গতকাল শনিবার টাইগারদের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবার গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন ক্যারিবিয়ান কোচ ফিল সিমন্স। আর এসময় সাংবাদিকদের উপস্থিত দেখে অবাক হয়ে যান তিনি। সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে থাকা বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজারকে অনুরোধ করেন একটি ছবি তুলে রাখার। হয়তো পরে তার কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিবেন এই ছবি।
এই সংবাদ সম্মেলনটি খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। তবে তার মধ্যেই বাংলাদেশ দল নিয়ে নিজের লক্ষ্য পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন সিমন্স। গেল মঙ্গলবার হঠাৎ এক ঘোষণায় বদলে যায় বাংলাদেশ দলের হেড কোচ। পরে ঐ দিন দুপুরেই এক সংবাদ সম্মেলন করে দ্বিতীয় মেয়াদে টাইগারদের দায়িত্ব পালন করতে থাকা লঙ্কান কোচ চণ্ডিকা হাথুরুসিংহেকে বদলি করে নিয়োগ দেওয়া হয় ফিল সিমন্সকে।
দায়িত্ব পাওয়ার পর দিনই মিরপুরে পা রাখেন তিনি, দলের অনুশীলনেও দুই দিন উপস্থিত ছিলেন তিনি। তবে গণমাধ্যমের আসতে সময় নিলেন তিন দিন। আর মুখোমুখি হয়েই জানিয়ে দিলেন স্বল্প সময়ে নিজের কাজের লক্ষ্য। বলেন, 'লক্ষ্য একটাই ম্যাচ জেতা, আমার কাজের ধরনই এমন। প্রথম কাজ আসন্ন সিরিজের প্রথম টেস্ট জেতা পরে দ্বিতীয়টি এরপর এই সিরিজ শেষে পরের সিরিজগুলোতেও জয়ের ধারা অব্যাহত রাখা। তো ঐটাই লক্ষ্য হলো সঠিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া ও ম্যাচ জেতার চেষ্টা করা।'
তবে শুধু কোচের লক্ষ্য থাকলেই হবে না। খেলোয়াড়দের মধ্যেও এমন মনোভাব থাকা লাগবে। কিন্তু এমনটি কি আদৌ রয়েছে? সবশেষ কয়েক দিনে দেশের ক্রিকেটে চলছে অস্থিরতা, দেশসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান দেশের মাঠ থেকে সাদা পোশাকে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলার ঘোষণা দিয়েও আসতে পারেনি। শুরুতে মিরপুর টেস্টের ১৫ সদস্যের টাইগার স্কোয়াডে জায়গা পেলেও ম্যাচের তিন দিন আগে তার দেশে ফেরার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে গেলে স্কোয়াড থেকে সাকিবকে বাদ দেওয়া হয় তার পরিবর্তে জায়গা পান তরুণ বাঁ-হাতি স্পিনার হাসান মুরাদ।
এখানেই শেষ নয়, ম্যাচের শেষ সময়ের প্রস্তুতি নেওয়ার আগে কাটা পরেছে টাইগার হেড কোচ চণ্ডিকা হাথুরুসিংহেও। বিষয়গুলো অবশ্যই ড্রেসিংরুমেও প্রভাব ফেলছে। তবে এসব পাশ কাটিয়ে যেতে চান সিমন্স। বলেন, 'আমার মনে হয়, সামনে একটা টেস্ট ম্যাচ (মিরপুর টেস্ট) আছে, খুব গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। এছাড়া সামনে যে কটা (টেস্ট ফরম্যাটে) ম্যাচ আছে সেগুলো যদি জিততে পারি তাহলে আমরা ফাইনালের (টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের) লড়াইয়ে যেতে পারব। তো আমার প্রথম উদ্দেশ্য হলো ক্রিকেট। আমার সামনে যে স্কোয়াড আছে তাদের সোমবারের জন্য প্রস্তুত করা (প্রথম টেস্ট)। গেল দুই দিন দুর্দান্ত কেটেছে, তারা (স্কোয়াড) কঠোর পরিশ্রম করেছেন। সব মিলিয়ে বাইরের সকল আলোচনা কাটিয়ে আমরা ক্রিকেটে মনোযোগী হয়ে প্রথম ম্যাচের দিকে মনোযোগ দিতে চাই।'
এ প্রসঙ্গে ভিন্ন আরেকটি প্রশ্নের জবাবে বলেন, 'এটা একটা ব্যাপার (বাইরের আলোচনা)। আগামী কয়েক দিন আমাদের কাজের বড় একটা অংশ হচ্ছে, সব মনোযোগ ক্রিকেটে যেন থাকে তা নিশ্চিত করা। আমি যেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব, সেটাই। আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি কীভাবে ম্যাচের জন্য প্রস্তুতি নেব। আমি ছেলেদের নজরেও এটা রাখতে চাই।'
বাংলাদেশে নিজের সব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চান সিমন্স
