উজানের ভারত থেকে নেমে আসা ধলাই নদী বর্তমানে কমলগঞ্জবাসীর দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফি বছর পাহাড়ি ঢলে নদী ভাঙন আর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনেক পরিবার। গত দুই যুগে প্রায় শতাধিক পরিবার ভিটে-মাটি হারিয়েছে। নদী ভরাট, সংকোচন, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, সময়মতো বাঁধ মেরামত না করা—এসব কারণে অল্প বৃষ্টিতেই ধলাই নদীর পাড় ভাঙছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ধলাই নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে উত্পত্তি হয়ে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশ অংশে ৫৭ কি.মি. দীর্ঘ ও ঘনঘন বাঁক পরিবর্তন করা নদীটি পার্শ্ববর্তী রাজনগর উপজেলায় মনু নদীতে মিলিত হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে প্রবল স্রোতে নদী ভাঙন দেখা দিচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে নদীর গতিপথ। দীর্ঘ কয়েক যুগেও নদী খনন ও সংস্কার না হওয়ায় নাব্য হারিয়ে ফেলছে। বছরান্তে বাড়ছে বন্যা ঝুঁকি।
সরেজমিন কয়েকটি এলাকা ঘুরে জানা যায়, নদীর দুই পারে হাজারো পরিবার বসবাস করলেও ভাঙনে নিঃস্ব হয়েছে অনেক পরিবার। এখনো ঝুঁকি নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে এমন পরিবারের সংখ্যা কম নয়। ঘোড়ামারা, রামপাশা, চৈতন্যগঞ্জ, কুমড়াকাপন, শুকরউল্ল্যাগাঁও, উবাহাটাসহ প্রায় ২০টি স্থান রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ। অল্প বৃষ্টিতে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়। ফলে অনেক স্থানে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বাড়িঘর।
উপজেলার পশ্চিম ঘোড়ামারা গ্রামের হোসেন আলী, রওশন আরা বেগম ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন. ‘ধলাই নদীর ভাঙনে আমরা গ্রামের পনের পরিবার নিঃস্ব হয়েছি। নদীর বাঁধ মেরামত না হওয়ায় স্রোতে আমাদের একমাত্র বসতঘরটি ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে। এখন আমাদের থাকার মতো স্থায়ী জায়গা নেই।” গ্রামের নুরুজ্জামান, সাজেদা বেগম ও আব্দুল গফুরসহ অনেকেই নদী ভাঙনের শিকার হওয়ার কথা জানান। কয়েকবছর আগে মাধবপুর ইউনিয়নের মনিপুরী অধ্যুষিত হীরামতি গ্রামে কয়েকটি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়। চৈতন্যগঞ্জে এক মুক্তিযোদ্ধার বাড়িও নদীতে বিলীন হচ্ছে। ঘোড়ামারায় রয়েছে আরো কয়েকটি বাড়ি। এছাড়া মুন্সীবাজার ও রহিমপুর এলাকায় অনেক বাড়িঘর ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে।
স্থানে স্থানে অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করায় সেতু, নদীর বাঁধ ও বাড়িঘর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এসব বিষয়ে অভিযোগ প্রদান করা হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না। রহিমপুর ইউনিয়নের ধর্মপুর এলাকার মাওলানা লুত্ফুর রহমান জাকারিয়া বলেন, ধর্মপুর ও রামচন্দ্রপুর গ্রামের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত ধলাই নদী তীরে বসবাসরত নদী পাড়ের লোকজন আতঙ্কে দিনযাপন করছে। এখানে একটি ইজারাদারের মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন যাবত্ ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করায় আমাদের বিশ একর ভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তিনি আরো বলেন, নদীর ঐ স্থান থেকে ৩০-৪০ ফুট গভীর করে বালু উত্তোলন করার কারণে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে বর্তমানে নদী আমাদের বসতভিটার কাছে চলে আসছে। ফলে গ্রামের ১৫টি পরিবার হুমকির মুখে।
রহিমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমদ বলেন, তার এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে কয়েকটি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে উপজেলা ও জেলা প্রশাসন বরাবরে অভিযোগ দেওয়া হয়।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক বলেন, নদীর বাঁধ মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। তাছাড়া অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বিষয়ে প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, ধলাই নদীর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামত করা হচ্ছে। ঘোড়ামারা এলাকায় স্থানীয়দের আপত্তির কারণে মেরামত করা সম্ভব হয়নি। এখন সমস্যার নিরসন হয়েছে এবং মেরামত কাজ শুরু হবে।
