সাহায্য নিতে পারি। অবাক হলাম এটা ভেবে যে কেন বিষয়টা আমার প্রথম মনে পড়ল না।

তাঁর অফিসটা আসলে ছোট্ট একটা দোকান। একটা টেবিল চেয়ার, টেবিলের ওপর টেলিফোন। তিনি একজন লোকের সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমি অপেক্ষা করলাম। লোকটা চলে যাওয়ার পর শেখ আমার দিকে তাকালেন। আমার কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাকে খুশি মনে গ্রহণ করলেন।

‘শায়েখ জাবালাবিকে আমার খুব দরকার।’ তাঁকে আমার প্রয়োজনের কথা বললাম।

তিনি আমার দিকে খুব অবাক হয়ে তাকালেন। যেভাবে ইতিপূর্বে সবাই তাকিয়েছিল।

সোনালি দাঁত বের একটা হাসি দিয়ে তিনি বললেন, ‘তিনি এখনো বেঁচে আছেন। তবে দুঃখের কথা হলো, তাঁর কোনো স্থায়ী আবাস নেই। তাঁকে খুঁজে কোনো লাভ নেই।’

‘আপনিও তাঁকে খুঁজে পান নাই?’

‘হ্যাঁ, আমিও খুঁজে পাইনি। তবে আল্লাহকে ধন্যবাদ তিনি এখনো বেঁচে আছেন।’

তিনি আমার দিকে জিজ্ঞাসুচোখে তাকিয়ে বললেন, ‘মনে হয় তোমার বিষয়টা খুব গুরুতর।’

‘খুবই গুরুতর।’

‘আল্লাহ তোমার সুচিকিত্সা দান করুন। তুমি একটু ধারাবাহিকভাবে খোঁজ করে দেখো।’ তিনি টেবিলের ওপর কতগুলো কাগজ রেখে বললেন, এখানে এই এলাকার সব বাড়ির মানচিত্র নাম্বার রোড সবকিছু দেওয়া আছে। এটা হলো আবাসিক এলাকা, এখানে আতর ব্যবসায়ী থাকেন, এই হলো পুলিশ আর ফায়ার স্টেশন। এটা তোমার জন্য সেরা গাইডলাইন হবে। প্রতিটা ক্যাফেতে খুব সাবধানে খোঁজ লাগাও, মসজিদ আর ইবাদতখানার যে সমস্ত জায়গায় দরবেশরা যাতায়াত করেন সেখানে নজর দাও, ভিক্ষুকদের দলের ভেতর খোঁজ করো। আমি নিজেও তাঁকে দীর্ঘদিন দেখি নাই। তোমার খোঁজ করার কথা শুনে আমার যৌবনের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল।’

আমি এলাকার ম্যাপগুলোর দিকে হতবিহ্বল হয়ে তাকালাম।

টেবিলে ফোন বাজছে। তিনি ফোন রিসিভ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এগুলো নিয়ে যাও।

ম্যাপগুলো ভাঁজ করে নিয়ে এলাকার পরিচিত আধাপরিচিত সব জায়গায় আমি খোঁজ লাগাতে শুরু করলাম।  শেষ পর্যন্ত একজন লোককে পেলাম। তিনি বললেন, ‘উম্মুল গোলাম সড়কে ক্যালিগ্রাফার হাসসানিনের কাছে যাও। তাঁরা বন্ধুস্থানীয় ছিলেন।’

উম্মুল গোলামে গেলাম। সেখানে বুড়ো হাসসানিনকে দেখলাম একটা সংকীর্ণ দোকানে সাইনবোর্ড নিয়ে কাজ করছেন। আঠা রং আর তরলের মিশ্রণে অদ্ভুত একটা গন্ধ চারপাশে। এর মাঝে তিনি আল্লাহ শব্দটা একটা সিলভারের পাতে লিখছেন। খুব মনোযোগ দিয়ে তিনি কাজ করছেন।

আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ালাম। ভয় পাচ্ছিলাম তাঁর কাজে আবার ব্যাঘাত না ঘটে। একটু পর মনে হয় তিনি বিষয়টা টের পেলেন। তিনি ভদ্রভাবে আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিছু বলবে?’

তিনি আমার উপস্থিতি টের পেয়েছেন—এটা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম, ‘আমি শুনেছি শায়েখ জাবালাবি আপনার বন্ধু ছিলেন। আমি তাঁকে খুঁজছি।’

তাঁর হাতের কাজ থেমে গেল। তিনি এবার বেশ অবাক হলেন।

‘জাবালাবি! সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।’ তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

‘তিনি কি আপনার বন্ধু ছিলেন না?’ আমি আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করলাম।

‘সেটা অনেক আগের কথা। তিনি খুব রহস্যময় লোক ছিলেন। তিনি তোমার সাথে এমনভাবে দেখা করতেন যে লোকে ভাবত তিনি তোমার খুব কাছের কেউ। আবার তিনি এমনভাবে মিলিয়ে যেতেন যে মনে হতো তিনি কখনো বেঁচে ছিলেন না। দরবেশদের দোষ দেওয়া যায় না।’

একটা আশার বাতি দপ করে জ্বলে আবার নিভে গেল।

‘তিনি আমার সাথে সবসময় ছিলেন। আমি যা কিছু করি সবকিছুতেই তাঁকে অনুভব করি। কিন্তু তিনি এখন কোথায়?’ লোকটা বলল।

‘তিনি কি বেঁচে আছেন?’

‘নিঃসন্দেহে তিনি বেঁচে আছেন। তাঁর জন্যই আমি আজও সবচেয়ে সুন্দর সুন্দর লেখার চিত্রগুলো করতে পারছি।’

‘আল্লাহ ভালো জানেন। কেউ বুঝতে পারবে না তাঁকে আমার কত প্রয়োজন। আর আপনার চেয়ে ভালো আর কেউ তাঁকে চিনতেও পারছে না।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ। আল্লাহ তোমাকে সুস্থতা দান করুন। শায়েখ জাবালাবির বিষয়ে লোকে যা বলে তিনি তার চেয়েও বেশি সত্য ছিলেন।’

তিনি আরো বিস্তৃত হাসি দিয়ে বললেন, ‘তাঁর মুখমণ্ডলে এমন একটা সৌন্দর্য ছিল—যা কখনো ভোলার না। কিন্তু তিনি এখন কোথায় আছেন কে বলতে পারে?’

আমি তাঁর হাত দুটো ঝাঁকিয়ে উঠে পড়লাম। সেই এলাকার পূর্ব থেকে পশ্চিমে সব জায়গায় খোঁজ লাগালাম।  শেষ পর্যন্ত একজন খড় বিক্রেতা আমাকে বলল, তিনি অল্প কিছুদিন আগে শায়েখ গাদের বাড়িতে জাবালাবির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। শায়েখ গাদ একজন খ্যাতিমান গীতিকার।

তাবাকশিয়াতে এই সংগীতবাদকের বাড়িতে আমি গেলাম। তাঁর বাড়িটা বেশ শৌখিনভাবে পুরাতন রীতিতে সাজানো। সামনে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তিনি একটা উঁচু কুশনে বসে ছিলেন। তাঁকে সালাম দিয়ে আমার নিজের বিষয়ে বললাম তাঁকে। তিনি আমাকে বসতে বললেন। কীভাবে আমি তাঁর খোঁজ পেয়েছি এই বিষয়ে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না আমাকে।

আমি বললাম, ‘হে  শায়েখ গাদ, আপনার গান আর সুর মূর্ছনার একজন ভক্ত আমি।’

তিনি মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, ‘ধন্যবাদ।’

‘আপনাকে বিরক্ত করার জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন।’ বিনয়ের সঙ্গে বললাম আমি। ‘আমি শুনেছি শায়েখ জাবালাবি আপনার বন্ধু ছিলেন। তাঁকে আমার খুব দরকার।’

‘জাবালাবি!’ তিনি ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। ‘তাঁকে তোমার দরকার?’ আল্লাহ তোমার সহায় হোন। কে জানে তিনি এখন কোথায়? ও জাবালাবি তুমি কোথায়?’

‘তিনি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসেন না?’ আমি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

‘তিনি কিছুদিন আগে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি হয়তো এখনো দেখা করতে আসতে পারেন। আবার এমনও হতে পারে, মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত তাঁর সঙ্গে আমার দেখা না-ও হতে পারে।’

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাঁকে এমনটা কে বানাল?’

তিনি একটা বাঁশি হাতে নিয়ে বললেন, ‘দরবেশরা হয়তো তাঁকে এমনটা বানিয়েছেন অথবা তাঁরা হয়তো দরবেশও ছিলেন না।’

‘যারা তাঁকে খুঁজে বেড়ায় তারা প্রত্যেকেই কি আমার মতো কষ্ট নিয়ে খুঁজে বেড়ায়?’

