অডিট আপত্তির ১০ বছরেও নেই কোন পদক্ষেপ

এক প্রতিষ্ঠানেই ৬ শিক্ষকের ভুয়া সনদে চাকরি

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:২২

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় একটি প্রতিষ্ঠানে ৬ জন শিক্ষকের সার্টিফিকেটে অডিট আপত্তির ১০ বছরেও নেই কোন পদক্ষেপ। সদ্য বিদায়ী আওয়ামীলীগের ক্ষমতায় এখনও চলছে বহাল তবিয়তে। 

জানা গেছে, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ১৯৪৬ সালে উপজেলা সদরে হাতীবান্ধা এসএস উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। যা ১৯৪৯ সালে স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তিতে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার লাভ করতে এ প্রতিষ্ঠানের সাথে ২০০০ সালে ভোকেশনাল শাখা চালু করা হয়। একই বিদ্যালয়ের জমি ও ভবন দেখিয়ে পরবর্তি ২০০২ সালে তৎকালিন প্রধান শিক্ষক প্রায়ত নুরুজ্জামান আহমেদ উচ্চ মাধ্যমিক বিএমটি শাখা চালু করেন। একই সময় কাগজ কলমে বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে হাতীবান্ধা এসএস হাই স্কুল এন্ড টেকনিক্যাল কলেজ নামকরন করা হয়। সেই নতুন নামকরন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে করা হলেও শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে নথি পাঠানো হয়নি। ফলে মন্ত্রনালয়ে পুর্বের নামেই বহাল থাকে। তাই মন্ত্রনালয়সহ  স্থানীয়দের কাছে তা হাতীবান্ধা এসএস উচ্চ বিদ্যালয় নামেই পরিচিত রয়েছে। এ কারনে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে হাতীবান্ধা এসএস সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় নামে ভোকেশনাল শাখাসহ  গেজেট ভুক্ত হলেও বাদ পড়ে বিএমটি শাখা।

প্রতিষ্ঠানটির বিএমটি শাখায় গত ২০০৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দুই ট্রেডে ৪০জন শিক্ষার্থীর পাঠদানের অনুমতি লাভ করে। বিএমটি শাখায় প্রভাষক (হিসাব বিজ্ঞান) পদে ২০০৪ সালের ১৩ জুন দৈনিক যুগের আলো পত্রিকায় নিয়োগে বিজ্ঞাপ্তি প্রকাশ করা হয়। ১৯৯৬ সালের পরিপত্র মতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রার্থীর বয়স অনুর্দ্ধ ৩০ বছর হলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিয়োগ পান তৎকালিন প্রধান শিক্ষকের আত্মীয় ৩১ বছরের ঊর্দ্ধের শফিকুল ইসলাম। যার জন্ম ১ জুন ১৯৭৩। এ নিয়োগ নিয়ে আওয়ামীলীগের দাপটে আজও বহাল রয়েছেন শফিকুল ইসলাম। 

গত ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ প্রতিষ্ঠানটিতে মিনিস্ট্রি অডিটে আসেন শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষন বিভাগের উপ পরিচালক দেবদুলাল ভট্টাচার্য্য। তার স্বাক্ষরীত অডিট প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির ৬ জন প্রভাষকের সংশ্লিষ্ট ট্রেডের সনদ ভুয়া বা জাল দাবি করে অডিট আপত্তি জানানো হয়। সেই আপত্তিকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে সদ্য বিদায়ী আওয়ামীলীগের ক্ষমতায় তারা আজও রয়েছেন বহালতবিয়তে। 

আপত্তিপ্রাপ্তরা হলেন, বিএমটি শাখায় সাবেক প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামানের ছেলে  কম্পিউটার ডেমোঃ প্রায়ত রাশেদুল ইসলামের ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি সনদটি, কম্পিউটার ল্যাব এ্যাসিসটেন্ট আবু বক্কর সিদ্দিকের একই সনদ, এম এ খালেকের আইসিটি ট্রেনিং সনদ সমূহ জাল বা ভুয়া উল্লেখ করে তাদের নিয়োগ বাতিল দাবি করা হয়। একই সাথে ২০০৪ সালের মে মাস থেকে গ্রহন করা সকল অর্থ সরকারী কোষাগারে ফেরত দিতে বলা হয়। টাকা ফেরত না দিয়ে রাশেদুল ইসলাম মারা গেলেও অপর দুইজন রয়েছেন বহালতবিয়তে। 

