আলমাটিতে অশ্বদুগ্ধের সন্ধানে

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৯, ১৮:৩৪

আলমাটি শহরের যে পথে এখন চলেছি, তার দু পাশটা ঢেকে রেখেছে বনেদি বাড়ির সুউচ্চ পাঁচিল। সর্পিল এই সড়কটির শেষ মাথায় বহুদূরে ভেসে থাকা শিম্বুলাক পর্বতের তুষারস্নাত চূড়া বাড়ির পেছনকার বাঁশঝাড়ের মতো করে গলা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শহরের কিছুটা বাইরে কোলাহল বিবর্জিত এই ধনাঢ্য লোকেদের বসতভিটাগুলো গুটিয়ে এলে ভূমিরূপ হঠাত্ করেই যেন কিছুটা বদলে যায়। রুক্ষতাকে ঢেকে ফেলে পাহাড়ি ঢালে লটকে থাকা সবুজ ঝোপের দল। গাড়ির একটানা গতিতে আমার হয়তো কিছুটা ঝিমুনি এসেছিল। সেটা টুটে যায় গাড়িটি একটি শার্প টার্ন নেবার কালে। পেছনের দিকে হেলে পড়ায় বুঝি—এবারে সমতলের মায়া কাটাবার পালা। এ পথে দু-চারজন হাইকার আছে। তারা ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের গাড়িটির দিকে তাকায়। যেমন খাড়াপথ দেখছি, এঁরা যে কোন কালে পাহাড়ের চুড়োর সেই হ্রদে পৌঁছাবেন, কে জানে!

গাড়ি হাঁকিয়ে যে স্থানে আমরা এসে থামি, সেখানে জলবিদ্যুত্ প্রকল্পের বাঁধের মতো চওড়া কংক্রিটের বাঁধ। এখানে এসে বাধা পায় হ্রদের জল। পাশে বিশালাকার পাইপের ধারা। সেটিকে নির্দেশ করে ট্যাক্সি ড্রাইভার কারিম জানায়, এভাবেই এখান থেকে জল তুলে পুরো আলমাটি শহরের পিপাসা মেটানো হয়। আমরা দুজনেই একটু উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকাই। কারণ, হ্রদ নজরে এলেও সেটির তটে পৌঁছাবার কোনো সমতল পথ দেখতে পাচ্ছি না। কাঁটাতারের বেড়া টপকে কারিম আমাকে সামনে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিলেও সেটি ঠিক হবে কি না, সেই নিয়ে দোলাচলে থাকি। তবে আশপাশে জনপ্রাণীর নিশানা না দেখে ভাবি, এখানে আইন ফলাতে কে-ই বা আর উদয় হবে? আমি তাই মরা ঘাসের অস্পষ্ট রেখা দেখে দেখে হ্রদের কিনারে হাঁটতে থাকি। বহু নিচের শহরে এই মুহূর্তে দাবদাহ থাকলেও এখানে কিন্তু তার ছিটেফোঁটাও নেই। বরং কোথা থেকে যেন একপাল শীতল সমীরণ এসে খেলা করে অঙ্গপাশে।

দুপুরের আগ্রাসী রোদ পেয়ে অদূরের তিয়েন শান পর্বতের চারটি চূড়া খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। সেখানে কালচে শৈল শিরার অমসৃণ গাত্রে বহু কষ্টে লটকে থাকা হিমবাহের দল সকলের অলক্ষে যেন নেমে আসতে চায় হ্রদের বুকে। তা চাইবেই বা না কেন? ওই হিমবাহ গলা জলই যে এই

হ্রদের প্রাণভোমরা। চুপিসারে হ্রদের কোলে লুকিয়ে থাকা এ জলে কোনো উর্মি নেই, উদ্দামতা নেই। কেমন যেন সগম্ভীর, সমাহিত রূপ। আরশিতে ফুটে ওঠা নিখুঁত প্রতিফলনের মতোই এ জলে দেখা দেয় বিপ্রতীপরূপী তিয়েন শান। কী করে এ জল এতটা বিচিত্রবর্ণা? পুকুরে জমে থাকা শেওলার ক্লোরোফিল যেমন জলকে করে তোলে গাঢ় সবুজ, ততটা সবুজ নয়তো এ জল! তবে কি এর অন্তঃপুরে পোরা আছে বহুমূল্য মণিমাণিক্য? সেই রত্নই হয়তো দিয়েছে এই হালকা সবুজের ছোঁয়া? ঠিক রত্ন নয়, এই রং রহস্যের পেছনেও আছে দূরের ওই তিয়েন শানের ভূমিকা। পর্বতের গা বেয়ে যখন সন্তর্পণে নেমে আসে হিমবাহের স্রোত, সঙ্গে করে নিয়ে আসে ঘর্ষণে ভেঙেচুড়ে যাওয়া মিহি পাথরের মিশ্রণ। সেই মিশ্রণ একসময় তলিয়ে যায় হ্রদের অতলে। সূর্যের দিকে মুখ করে ফিকে হাসে তারা। তাতে করে আলো আর জলের মিলনস্থলে সৃষ্টি হয় এক অদ্ভুত আলোকছটা। সে আলো কারো কাছে নীলাভ সবুজ, আবার কারো কাছে হয়তো পান্না সবুজ। চোখের জৈবিক লেন্সের সংবেদনশীলতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় রঙের মাত্রা।