‘ব্যথা-বেদনাও কিন্তু রোগমুক্তির অংশ।’

তিনি একটা বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে সেটাতে মন দিলেন। আমি নিজেকে বিড়বিড় করে বললাম, ‘এখানে আসাটাও আমার জন্য ব্যর্থ হলো।’

আমার কথা শুনে তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। একটা বিষয় নিয়ে তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছ বলেই তো আজ আমি তোমাকে আর তুমি আমাকে চিনতে পারলে।’

তাঁর কথা শুনে আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। বিব্রত হয়ে বললাম, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন। আসলে পরিস্থিতির কারণে আর বারবার ব্যর্থ হবার কারণে আমি ভদ্রতাটুকু ভুলে গেছি।’

‘ব্যর্থতার কাছে মাথা নত কোরো না। এই অদ্ভুত লোকটাকে যেই খুঁজতে এসেছে সেই ক্লান্ত হয়েছে। আগে তাঁকে খুঁজে বের করা খুব সহজ ছিল যখন তাঁর আস্তানা সুনির্দিষ্ট করা ছিল। এখন সময় পাল্টেছে। পৃথিবী পাল্টে গেছে। মিথ্যা অভিযোগে পুলিশ তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাঁকে এখন খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন।’

কথা শেষ করে তিনি বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ টুংটাং শব্দ করে নতুন একটা গানে সুর দিতে লাগলেন। গান শেষ করে তিনি আবার বললেন, ‘এক রাতের মধ্যে আমি এই গানটা রচনা করেছিলাম। সেদিন সারারাত জাবালাবি আমার সঙ্গে ছিলেন। এই গানটা তাঁরই নির্বাচন করা ছিল। তুমি এখন যেখানে বসে আছ তিনিও সেখানে বসেছিলেন। কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি আমার বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা শুরু করলেন যেন তিনিও তাদের একজন। কাজ করতে আমি হতাশ হয়ে পড়লে কিংবা কোনো উত্সাহ না পেলে তিনি আমার কাছে এসে বুকে আঘাত করতেন। ঠাট্টা করতেন। মজা করে কিছু বলতেন। আর তারপরই আমি আবার কাজে নেমে গিয়ে সুন্দর একটা গান তৈরি করে ফেলতাম।’

‘তিনি কি সংগীতের বিষয়ে কিছু জানতেন?’

‘তাঁর পুরোটাই সংগীতবহ ছিল। খুব সুন্দর সুরেলা কণ্ঠ ছিল তাঁর। কথা বলতেন খুব মিষ্টি করে। কথা বললেই মনে হতো সেটা যেন সংগীত হয়ে ফুটে উঠছে।’

‘তিনি কীভাবে মানুষের সেই সব রোগ দূর করতেন যে রোগগুলোর বিষয়ে মানুষ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছিল?’

‘এটা খুব গোপনীয় বলা যাবে না। হয়তো তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্ হলে তুমি জানতে পারবে।’

কিন্তু কবে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হবে কে জানে। ঘরের ভেতরে বাচ্চাদের হৈ চৈ-এ ভরে গেল। শায়েখ আবার বললেন, ‘আমি শুনেছি তিনি নাকি ইদানীং ওয়ানাস আল জামানহুরির বাসাতে মাঝে মাঝে যান। তুমি কি তাঁকে চেনো?’

আমি মাথা ঝাঁকালাম। বুকের ভেতর নতুন আরেকটা আশা দানা বেঁধে উঠছে।

‘তিনি আলফি স্ট্রিটে নেগমা বারে মাঝে মাঝে সময় কাটাতে যান রাতের দিকে। তার কাছে গেলে হয়তো কোনো খোঁজ পেতে পারো।’

আমি রাতের জন্য অপেক্ষা করে তারপর নেগমা বারে গেলাম। ওয়েটারকে ওয়ানাস আল জামানহুরির বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। ওয়েটার আমাকে এক কোনায় একজন লোককে দেখাল। আমি দেখলাম একটা টেবিলে দুটো বোতল নিয়ে একজন লোক একা বসে আছে। বোতল একটা খালি। আর বাকিটা দুই তৃতীয়াংশ খালি হয়ে গেছে। সামনে কোনো খাবার বা কিছুই নেই। আমি নিশ্চিত একজন পাঁড়মাতালের সঙ্গে আমি দেখা করতে এসেছি। খুব ধীরে তাঁর কাছে গেলাম আমি। কাছাকাছি হয়ে বললাম, ‘শুভসন্ধ্যা জনাব ওয়ানাস।’ আন্তরিকভাবে তাঁকে অভিভাদন জানালাম।

তিনি আকস্মিকভাবে আমার দিকে ঘুরে তাকালেন। আমি কেন তাঁর কাছে এসেছি, সেটা খুলে বলার আগেই তিনি অত্যন্ত ভদ্রসুরে আমাকে বললেন, ‘প্রথমত দয়া করে আপনি বসুন আর তারপর পান করা শুরু করুন।’

আমি মুখ খুলতে যাব, কিন্তু তিনি দুই কানে আঙুল দিয়ে বললেন, ‘আমি যা বলেছি তা করার আগে আর একটি শব্দও না।’

আমি বুঝতে পারলাম একজন পাঁড়মাতালের কাছে আমি এসেছি।

আমি বসতে বসতে মুচকি হেসে বললাম, ‘আপনাকে কি একটা প্রশ্ন করতে পারি আমি?’

কান থেকে তাঁর দু হাত না সরিয়ে তিনি ইশারা করলেন পানীয়ের বোতলের দিকে।

‘আমার সঙ্গে যে কথা বলতে এসেছে সে আমার মতোই মদ পান করে এবং সে আমার মতোই এটা নিশ্চিত না হয়ে আমি কোনো ধরনের কথায় অংশ নেব না।’ তিনি বললেন।

আমি ইশারায় বললাম যে মদ পান করি না আমি।

‘সেটা আপনার দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু আমার শর্ত হচ্ছে মদ পান করতে হবে।’

তিনি আমার গ্লাস ভরে দিলেন। আমি পান করলাম। মদ আমার পাকস্থলীতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশ তেতে উঠল। তাঁকে বললাম, ‘পানীয়টা খুব স্ট্রং। আমার মনে হয় এখন আমি আপনার বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে পারি।’

তিনি আবার আমাকে থামিয়ে দিয়ে তাঁর কানে দু হাত দিয়ে বললেন, ‘তুমি মাতাল না হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি তোমার কোনো কথা শুনব না।’

তিনি দ্বিতীয়বার আমার গ্লাস ভর্তি করে দিলেন। এক ঢোকে পুরোটা খেয়ে ফেললাম আমি। মদ আমার ইচ্ছেশক্তি নষ্ট করে ফেলল। তৃতীয় গ্লাসে আমি স্মৃতি হারিয়ে ফেললাম। চতুর্থ গ্লাসে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। আমি ভুলে গেলাম কেন আমি এখানে এসেছিলাম। লোকটা আমার দিকে এগিয়ে এলেন। কিন্তু সবকিছুই আমার কাছে অর্থহীন মনে হলো। কতক্ষণ আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমালাম জানি না। ঘুমের মাঝে এত সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখলাম যা আমি আগে কখনো দেখিনি। মনে হলো খুব অজানা গাছে পূর্ণ একটা বাগানে আমি বসে আছি। গাছের ফাঁক দিয়ে নক্ষত্রদের দেখা যাচ্ছে। একটা দোলনায় শুয়ে শুয়ে আমি দোল খাচ্ছি। আমার ভেতরে ভীষণরকমের স্ফূর্তি। সমস্ত পৃথিবীতে মনে হচ্ছে কথা বলা কিংবা নড়াচড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। খুব অল্প সময় এমনটা ছিল। আমি যখন চোখ মেলে তাকালাম, দেখলাম ওয়ানাস আল জামানহুরি খুব উত্কণ্ঠা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।

‘তুমি খুব গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলে। তোমার অনেক ঘুম দরকার।’ আমার সাথী বললেন।

হাত দিয়ে আমার ভীষণ ওজনের মাথাটা উঠালাম আমি। হাত ভিজে গেছে।

‘আমার মাথা ভিজে গেছে।’ আমি বললাম।

‘হ্যাঁ তোমার চুল ভেজা। আমার বন্ধু তোমাকে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছিল।’ ওয়ানাস আল জামানহুরি শান্তভাবে উত্তর দিলেন।

‘এমন অজ্ঞান অবস্থায় আরেকজন আমাকে দেখেছে?’

‘ভয়ের কিছু নাই। যে তোমাকে দেখেছে সে খুব ভালো মানুষ। তুমি কি শায়েখ জাবালাবির কথা শোনো নাই?’

‘জাবালাবি!’ আমি লাফিয়ে উঠলাম নামটা শুনে।

‘হ্যাঁ। শায়েখ জাবালাবি। কোনো সমস্যা?’ ওয়ানাস অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

‘তিনি কোথায়?’

‘আমি জানি না তিনি কোথায় এখন? তবে একটু আগে এখানেই ছিলেন। তারপর চলে গেলেন।’

আমি ছুটে বের হয়ে তাঁকে খুঁজতে চাইলাম। কিন্তু আমার শরীর আমার কল্পনার চেয়েও বেশি ক্লান্ত ছিল। টেবিলে আবার পড়ে গেলাম। হতাশায় চিত্কার করে কাঁদতে শুরু করলাম।

‘আপনার কাছে আমি এসেছিলাম শুধু তাঁর সঙ্গে দেখা করব বলে। দয়া করে কাউকে পাঠিয়ে তাঁকে নিয়ে আসুন। খুব দরকার আমার।’

 লোকটা একজন গলদা চিংড়ি বিক্রেতাকে পাঠালেন শায়েখকে খুঁজে নিয়ে আসার জন্য। আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘আমি খুব দুঃখিত, আপনি যে এত বিপদে আছেন আমি জানতাম না।’

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘আপনি তো আমাকে কথা বলতেই দেননি।’

‘আহা কী দুঃখজনক হয়ে গেল বিষয়টা। তিনি এত সময় আপনার পাশেই বসে ছিলেন। তাঁর এক ভক্ত তাঁকে ফুলের মালা দিয়েছিল, সেটা নিয়ে তিনি বসে বসে খেলছিলেন। তারপর আপনার দিকে খুব দরদ আর সমবেদনা নিয়ে তাকালেন। পানি নিয়ে আপনার চারদিকে ছিটিয়ে দিলেন।’

‘তিনি কি প্রতিরাতেই এখানে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসেন?’ আমি দরজার দিকে লক্ষ রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলাম।

‘তিনি আমার সঙ্গে আজকে রাতে ছিলেন। গত রাতেও ছিলেন। তার আগের রাতেও দেখা করেছেন। তবে তাঁর আগে প্রায় এক মাস তাঁর সঙ্গে আমার কোনো দেখা হয়নি।’

‘হয়তো তিনি আগামীকালও আসতে পারেন।’

‘হয়তো।’

‘তিনি যদি চান আমি তাঁকে পর্যাপ্ত টাকা দেবো।’

‘তিনি কোনো টাকাপয়সা নেন না। তাঁর সঙ্গে দেখা হলে তিনি আপনাকে সুস্থ করে দেবেন।’

যে চিংড়ি বিক্রেতাকে পাঠানো হয়েছিল জাবালাবিকে নিয়ে আসতে সে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে।

আমার শরীরে একটু শক্তি ফিরে আসতে আসতে আমি রাস্তায় নেমে পড়লাম। সব জায়গায় তাঁকে খুঁজলাম। জাবালাবি বলে চিত্কার করে তাঁকে ডাকলাম। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না।

পরের সন্ধ্যায় আমি আবার ওয়ানাসের কাছে গেলাম। কিন্তু শায়েখ আর সেখানে আসলেন না। ওয়ানাস আমাকে বললেন, তিনি দেশের কোনো এক প্রান্তে চলে গেছেন। খুব শিগগির আর কায়রো শহরে আসবেন না।

নিজেকে বললাম যে, আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। জাবালাবির সঙ্গে দেখা হলেই আমার রোগটা সেরে যাবে।

কখনো কখনো দেরি দেখে আমি হতাশায় অস্থির হয়ে যেতাম। কেন আমি নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছি?

আমার ব্যথা যখন বেড়ে যেত তখনই আমি শায়েখ জাবালাবির কথা ভাবতে শুরু করতাম। নিজেকে বোঝাতাম যে আমি যথেষ্ট ভাগ্যবান। তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হবেই। ওয়ানাস আল জামানহুরির বিষয়ে আমি খবর পেলাম যে তিনি দেশের বাইরে চলে গেছেন।

এখন আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত শায়েখ জাবালাবিকে আমার খুঁজে বের করতে হবেই।

হ্যাঁ আাামাকে খুঁজে বের করতে হবে শায়েখ জাবালাবিকে।

নাগিব মাহফুজ : আরবি সাহিত্যের একজন প্রধান কথাশিল্পী এবং আরবি ভাষা ও সাহিত্যের একমাত্র নোবেলজয়ী লেখক। জন্ম মিশরের কায়রোতে। কাসরুল শাওক, আসসুক্কারিয়া, বাইনাল কাসরাইন—এই তিনটি গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।