কানপুর টেস্টে দুইদিনে খেলা হয়েছে ৩৫ ওভার। আসলে দুইদিন নয়, খেলা হয়েছে একদিন। দ্বিতীয় দিনের খেলা তো বৃষ্টিতেই ভেসে গেছে। মাঠের ক্রিকেট হিসাব করলে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিতীয় টেস্টে আলোচ্য বিষয় ‘বৃষ্টি’। অথচ এই টেস্ট ঘিরে কতই না আলোচনা ছিল। বাংলাদেশ দল ভারতে যাওয়ার আগে থেকে কানপুর টেস্ট ছিল আশঙ্কার চাদরে মোড়ানো।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভক্ত হলে ব্যাপারটি আপনার জানা থাকার কথা। না জানা থাকলে তাদের জন্য বলা- কানপুর টেস্ট পণ্ড করে দেওয়ার হুমকি ছিল অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভার। শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ ও নৃশংসতার অভিযোগ তুলে ভারতীয় এই ধর্মীয় সংগঠন কানপুর টেস্ট ও গোয়ালিয়রে প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ বাতিলের আহ্বান জানিয়েছিল।
তখন থেকেই সংশয়ের কাঁটাতারে আটকে যায় কানপুর টেস্ট। তবে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) আশ্বস্ত করেছিল, কানপুরেই হবে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট। এজন্য বাংলাদেশ দলকে তিন স্তরের নিরাপত্তা দিচ্ছে ভারত সরকার। সূচি অনুযায়ী, কোনও বাধা ছাড়াই শুরু হয়েছে কানপুর টেস্ট।
তবু নিরাপত্তার প্রশ্ন এড়াতে পারল না বিসিসিআই ও উত্তর প্রদেশ পুলিশ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম সমর্থক রবিউল ইসলাম রবি, যাকে সবাই ‘টাইগার রবি’ নামে চেনেন। কানপুর টেস্টের প্রথম দিনে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ তোলেন এই বাংলাদেশি সমর্থক।
রবির দাবি, গ্যালারিতে ১৫ জন ভারতীয় সমর্থক তাকে লাঞ্ছিত ও মারধর করেছে। যদিও উত্তর প্রদেশ পুলিশের দাবি, কোনও প্রকার লাঞ্ছনার শিকার হননি রবি। প্রশ্নটা এখানেই উঠে যায়, তাহলে কার দাবি সঠিক? রবি মিথ্যা বলছেন নাকি পুলিশ মিথ্যা বলছে?
প্রথমে রবির বক্তব্য শোনা যাক। শুক্রবার (২৭ সেপ্টেম্বর) শুরু হওয়া কানপুর টেস্টে বাংলাদেশ ইনিংসে লাঞ্চের সময়কার ঘটনা এটি। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে এই বাংলাদেশি ক্রিকেটভক্ত বলেছেন, ‘সকাল থেকে ভিড়ের (ভারতীয় দর্শকদের) একটা অংশ আমাকে গালাগালি করেছে। (প্রথম দিনের) লাঞ্চের ঘোষণা হলে আমি শুধু নাজমুল হোসেন শান্ত ও মমিনুল হকের নাম বলতে লাগলাম। এর মধ্যে কয়েকজন আমাকে ধাক্কা দিতে শুরু করে। আমার মাসকট (টাইগার) ও পতাকা ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করে। আমি বাধা দিলে তারা আমাকে মারতে শুরু করে।’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। যে ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মাটিতে পড়ে আছেন রবি। এরপর তাকে ধরাধরি করে পুলিশ ও স্টেডিয়ামের লিঁয়াজো অফিসাররা স্টেডিয়ামের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখান থেকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এখন রবি অনেকটা ভালো আছেন। কিন্তু তার অভিযোগ আগের অবস্থানেই আছে। তবে বদলেছে ঘটনার বর্ণনা। হাসপাতাল থেকে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় এই ক্রিকেটভক্ত ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘আমি স্টেডিয়ামের ২ নম্বর গেট দিয়ে নিচে নামছিলাম। ওই সময় একজন পেছন থেকে আমার পিঠে ঘুষি মারে। আমি মাটিতে পড়ে যাই। অনেক সংবাদ মাধ্যম আমার আঘাত পাওয়াকে গুজব বলছে, কিন্তু এটা সত্য নয়।’
ইন্ডিয়ান্স এক্সপেসে রবি ঘটনার বর্ণনা যেভাবে দিয়েছেন, ফেসবুক ভিডিও বার্তায় সেটি ভিন্ন। তবে ভারতীয় সমর্থক তার গায়ে হাত তুলেছে, এই দাবিতে অটুট রবি। কিন্তু উত্তর প্রদেশ পুলিশ বলছে, মারধরের কোনও ঘটনাই নাকি ঘটেনি কানপুর টেস্টের প্রথম দিনে।
স্টেডিয়ামের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসিপি অভিষেক পান্ডে সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, ‘তিনি (রবি) পানিশূন্যতার কারণে পড়ে যান। পুলিশ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সহায়তায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মারামারির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাকে কোনও সমর্থক আঘাত করেনি।’ একই সঙ্গে এই পুলিশ কর্মকর্তা এটাও নিশ্চিত করেছেন, স্টেডিয়ামের সিসিটিভি ফুটেজেও মারধরের কিছু দেখা যায়নি।
রবি বলছেন, ভারতীয় দর্শক তাকে মারধর করেছে। কিন্তু ভারতীয় পুলিশ জানাচ্ছে, এ রকম কিছুরই প্রমাণ পায়নি তারা। কানপুর টেস্ট ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসা এই ঘটনার ধোঁয়াশা কাটছে না।