প্রায় দুই দশকের কোচিং ক্যারিয়ার ফিল সিমন্সের। ২০০৪ সালে জিম্বাবুয়ে জাতীয় দলের কোচিং করানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার এই যাত্রা। আয়ারল্যান্ড, দুই দফায় নিজের দেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফগানিস্তানের কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাতে বলাই যায় এই পেশায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। আর সেটাই এবার নতুন দায়িত্বের নতুন মিশনে কাজে লাগাতে চান তিনি।
বলেন, 'সব অভিজ্ঞতাই আমাকে ছেলেদের প্রস্তুত করতে সহায়তা করবে সোমবারের জন্য। আফগানিস্তান আমাকে ভাষা জটিলতার চ্যালেঞ্জ সামলে কাজ করা শিখিয়েছে। আয়ারল্যান্ডে কাজ করে বুঝেছি কীভাবে তরুণদের গড়ে তুলতে হয়। সব কিছুই এখানে কাজে দেবে।' এর আগে দুই দফায় বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন সিমন্স। তবে বিসিবির পক্ষ সে সময় কোনো সাড়া পাননি। তবে এবার পেয়েছেন।
টাইগারদের দায়িত্ব নেওয়ার তার এমন আগ্রহের মূল কারণ তারুণ্যনির্ভর দল। বলেন, 'আগ্রহটা এসেছে তরুণ খেলোয়াড়দের দেখে। ওরা পাকিস্তানে নিজেদের দারুণভাবে প্রমাণ করেছে। যদিও ভারতে টি-টোয়েন্টিতে ভালো খেলেনি। কিন্তু ভারত ঐ সংস্করণে সেরা দল। আপনার সেখান থেকে শেখার ছিল অনেক কিছু। প্রথমত, আমি তরুণদের গড়ে তুলতে চাই। পাশাপাশি এখানে টেস্ট ও ওয়ানডে সংস্করণে কাজ করার সুযোগও আছে। সব মিলিয়ে আমার এখানে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন ছিল না।' এ সময় নিজের নতুন মিশনের কথা জানিয়ে বলেন, 'প্রথমত, আমি তরুণদের গড়ে তুলতে চাই। পাশাপাশি এখানে টেস্ট ও ওয়ানডে সংস্করণে কাজ করার সুযোগও আছে। সব মিলিয়ে আমার এখানে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন ছিল না।'
পাঁচ মাসের মিশন
সিমন্সকে বিসিবি আপাতত নিয়োগ দিয়েছে পাঁচ মাসের জন্য। যার মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের শুরুতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি দিয়ে। সময়টা কম হলেও ব্যস্ততার কমতি থাকবে না তার। যার শুরু হবে আগামীকাল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে লাল ও সাদা বলের সিরিজ দিয়ে। এরপর টাইগাররা খেলবে আফগানিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও। পাশাপাশি রয়েছে বিপিএলও। ব্যস্ত এই সূচির মাঝে তাই দল নিয়ে কাজ করার সুযোগ সামান্যই পাবেন সিমন্স। তবে যতটুকু সময় পাবে পুরোটাই কাজে লাগাতে চান তিনি। তাই এখন থেকেই আগামী কয়েক মাসের পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলছেন বাংলাদেশ কোচ। বলেন, 'এই সিরিজের পর আমরা আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলব, সেখান থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ফেব্রুয়ারিতে, এর আগে বিপিএল আছে। জানুয়ারিতে কী করব, খেলোয়াড়দের নিয়ে কী পরিকল্পনা তা বসে ঠিক করতে হবে। বিপিএল ও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মধ্যে কতটুকু সময় থাকে, তা দেখে সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে হবে।'
কোচের চাকরিই 'হট সিট'
২০১৭ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ দফায় পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশ দলের হেডকোচ পদে। আর কোনো কোচদের বিদায় খুব একটা সুখকর হয়নি, তবে শুধু এই সময়ই না এর আগের আগে বিভিন্ন সময় লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের ভাগ্যেও মেলেনি সুখের বিদায়। সবশেষ হাথুরুসিংহের আগে রাসেল ডোমিঙ্গো এবং স্টিভ রোডসের বিদায়টাও স্বাভাবিক ছিল না। আর এসবই জানেন সিমন্স তবুও নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে বাংলাদেশে এসেছেন তিনি। বলেন, 'যে কোনো আন্তর্জাতিক দলের কোচের চাকরিই 'হট সিট।' আপনি বলতে পারেন, বাংলাদেশ ভিন্ন ব্য পাকিস্তান ভিন্ন। তবে আমার কাছে বিষয়টা হলো ক্রিকেটারদের তৈরি করা, সব কিছু উপভোগ করা এবং ম্যাচ জেতা। এই মুহূর্তে আর কিছু নিয়ে ভাবছি না। গত দুই দিন সব কিছু খুব ভালো গেছে। দুই দিনেই আমি বলতে পারব না, কতটা কঠিন।'