হ্রদের ধারে হঠাত্ দেখি, মাইকেল জ্যাকসনের মতো হ্যাট পরে তেমনই লিকপিকে শরীরের আরেক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক আমাদের দিকেই হেঁটে আসছে। পাশে তাকিয়ে দেখি—কারিম সরু চোখে যুবকের দিকে কিছুটা বিতৃষ্ণার দৃষ্টিতে আমাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে। নিকটবর্তী হলে যুবক পুরো

আমেরিকান একসেন্টে আমাকে জিজ্ঞেস করে—মহাশয়, একখানা উপকার করবেন?

ছেলেটির পরনে নীলচে হাওয়াই শার্ট। গলায় ঝুলছে মাদুলিবাঁধা চেন। দু কানে সিলভারে গড়া মেয়েলি দুল।আমেরিকায় দেখেছি এই ধরনের হিপি চেহারার যুবকেরা পথের মাঝে আটকালে সাধারণত বিড়ি-সিগারেট কিংবা নিদেপনপক্ষে ভাংতি টাকা চায়। কিন্তু ইনি আমার কাছে চাইলেন ট্যাক্সিতে করে কিছুটা পথ এগিয়ে দেবার সাহায্য। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক কাজাখ তরুণী আর কোরিয়ান চেহারার আরেক যুবক। কেইন অর্থাত্ নিউ ইয়র্ক প্রবাসী সেই ছেলেটি এবারে এঁদের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বোঝায়—কাজ হয়েছে। সাহায্য পাওয়া গেছে।

মেয়েটির নাম মদিনা। বহুদূরের শহর তুর্কিস্তান থেকে আলমাটিতে এসেছে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে বলে। কেইন আর সেই কোরিয়ান ভদ্রলোকের সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছে ইন্টারনেটের এক বন্ধুসভার মাধ্যমে। আর আজকের এই হ্রদ ভ্রমণের পরিকল্পনাটি নাকি এসেছে

মদিনার মাথা থেকেই।

গাড়িতে ওঠার পর আমি সামনের সিটে বসে ওদেরকে পাঠিয়ে দেই পেছনের সিটে। সেখানে কিছুটা গাদাগাদি করে বসতে হয়। গাড়ি স্টার্ট নেবার পর মদিনা আমাকে কিছু একটা বলার জন্যে সামনের দিকে ঝুঁকে আসে। আমিও আগ্রহী হয়ে পেছনের দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে ফিরে বসি। তবে ওর কথা শোনার আগেই কিছুটা পথ যাবার পর আচমকা হ্যাঁচকা ব্রেক কষে কারিম গাড়ি থামিয়ে দেয়। উইন্ড শিল্ডের দিকে ফিরে দেখি পথ রোধ করে আছে বিশাল এক বুনো ঘোটকী। তামাটে বর্ণের শরীর যত্নের অভাবে কিছুটা রুক্ষ, তবে রুগ্ন নয়। আর স্তনের কাছটায় দুগ্ধ পানের আশায় ছটফট করছে ওর শিশু। এদিকে আমরা যে পথে বাধা পেয়ে দাঁড়িয়ে আছি, সে নিয়ে ওদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কারিম বাধ্য হয়ে জোরে হর্ন চাপে। ঘোটকী তাতে চমকে উঠে পথ খালি করে উঠে পড়ে পাশের জমিনে। মনে মনে ভাবছি, পথ ছেড়ে দিতে বলায় ক্রোধান্বিত হয়ে এই তাগড়াই ঘোড়া আবার কিছু করে বসবে না তো? এমন ভাবনার মাঝে মদিনা যখন পেছন থেকে জিজ্ঞেস করে, ‘ঘোড়ার দুধ খাবে?’—তখন আমি শঙ্কিত হয়ে ভাবি, ও এই বুনো ঘোড়াকে বশ করে এখন দুধ দোয়াবার কথা ভাবছে কি? নাকি এ নিছকই ফাজলামো? তবে আমার দুগ্ধপানের সীমানা যেহেতু ওই গো কিংবা ছাগ অবধি, তাই মদিনার প্রস্তাবে কিছুটা সন্দিগ্ধ হলেও চটপট রাজি হয়ে যাই। মনে মনে ভাবি, দেখাই যাক না মেয়েটি কী করে! মদিনা অবশ্য বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানায়, এমন ব্যবস্থা করা ওর জন্যে জলভাত ব্যাপার। শুধু পথের মাঝে কোথাও একটু গাড়ি থামাতে হতে পারে। ‘কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিরান পথে তুমি ঘোড়ার দুধ পাবে কোথায় শুনি?’—আমি ভ্রু কুঁচকে কিছুটা অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করি। ‘সে নিয়ে ভেবো না। এখানে অনেক চাষি আছে, যারা ঘরের সামনের দিকে ছোটমতো দোকান বসিয়ে দুধ আর কিছু তেলে ভাজা বিক্রি করে। তেমন কোনো একটা চাষিবাড়ি পেয়ে যাব নিশ্চয়ই।’—মদিনার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস।

