‘নিরুপায় বৃত্ত’ :স্ট্রেট অথচ চিত্রল এক কাব্যগাথা

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৯, ১৮:৩৫

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতে, কবিতা একটি ঘোর। ঠিক নেশার মতো। আমাদের কবি ফজল শাহাবুদ্দীনও এ কথাই বলতেন প্রতিদিন। তিনি বলতেন, একবার এর ফাঁদে পা দিলে বেরিয়ে আসা অসম্ভব। সম্ভবত এ কারণেই এই বৃত্তে যাঁরা একবার প্রবেশ করেন তাঁরা এরই মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকেন। নিরন্তর এই ঘুরপাকের মধ্য দিয়ে কেউ কেউ প্রকৃত কবি হয়ে বেরিয়ে আসেন আর অন্যরা কবি না হয়েও তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে একসময় হারিয়ে যান অন্ধকারে। বৃত্তের প্রসঙ্গটা এল মিলু শামস্-এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নিরুপায় বৃত্ত’ পাঠ করতে করতে। খুব বেশিদিন কবিতাঙ্গনে হাঁটাহাঁটি না করেও যিনি কবিতা দিয়ে বোদ্ধাদের চমকে দিয়েছেন, তিনি মিলু শামস্; একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক এবং গল্পকারও।

মিলু শামস্-এর কবিতার একটি নিজস্ব ভাষা আছে। প্রথম পাঠেই বোঝা যায়, এ কবি জীবনের প্রকৃত নির্যাসটুকুকে কবিতায় তুলে আনতে আগ্রহী। তাঁর বলার স্টাইলটা অনেকটা তাঁরই মতো, স্ট্রেট অথচ চিত্রল। যাঁরা কবিতা চর্চা করেন তাঁরা নির্দ্বিধায় স্বীকার করবেন—কবিতায় এ বিষয়টি কতটা দুরূহ এবং কষ্টসাধ্য। ঠিক যেন আকাশভাঙা কাঠপোড়া মধ্যদুপুরকে রোমান্টিকতায় প্রেমিকার আলিঙ্গনের সঙ্গে তুলনা করে মধুরতার খামে পুরে পরিবেশন করা। মিলু শামস্ অবলীলায় এ কাজটাই করে দেখিয়েছেন তাঁর কবিতায়।

‘নিরুপায় বৃত্ত’ গ্রন্থের একটি কবিতার শিরোনাম, ‘শূন্য চেয়ার’। কবিতাটি শব্দময়তায় যেমন ভাস্কর, ঠিক তেমনি রূপকতায়ও। তিনি লিখেছেন—

‘চেয়ারটি হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে

সকালের রোদে

নির্বিরোধী মানুষটি শুধু নেই

মানুষবিহীন চেয়ার কী অর্থহীন’!

এই যে চেয়ারের হাত-পা ছড়িয়ে বসে থাকা, এর মধ্যে যে অরূপ চিত্রলতা দৃশ্যমান তার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে সেই নিবিড় সত্যটি, মানুষবিহীন চেয়ার কী অর্থহীন! চিত্রলতার মধ্য দিয়ে নিবিড় নিরেট বাস্তবতাকে উপস্থাপনের এই জাদুকরী কৌশল মিলু শামস্-এর একান্তই নিজস্ব ভঙ্গি এবং তাতে তিনি যে সফল তা বলাই বাহুল্য।

’হূদয়ের সুইসাইড নোট’-এ অ্যারোপ্লেনের আওয়াজকে বিসমিল্লাহ খাঁ’র সানাইয়ের মতো ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারা এ কবি ডোরাকাটা স্বপ্ন বুকে নিয়ে থেকে যেতে চান একাকী সবার অলক্ষে লালরঙা বগিটিতে—হয়তো সেটিই তাঁর কবিতার ঘর, যেখানে নিবিড় বুননে একে একে ভেসে ওঠে ইলেকট্রিক তারে ঝুলে থাকা মৃত শালিকের শরীর আর অরণ্যের শিখর ছুঁয়ে অস্পষ্ট বেরিয়ে থাকা বিষণ্ন মঠের চূড়া এবং কেবলই স্বপ্নীল হয়ে দুলে ওঠে ছোপ ছোপ অন্ধকারে লোকালয়ের পথে যাত্রা করা উত্সুক জনস্রোত।

‘নিরুপায় বৃত্ত’ পড়তে পড়তে একজন পাঠক অনায়াসে স্পর্শ করতে পারেন উজানের স্রোতে ভেসে আসা পদ্মফুল, সফেদ জ্যোত্স্নায় রাবারের স্যান্ডেল পায়ে ঘুরে আসতে পারেন এবড়ো থেবড়ো দুঃখের দুর্গগুলো নিঃসীম নিসঙ্গতায়, আর দেখতে পারেন লজ্জার শেষ পালকটি শরীর থেকে খসিয়ে কীভাবে ধূর্ত শেয়াল লিপিবদ্ধ করে ইতিহাসকে বর্তমানের খেরোখাতায়।

মিলু শামস্ জীবনঘনিষ্ঠ, তাঁর উচ্চারণ দৃঢ় অথচ সংবেদনশীল। তিনি কবিতায় আশ্বিনের আকাশে নিষিদ্ধ মেঘের প্রসব প্রত্যাশী। কালবোশেখি মেঘ থেকে অবিরাম ঝরে পড়া রক্তবৃষ্টি দেখে কবিতার ভাবে দুলে ওঠা মিলু শামস্-এর কবিতা পাঠককে দুলিয়ে দেয় বুনোবৃষ্টিতে ধানের শীষে একাকী ফড়িংয়ের আনন্দদোলের মতো। একজন কবি মিলু শামস্-এর কৃতিত্ব এখানেই।

 ‘নিরুপায় বৃত্ত’ এর কবিতা সংখ্যা ৩৪। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই কবিতাগুলোর মতোই ছন্দময় কবিতার শিরোনামগুলোও। পড়ার আগেই শিরোনাম পাঠ করে পাঠক অনায়াসে হূদয়ে অনুভব করতে পারেন একটি একান্ত কবিতার অনুরণন। যেমন—ব্যক্তিগত শীত, গল্পটি মেঘাচ্ছন্ন থাকে, মুহূর্তগুলো ঝরে পড়ে, গরম চায়ে টোস্ট, হূদয়ের সুইসাইড নোট, ধূর্ত শেয়াল এবং ইতিহাসের আপডেট, পালকখসা পায়রা, বিকল্প ভালোবাসা, দুপুরের নূপুর প্রভৃতি। নামগুলোও যে এক একটি কবিতার নোট হয়ে উঠতে পারে নিরুপায় বৃত্ত না পড়লে তা বোঝার উপায় নেই।

কবিতায় নতুন চিত্রকল্প এবং অচিন্ত্যনীয় দৃশ্যপট রচনায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মিলু শামস্-এর কবিতাযাত্রা শুভ হোক।