দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রংপুরের ৪ চিনিকল, নেই চালুর উদ্যোগ 

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৪, ১৮:৩৪

চার বছর ধরে বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে রংপুরের শ্যামপুর সুগার মিল, দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ সুগার মিল, গাইবান্ধার রংপুর সুগার মিল ও পঞ্চগড় সুগার মিল। চারটি চিনিকলের শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ছিল লাখের উপর। এদিকে লোকসানের অজুহাত এবং আধুনিকায়নের নামে এসব চিনিকল বন্ধ করা হলেও চালু করার ব্যাপারে নেই কোনো উদ্যোগ। 

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার কারণে মিলগুলোর সব যন্ত্রাংশই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রাতের আঁধারে চুরি হচ্ছে সেখানে থাকা বিভিন্ন জিনিসপত্র।  

বন্ধ চিনিকল। ছবি: ইত্তেফাক

সম্প্রতি রংপুর প্রেস ক্লাবের সামনে চিনিকল কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশন ও আখচাষিদের উদ্যোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় চিনিকল কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ জানান, সিন্ডিকেটের কারণে রংপুর বিভাগের চারটি চিনিকল বন্ধ করা হয়েছে। বর্তমানে নতুন সরকার এসেছে। আমরা আশা করি, এ সরকার দ্রুততর সময়ের মধ্যে রংপুর বিভাগে বন্ধ হওয়া চারটি চিনিকলসহ সারা দেশের বন্ধ হওয়া সব চিনিকলগুলো খুলে দিবে।

এরই মধ্যে কারখানাগুলোর সক্ষমতা, জনবলসহ নানা বিষয় যাচাই-বাছাই করেছে একটি তদন্ত কমিটি। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার মিলগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। 

— মো. মাসুদ সাদিক

  ইনচার্জ, শ্যামপুর সুগার মিল

রংপুরের শ্যামপুর চিনিকল ঘুরে দেখা গেছে, কারখানার টিনের চালে অসংখ্য ছিদ্র। কোথাও কোথাও আবার পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। মরিচা পড়েছে অধিকাংশ যন্ত্রপাতিতে। আবার কোনোটি বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষায় ঢেকে রাখা হয়েছে পলিথিন দিয়ে। এক সময়ের কর্মমুখর শ্যামপুর সুগার মিলের বর্তমান চিত্র এখন খুবই নাজুক। বাইরের চিত্র আরও ভয়াবহ। পুরো কারখানা ঢেকে গেছে ঝোপঝাড়, জঙ্গলে। অলস পড়ে থাকতে থাকতে নষ্টের পথে অসংখ্য যানবাহন। যে কজন কারখানা দেখভালের দায়িত্বে আছেন, তাদেরও বেতন বন্ধ পাঁচ মাস ধরে। একই অবস্থা দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ সুগার মিল, গাইবান্ধার রংপুর সুগার মিল ও পঞ্চগড় সুগার মিলের। 

চিনিকলের পরিত্যক্ত যানবাহন। ছবি: ইত্তেফাক

জানা যায়, ষাটের দশকে গড়ে ওঠা এসব কারখানাই উত্তরের অর্থনীতির বড় শক্তি ছিল। ২০২০ সালে লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় দেশের ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল। যার চারটি রংপুর বিভাগে অবস্থিত। তৎকালীন সরকারের আধুনিকায়নের মধ্যদিয়ে এসব সুগার মিল চালুর কথা থাকলেও দীর্ঘ সময়ে তার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বন্ধ হওয়া এসব চিনিকলের দৈনিক আখ মাড়াইয়ের সক্ষমতা ছিল গড়ে দেড় হাজার মেট্রিক টন। বছরে চিনি উৎপাদন সক্ষমতা ১১ হাজার মেট্রিক টন। দেশে চাহিদার বড় অংশ জোগান আসত এসব চিনিকল থেকে।

জানা যায়, রংপুরের শ্যামপুর সুগার মিল ১৯৬৪ সালে ১০০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে। এর উৎপাদন শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। ২০০০ সাল পর্যন্ত চিনির মিলটি লাভজনক থাকলেও পরে লোকসানের মুখে পড়ে। পরে ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুমে মিলের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন। বন্ধ হয়ে যায় মিল এলাকায় আখ চাষ। 

পড়ে থাকায় নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রাংশ। ছবি: ইত্তেফাক

শ্যামপুর এলাকার আখচাষি জয়নাল হোসেন বলেন, আমরা বিভিন্ন সময় মিল চালুর জন্য আন্দোলন সমাবেশ করেছি কাজ হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার কাছে আমাদের প্রাণের দাবি হচ্ছে, তিনি যেন চিনিকলটি চালু করে এ অঞ্চলের মানুষকে অর্থনৈতিক দৈন্য থেকে বাঁচান। 

রংপুরের শ্যামপুর আখচাষি কল্যাণ কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন বলেন, চিনিকলটি চালু থাকা অবস্থায় আমাদের এই অঞ্চল থেকে কোটি কোটি টাকা মানি সার্কুলার হতো। গ্রামে থেকেও আমরা শহুরে জীবনযাপন করতাম। কিন্তু মিলটি এখন বন্ধ থাকায় এলাকার অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমরা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছি। অন্য ফসল চাষ করে আখচাষিরা সংসারের খরচ চালাতে পারছেন না। তাই অতি দ্রুত চিনিকলটি পুনরায় চালু করার দাবি জানাচ্ছি।

শ্যামপুর সুগার মিলের ইনচার্জ মো. মাসুদ সাদিক জানান, এরই মধ্যে কারখানাগুলোর সক্ষমতা, জনবলসহ নানা বিষয় যাচাই-বাছাই করেছে একটি তদন্ত কমিটি। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার মিলগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। 

তিনি বলেন, যন্ত্রাংশ পড়ে থাকলে নষ্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। চিনিকল চত্বরে চুরি ও গাছপালা লুট যেন না হয়, সে ব্যাপারে আমরা সজাগ রয়েছি।

ইত্তেফাক/এসএএস