খুব একটা ছুটতে হয় না আমাদের। মাইলখানেক গিয়েই পথের বাঁ ধারে সার্কাসের তাঁবুর মতো খাটিয়ে রাখা গোলাকার এক তাঁবুঘর চোখে পড়ে। মদিনা কারিমকে গাড়ি থামাতে বলে। যেটিকে সার্কাস পার্টির তাঁবু ভেবেছি, মদিনার মুখে শুনছি—ওটিই নাকি এখানকার চাষিদের থাকার ঘর। স্থানীয় ভাষায় নাম—উড়ত। এর পাশেই ছাউনিঘেরা একটি ঘর। কিংবা বলা যায়—কাঠের গাজেবো। পথের দিকটায় উন্মুক্ত। সেখানে ডিম্বাকৃতির খাজাঞ্চি টেবিল। টেবিলের দু দিকে গাড় নীল পর্দা দিয়ে আড়াল করা। পেছনের দিকের চাটাইয়ের বেড়াতে ঝুলছে নকশিকাঁথার মতো নকশা করা কয়েক ফালি কাপড়। তবে এই যে ঘর কিংবা পাশের তাঁবু—কোনোটিতেই কাউকে দেখছি না। মদিনা সেই নীরবতাকে অগ্রাহ্য করে আমাদের নিয়ে সেই গাজেবোর দিকে অগ্রসর হয়। তারপর আমাদেরকে বসিয়ে মদিনা—‘একটু আসছি’ বলে লাপাত্তা হয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পর দেখি ও ফিরেছে সঙ্গে এক লোককে নিয়ে। ভদ্রলোকের পরনে সাদা গেঞ্জি, নিম্নাঙ্গে ঢলঢলে পাজামা। ছিপছিপে গড়ন। আমাদের কাছে এসে মদিনা তাকে এই জনশূন্য খামারের মালিক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। ভদ্রলোক আমাদের দেখে খুব উত্ফুল্ল হয়েছেন, সেটি বুঝতে পারি যখন তিনি পায়ের চটি খুলে এক লাফে পাটাতনে চেপে বসেন। মদিনা নিচুস্বরে আমাকে বলে—‘তুমি একটু সরে বসো। উনি তোমাদের সঙ্গে কিছু আলাপ করতে চান। আমাদের এখানে নিয়ম হলো—ওঁর মতো যাঁরা বয়োজ্যেষ্ঠ, তাঁরা বসবেন টেবিলের একেবারে শুরুর দিকের কোণে।’ 