ওই বিএমটি শাখার কম্পিউটার প্রভাষক তবারক হোসেনের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, টাইপ ল্যাব এ্যাসিসটেন্ট আব্দুল হাকিমের মুদ্রাক্ষর প্রশিক্ষণ সনদ এবং কেশরুজ্জামানের শটহ্যান্ড এন্ড কম্পিউটার ট্রেনিং সনদটি জাল বলে অডিটে আপত্তি জানিয়ে তাদের বিষয়ে মন্ত্রনালয়ের দৃষ্টি আকর্ষন করা হয়। এছাড়াও ওই বিএম শাখার বাকী ৪জন প্রভাষকের সংশ্লিষ্ট ট্রেডের প্রশিক্ষণ সনদগুলোও সঠিক বলে মুল্যায়ন হয়নি দাবি করে মন্ত্রনালয়ের দৃষ্টি আকর্ষন করেন অডিট টিম।  

শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের অডিট আপত্তির দীর্ঘ ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ আজও নেয়া হয়নি। সবে রয়েছে কাগজ কলমে সীমাবদ্ধ। উল্টো এ বিএমটি  শাখা জাতীয়করনের জন্য আওয়ামীলীগ নেতা এমপি মন্ত্রীদের দুয়ারে দৌড় ঝাঁপ করছেন এসব শিক্ষক। দৌড় ঝাঁপের মাঝেই আওয়ামীলীগ সরকারের পতন হলে বেড়িয়ে আসে থলের বিড়াল। 

বয়স বিধির বিষয়ে হিসাব বিজ্ঞান প্রভাষক শফিকুল ইসলাম বলেন, কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র দেখে নিয়োগ দিয়েছেন এবং যোগদান নিয়েছেন। ৩১ বছর বয়সে নিয়োগ দিলেও প্রতিষ্ঠানটিতে আরও দুই বছর আগে থেকে পাঠদান করছি।

ল্যাব এ্যাসিস্টেন্ট আব্দুল হাকিম বলেন, অডিট আপত্তির বিষয়টি জানি না। যোগদান থেকে চাকরি করছি, বেতন ভাতাও ভোগ করছি। পুর্বের সনদেই চলছে চাকরি। 

কম্পিউটার বিষয়ের প্রভাষক তবারক হোসেন বলেন, ২০১৩ সালের অডিট আপত্তির পরে নতুন করে সরকারী ভাবে কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহন করে সনদ অর্জন করেছি। 

কম্পিউটার ল্যাব এ্যাসিসটেন্ট আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, সনদ ভুয়া বা জাল বলে অডিট আপত্তির বিষয় জানা নেই। প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রনালয় থেকে এমন কোন কাগজ দেয়া হয়নি। তাই বিষয়টি অজানা।

হাতীবান্ধা এসএম মডেল সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম প্রধান বলেন, প্রায়ত নুরুজ্জামান স্যার  প্রধান শিক্ষক থাকাকালিন সময় বিএমটি শাখা চালু করেছেন এ বিদ্যালয়ের জমি ও অবকাঠামো দেখিয়ে। তিনি মন্ত্রনালয়ে কাগজ না দিয়ে শুধু কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন দেখিয়েছেন। যার কারনে মন্ত্রনালয় পুর্বের নামে জাতীয়করন করে। এতে বাদ পড়তে পারে বিএমটি শাখা। বিএমটি শাখার কয়েকজন শিক্ষকের সংশ্লিষ্ট ট্রেডের সনদে অডিট আপত্তি ছিল। যা দায়িত্ব গ্রহনের পরে ফাইল পত্র খুজতে গিয়ে হাতে আসে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহনের শুরু থেকে আওয়ামীলীগ নেতাদের চাপে তা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এখন অরাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। আশা করছি অনিয়মের আইনগত ব্যবস্থা নিবে মন্ত্রণালয়।

হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আতিকুল ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালের অডিট আপত্তির বিষয়টি আমার জানা থাকার কথা নয়। তবুও খোজ খবর নিয়ে বিষয়টি দেখা হবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি