সংলাপ হবে বিচার বিভাগ তিন বাহিনী প্রধানের সঙ্গেও

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৯, ২২:৫৪

আগামী ১৪ জুলাই থেকে বাত্সরিক জেলা প্রশাসক সম্মেলন শুরু হচ্ছে ঢাকায়। এ সম্মেলন চলবে ১৮ জুলাই পর্যন্ত। এবারের সম্মেলনের তাত্পর্যপূর্ণ হবে বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের সংলাপ। জেলা প্রশাসক সম্মেলনের ইতিহাসে এটি হবে প্রথম সংলাপ। আর নির্বাহী বিভাগকে বিচার বিভাগ আলাদা করার পর প্রথমবারের মতো এই সংলাপ হবে অতিগুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া তিন বাহিনী প্রধান অর্থাত্ সশস্ত্রবাহিনীর সঙ্গে এই সংলাপ নতুন মাত্রা যোগ করবে এবারের ডিসি সম্মেলন।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও জ্যেষ্ঠ জেলা জজ ড. মো. জাকির হোসেন অবশ্য ইত্তেফাককে বলছেন, এটি মূলত প্রধান বিচারপতির সঙ্গে নির্বাহী কর্মকর্তাদের সৌজন্যমূলক সাক্ষাত্পর্ব। দেশের ইতিহাসে প্রথম প্রধান বিচারপতির সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তার এই সাক্ষাত্পর্ব রাষ্ট্রের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করবে।

আগামী ১৬ জুলাই সুপ্রিম কোর্টে অনুষ্ঠেয় এই সংলাপে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা উপস্থিত থাকবেন। পক্ষান্তরে মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ এ বিভাগের ২২ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকগণও উপস্থিত থাকবেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় পরস্পর বিরোধী মতামত আছে বিচার ও নির্বাহী বিভাগের। এছাড়া বেশ কবছর ধরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের পক্ষ খেকে বিচারিক ক্ষমতা প্রাপ্তির দাবিও ওঠে এই জেলা প্রশাসক সম্মেলনে; কিন্তু বিচার বিভাগ আলাদা হওয়ার কারণে সেসব সম্ভব হয় না—আর না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কী সমস্যা হয় তা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার সুযোগ থাকবে। আবার বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব সমুন্নত রাখতে কী সম্ভব আর সম্ভব নয় সেটিও আলোচনা করে হয়তো একটা ফয়সালায় উপনীত হওয়া সম্ভব হতে পারে।

প্রথাগতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কার্যালয়ে দিনের শুরুতে সম্মেলন উদ্বোধন করবেন। তারপর শুরু হবে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ভিত্তিক মন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে আলোচনা।

এবারও জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মনোগ্রাম সম্বলিত গাড়িতে পতাকা ব্যবহারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য ঝুঁকিভাতা চালুর প্রস্তাব রয়েছে। ডিসিদের অধীনে সার্বক্ষণিক এক প্লাটুন পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনের অধীনে প্রকৌশল ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এবার মোট বৈঠক থাকছে ২৯টি। এর মধ্যে কার্য-অধিবেশন ২৪টি। আর ৫৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের স্থলে ৫৫টি। এবার নতুন করে সংযোজন হচ্ছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ।

২০০৭ সালের ১ নভেম্বর উচ্চ আদালতের রায়ে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করা হয়। এরপর সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বাধীন বিচার বিভাগও প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে নির্বাহী বিভাগের বিচারিক ক্ষমতা অনেকাংশে কমে আসে। তবে মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর আওতায় নির্বাহী বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেটরা এখনো ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা, ইভটিজিং নিয়ন্ত্রণসহ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন; কিন্তু এরপরও বিচারিক ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে কয়েক বছর ধরে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে প্রকাশ্যে ভিন্ন মত দেখা গেছে।

সর্বশেষ ২০১৭ সালে মোবাইল কোর্ট আইন অবৈধ ষোষণার ছয় মাস পর আবার বৈধ করা হয়। তবে এ নিয়ে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে টানাপোড়েন রয়ে গেছে।

 তাদের পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ফলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা তাত্ক্ষণিক ফৌজদারি কার্যবিধি ১৯০ ধারায় অপরাধ আমলে নিতে পারছেন না। ফলে মাঠ প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, সরকারি সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, পাবলিক পরীক্ষা তদারকি, নিরাপদ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং ভেজালবিরোধী অভিযান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা রাখাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। এ জন্য তারা জেলা ম্যাজিস্ট্রেসিতে কর্মরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা বাড়াতে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ১৯০(১)(এ)(বি)(সি) (ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অপরাধ আমলে নেওয়া তত্পরবর্তী কিছু ক্ষমতা), ১৯১ (আসামির আবেদনক্রমে মামলা হস্তান্তর), ১৯২ এবং মামলা বিচারে প্রস্তুত করার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি: ১৫৫, ১৫৬, ১৫৯, ১৬৪, ১৬৭, ১৯৫-১৯৯, ২০০-২০৪ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগের এখতিয়ার চান ডিসিরা। ডিসিরা জানিয়েছেন, উল্লিখিত ধারায় ক্ষমতা না থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।