ভদ্রলোক মদিনার দিকে ফিরে জানতে চান, ঠিক কী মনে করে আমরা তাঁর জীর্ণ কুটিরে পা রাখলাম? কীভাবে তিনি আমাদের খেদমত করতে পারেন? মদিনা অশ্বদুগ্ধের কথা বলায় তিনি সোল্লাসে বলেন, শুধু অশ্ব কেন, তাঁর তাঁবুতে উটের দুধও আছে। চাইলে সেটির ব্যবস্থাও করবেন। তাঁর বউ এই মুহূর্তে নিজেদের পালিত দুটি উট নিয়ে গেছে দূরের এক চারণভূমিতে। তাতে কোনো সমস্যা নেই। ঘরের ভেতর জগে রাখা কিছু উট আর অশ্বের দুধ মজুদ আছে এই মুহূর্তে। তবে তার সঙ্গে ভাজাভুজি কিছু চাই কি? সেক্ষেত্রে খানিক অপেক্ষা করতে হবে। তাঁর ষোড়শী কন্যা গেছে কাছেই এক জঙলা জায়গায় শুকনো ডাল তুলে আনতে। সে এলেই কেরোসিনের চুলা জ্বালিয়ে কিছু একটা রেঁধে দিতে পারবে। আমাদের হয়ে মদিনাই সকল কিছুর ফরমায়েশ দেয়। তার আগে জেনে নেয় কিছুটা বিলম্ব হলে আমাদের ক্ষতি আছে কি? আমি আবারও কারিমের দিকে তাকাই। কিছুক্ষণ আগে ও গিয়েছিল গাড়ির চাকার বায়ুচাপ পরীক্ষা করতে। ধারণা করছিল, কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। কিন্তু চিন্তিত হবার মতো তেমন কিছু না মেলায় ওর মাঝেও তেমন একটা ফিরে যাবার ব্যগ্রতা নেই। খাবারের কথা শুনে বরং ওর চোখগুলো জুলজুলে হয়ে ওঠে। আমি তাই মদিনাকে অভয় দান করি। 

আমাদের এই ছাউনিঘরের পেছন দিকে চেস্টনাট গাছের বন। সেখান থেকে হঠাত্ই মাথায় এক আঁটি শুকনো বৃক্ষশাখা নিয়ে এক কিশোরী উদয় হয়। তার দু কানে ঝুলছে হাতে বানানো ঝুমকো। মাথায় কাজাখ ঢঙে বাঁধা উড়নি। মেয়েটিকে দেখে মালিক লোকটি উঠে তাঁর তাঁবুর দিকে অগ্রসর হন। বোঝাই যাচ্ছে, বাবা-মা-মেয়ের ছোট্ট সংসার। হয়তো ওদের সীমাবদ্ধতার ব্যাপারটি আন্দাজ করতে পেরেই মদিনাও উঠে গিয়ে ভদ্রলোকের অনুগামী হয়। আশপাশে কোথাও একটি পোষা কুকুর একটানা ডেকে যাচ্ছে তখন। ওটির ডাক কয়েকমুহূর্তের জন্যে চাপা পড়ে অদূরের সড়ক ধরে তীব্র গতিতে ছুটে চলা ট্রাকের চাকার কর্কশ ঘর্ষণের শব্দে। আমরা পয়ধারের তলে ঠেসে থাকা জাজিমে একটু আয়েশ করি অপেক্ষার সেই মুহূর্তে। এর কিছুক্ষণ পর মদিনা আর তাঁবুর মালিক—দুজনেই ফিরে আসে দু জগ দুধ আর বেশকিছু পোর্সেলিনের বাটি নিয়ে। সেই কিশোরীটিকে অবশ্য দেখা যাচ্ছে না। ও হয়তো ভেতরে ভাজাভুজির কাজে লেগে গেছে। জগ দুটো টেবিলের ওপর নামিয়ে মদিনা আমাদের সকলের উদ্দেশে বাঁয়ের জগটি নির্দেশ করে বলে—এই হলো অশ্বদুগ্ধ। আমরা একে বলি—খামুজ। দারুণ তরল। গরমের দিনে তো আমরা বেশ তৃপ্তি নিয়ে খাই। ওর এই কথাটির সময়ে কারিম প্রবল সম্মতিসূচক মাথা দোলায়। আমাদের সামনে যে পোর্সেলিনের বাটিগুলো রাখা, সেগুলোতে ধরবার মতো হাতল নেই। দু হাতে ধরে খেতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের জন্যে বাটিতে সেই তরল ঢালবার মুহূর্তে ও যোগ করে—আমাদের পূর্বপুরুষরা কিন্তু একে মাঝে মাঝে সুরা হিসেবেও ব্যবহার করতেন। এই দুধকে যদি কয়েকদিন কিছুটা শীতল আবহাওয়ায় রেখে দাও, তাহলে কিছুটা জারিত হয়ে সেটি রূপ নেয় স্বল্পমাত্রার অ্যালকোহলিক তরলে।

