রাজনৈতিক সংকট ঠেকাতে প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস

 

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৪, ১৫:৫৫

দেশে নতুন করে সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক সংকট যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে বলেছে বিএনপি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিন সদস্য আজ বুধবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করে এ কথা বলেছেন। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এ বৈঠক হয়। 

বৈঠক শেষে বিএনপির পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নজরুল ইসলাম খান। এ সময় সাংবাদিকেরা জানতে চেয়েছিলেন, ‘বৈঠকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে আপনাদের কাছে কোনো কিছু জানতে চাওয়া হয়েছিল কি না বা আপনারা কিছু বলেছেন কি না।’

জবাবে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট করে নয়, আমরা বলেছি, দেশে নতুন করে সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক সংকট যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকে সবার খেয়াল রাখতে হবে।’

বিএনপির এই স্থায়ী কমিটির সদস্য আরও বলেন, ‘আমরা দেখছি, পতিত ফ্যাসিবাদ এবং তাদের দোসরেরা নানা কৌশলে, নানাভাবে দেশে রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আমরা মনে করি, দীর্ঘদিন লড়াই করে রক্তের বিনিময়ে আমরা যে পরিবর্তন অর্জন করেছি, সেই পরিবর্তন সুরক্ষায় এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় করা দরকার। এখানে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি–পেশার সংগঠন, ছাত্র-যুবক—সবার একটি দৃঢ়তর ঐক্য গড়ে তোলা দরকার, যাতে কেউ দেশে নতুন করে সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে না পারে। সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সোচ্চার থাকতে হবে।’

উপরের সংবাদভাষ্য আজকের দৈনিক প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত। একই দিনে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকা ‘যেকোনো সময় বিদায় রাষ্ট্রপতির’ শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর প্রকাশ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যেকোনো মুহূর্তে পদত্যাগ করতে পারেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে এবং অনেকেই এর পিছনে বিভিন্ন কারণ খুঁজছেন। সরকারের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয় এবং এ ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, শপথ ভঙ্গের অভিযোগ ওঠার পরও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু এর পেছনে কোন স্পষ্ট কৌশল নেই।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, কেন এই আলোচনা এতো জোরালো হয়ে উঠেছে এবং রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে কেন এত উৎকণ্ঠা? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন পক্ষের চাপের কারণে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা এবং সরকার পরিচালনার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর সংকেত।

প্রেসিডেন্টের শপথ ভঙ্গের অভিযোগ ওঠার পর তার পদত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে, কিন্তু প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন যে, এখনও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের পক্ষ থেকে স্বচ্ছতা ও প্রতিশ্রুতি বজায় রাখা প্রয়োজন, যাতে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। 

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু সম্প্রতি শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়ে অজ্ঞতার কথা বলার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন এবং সংসদ ভেঙে দেওয়ার জন্য তার সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে করতে হবে।

৫ আগস্ট রাতে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি দাবি করেন যে, প্রধানমন্ত্রী তার কাছে পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন, যা একটি আইনগত প্রক্রিয়ার নির্দেশ করে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করেছেন বলেই মনে হয়েছে। তবে, রাষ্ট্রপতি পরবর্তী সময়ে এই বিষয়টি নিয়ে জল ঘোলা না করার নির্দেশ দিয়ে, তাঁর পূর্ববর্তী বক্তব্যের সঙ্গে একটি অসঙ্গতি তৈরি করেছেন।

এটা স্পষ্ট যে, রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে। এমন দ্বিচারিতার মধ্যে রাষ্ট্রপতির অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। জনগণ ও রাজনৈতিক মহল তাঁর বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, যা সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির উচিত স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা, যাতে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি না বাড়ে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়।

রাষ্ট্রপতির দ্বিচারিতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তা রাষ্ট্রের কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এই দ্বিচারিতার পিছনে সম্ভবত রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক অবস্থান এবং সরকারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করার চেষ্টা রয়েছে।

একদিকে, তিনি সংবিধান মেনে চলার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে নিজের বক্তব্যের ভিন্নতা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি যদি “সংবিধান লংঘন বা গুরুতর অসদাচরণ” করেন, তাহলে সংসদ সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনে তার অপসারণ সম্ভব। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে, যেখানে সংসদ ভেঙে গেছে এবং সদস্যরা পালাতক, সেখানে এই প্রক্রিয়াটি কার্যকরী হতে পারে না। এর ফলে, দেশের রাজনৈতিক কাঠামো একটি গভীর সংকটে প্রবেশ করেছে। যদিও কিছু ছাত্র সংগঠন রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবি জানাচ্ছে, তবে আমি মনে করি, তা আইনের পরিপন্থী হবে।

এ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি যেহেতু সংবিধান অনুযায়ী কার্যক্রম চালাচ্ছেন, তাই তিনি আইনের মধ্যে থাকতে চেষ্টা করবেন। রাষ্ট্রপতির উচিত আপিল বিভাগের কাছে গিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে মতামত চাওয়া, যেন তিনি জানতে পারেন কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। আপিল বিভাগ যদি তাকে একটি কার্যকর রাস্তা দেখায়, তাহলে সংকটের সমাধানে সহায়তা করবে। যদি আপিল বিভাগ তাকে অপসারণের নির্দেশ দেয়, তবে সেটি সংবিধানের অধিকারভিত্তিক হবে এবং রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবী জানিয়েছেন।

এদিকে, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়েও দেশে অনেক আলোচনা সমালোচনা চলছে। যদি রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে বলা হয়, তাহলে এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এখানে সাংবিধানিকভাবে ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়বে।

রাষ্ট্রপতি পদে শূন্যতা এই মুহুর্তে রাষ্ট্রীয় সংকট সৃষ্টি করবে ও সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করবে, এটা জাতির কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির পদটা একটা সাংবিধানিক পদ, একটা প্রতিষ্ঠান, সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। এই পদে হঠাৎ করে পদত্যাগের মাধ্যমে শূন্যতা সৃষ্টি হলে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে, রাষ্ট্রীয় সংকটের সৃষ্টি হবে। রাষ্ট্রীয় সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথটা বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত হওয়া বা কণ্টকাকীর্ণ হওয়া—সেটা জাতির কাম্য হতে পারে না।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘সংস্কারের যে কাজ চলছে, এটা দ্রুততর করা, সেই সংস্কার ঐক্যমতের ভিত্তিতে করা। জনগণের সঙ্কটগুলো দ্রুত নিরসন করা। এই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠা করা। আর আমরা আলোচনা করেছি যে, পতিত স্বৈরাচারের দোসররা যদি কোনো সাংবিধানিক কিংবা রাজনৈতিক সঙ্কটের অপপ্রয়াস করে তাহলে আমরা গণতন্ত্রকামী এবং আন্দোলনরত যেসব রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সংগঠন আছে ঐক্যবদ্ধভাবে সেটা মোকাবিলা করব, ইনশাআল্লাহ।’

তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে। তা ছাড়া, জনগণের মধ্যে আস্থা ফেরানোর জন্য সকল পক্ষের মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজন। বর্তমান সরকার একটি অন্তর্বর্তী সরকার, যা নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করছে।

অতএব, সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণকে একসঙ্গে আলোচনায় বসে সংকটের সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। দেশে যদি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে তা সকলের জন্য ক্ষতিকর হবে। শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে হলে, সবার মধ্যে একযোগে চিন্তাভাবনা এবং সহযোগিতা আবশ্যক।


লেখক : কথাসাহিত্যিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

ইত্তেফাক/এসএএস