আমি সেই পোর্সেলিনের পাত্রে চুমুক দেবার আগে কেইন আর সেই কোরিয়ান ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করি তাঁদের মতামত। কেইন ঠোঁটের ওপর দুধের পাতলা সর ভাসিয়ে বেশ তারিফের স্বরে জবাব দেয়—হুম, মন্দ নয়। ওদিকে কোরিয়ান ভদ্রলোক জবাব দেয়—একটু ইয়ে ধরনের, তবে চলে আরকি। খেয়ে নাও তুমিও। আমি এই দুজনের কথায় বেশ ভরসা পাই। এই দুজনের বলছি, কারণ মদিনা আর কারিমের কথায় ভরসা করা যায় না। ওরা স্থানীয়। এই তরল খেয়েই ওরা বড় হয়েছে, কাজেই ওদের কাছে এই তরলের আবেদন প্রীতিকর হবে সেটাই স্বাভাবিক। তো আমি পাত্রে চুমুক দিলাম। গিলে ফেলার পর মনে হলো, এর অজানা গন্ধ আর বিটকেল স্বাদে আমার সমস্ত নাড়িভুঁড়ি যেন উগড়ে আসবে। বিশাল সেই চুমুকের পরই মদিনাকে বললাম—আমাকে ক্ষমা করো। এ গেলা আমার কম্ম নয়। কেইন কিন্তু বেশ আয়েশের সঙ্গেই পুরো বাটির দুধ সাবাড় করে ফেলল। এবারে আমার জন্যে সান্ত্বনা হয়ে রইল—সাবাথ, মানে উটের দুধের জগটি। এখন এই সাবাথও যদি না গিলতে পারি, তবে এরা নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। মদিনাকে বললাম—যা থাকে কপালে। ঢালো দেখি কিছুটা সাবাথ।

এই সাবাথ কিন্তু মন্দ নয়। অনেকটা যেন তরলায়িত দধি। খেলে প্রশান্তির উদ্রেক হয়, অদ্ভুত শীতলতা এসে ভর করে পাকস্থলীর নানা গলিতে। বেশ তৃপ্তি নিয়েই আমি তাই বাটির পুরোটুকু সাবাথ সাবাড় করি। এর মাঝেই আমাদের জন্যে স্টিলের গামলায় এসে গেছে গরমা গরম বাউরসাক। মদিনা সেগুলো খাবার জন্যে জোর তাগাদা লাগায়। এই বিশেষ তেলেভাজায় কামড় লাগালে যদি ভেতর থেকে ভেসে আসে আবদ্ধ বাষ্প, তবেই নাকি পাওয়া যায় প্রকৃত স্বাদ। আমিও তাই বিলম্ব না করে হাত চালাই স্টিলের গামলায়। আর মুখে দিয়ে যেটি বুঝি, এটি আসলে আমাদের বঙ্গদেশের পুরি। আলু বা ডালপুরি নয়। শুধু পুরি, ভেতরটা যার ফাঁপা। ময়দার কাই-কে ডলে তেলে ডোবা কড়াইয়ে ভাজার মাধ্যমে যার স্বীয় রূপ প্রাপ্তি। কেইন আর সেই কোরীয় ভদ্রলোকও বেশ আমোদ পেয়েছেন এই ভাজাভুজি পেয়ে। তাঁরা ওটিকে খামুজের বাটিতে চুবিয়ে খাওয়া শুরু করলেন। আমি যেহেতু খামুজ পান করে আগেই ধরাশায়ী, তাই ওদের পথে হাঁটার মনোবল তখন আর নেই।

ভোজনপর্ব সমাপ্ত হবার পর আমি দাম চুকাবার জন্যে পকেটে হাত ঢুকালে মদিনা তীব্র আপত্তি জানায়। ওর কথা হলো—‘উপকারের শোধ দেবার জন্যে তোমাকে আবার পাচ্ছি কোথায়? তাই এটুকু আমাদের ওপর ছেড়ে দাও।’ বলাবাহুল্য, ওদের পরিশোধিত মূল্যের মাঝে আছে কারিমের সংগৃহীত এক বোতল দুধও। কারিমও তাই বেশ তৃপ্ত। তাঁবু মালিকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা গাড়ির দিকে হেঁটে যাই। সেই পোষা কুকুরটি হাঁকডাক থামিয়ে এবারে দুলকি চালে দৌড়ে আসে আমাদের দিকে। হয়তোবা বিদায় জানাবার জন্যে। পেছনের পাইন বনে শিস দিয়ে যায় উড লার্ক পাখি। আলো মরে এসেছে এখন। অপরাহ্নের দারুচিনি আলোয় অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তাঁবুটিকে মনে হয় দূর মহাকাশ থেকে নেমে আসা নভোযানের মতো। আজকের বাদে আমরা ছিটকে পড়ব পৃথিবীর নানা কোণে, কিন্তু সেই নভোযানে হয়তো যাত্রা অব্যাহত থাকবে তিন মানুষের একটি সংসারের। সেই খবর কোনোকালে আমার কাছে আর পৌঁছাবে কি?