নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত মানিকগঞ্জের দিঘলীয়া ইউনিয়নবাসী

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৪, ১৪:৩৪

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার দিঘলীয়া ইউনিয়ন পরিষদের আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান মো. শফিউল আলম জুয়েল পরিষদের অনুপস্থিতি ও তাকে অপসারণের পর পরিষদের কার্যক্রমগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ইউনিয়নবাসী।

চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকায় পরিষদের কার্যক্রম চলমান রাখতে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছেন উপজেলা প্রশাসন। তবে, কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি যথাযথভাবে কাজ করছেন না বলে অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাসে একদিন পরিষদের আসলেও প্রয়োজনীয় সেবা না দিয়ে চলে যান। 

ইউনিয়নবাসীর দাবী প্রশাসক পরিবর্তন করে নির্বাচিত ১১ জন সদস্যদের মধ্যে থেকে একজন কে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হোক।

মঙ্গলবার (২৯অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে দিঘলীয়া ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সেবাপ্রার্থীদের জটলা দেখা গেছে। জন্মসনদ,ওয়ারিশান সনদ,পরিচয়পত্র, প্রত্যয়নপত্রসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে পরিষদে আসেন তাঁরা। কিন্তু চেয়ারম্যান না থাকায় হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে এসব সেবা গ্রহীতাদের। 

জানা গেছে,২০২১ সালে ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি ক্ষমতার দাপটে দিঘলীয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি উপজেলার বেংগুয়া গ্রামের বাসিন্দা। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক ১৪ দলীয় জোট আওয়ামীলীগ সরকার শেখ হাসিনার পতনের পর সাটুরিয়া উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ফুকুরহাটি ইউপি চেয়ারম্যান মো. জিয়াউর রহমান জিয়া ব্যতীত উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চলে যান আত্মগোপনে। তারা হলেন, উপজেলার সদর ইউপি চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন পিন্টু, দরগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান আলিনুর বকস রতন, ধানকোড়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ, হরগজ ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খান জ্যোতি, তিল্লী ইউপি চেয়ারম্যান শরিকুল ইসলাম ধলা, বরাইদ ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হাই, বালিয়াটী ইউপি চেয়ারম্যান মীর সোহেল আহম্মেদ চৌধুরী ও দিঘলীয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. শফিউল আলম জুয়েল। 

অভিযোগ রয়েছে এই ৮ জন ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলহাজ্ব জাহিদ মালেক এমপি'র একান্ত আস্থাভাজন। কিছুদিন পর এদের মধ্যে ৭ জন চেয়ারম্যান পরিষদের যোগদান করলে ও  দিঘলীয়া ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম দুনীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে অনাস্থা প্রস্তাব করেন পরিষদের ১১ সদস্য। এই প্রস্তাবের কারণে মো. শফিউল আলম জুয়েলকে অপসারণ করা হয়েছে। 

উপজেলার দিঘলীয়া ইউনিয়নের তেবারিয়া গ্রামের মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন,আমার জমি নামজারি ও জমা ভাগ (খারিজ) করার জন্য দ্বৈত প্রত্যায়ন পত্রের প্রয়োজন। দ্বৈত প্রত্যায়ন পত্রের জন্য দিনের পর দিন ঘুরছি। চেয়ারম্যান না থাকায় আমরা ইউনিয়নবাসী চরম দুর্ভোগের স্বীকার হচ্ছি। এখান থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে উপজেলা প্রশাসন। এ কাজে গত কয়েকদিন ধরে উপজেলা পরিষদে ঘুরছেন। প্রতিদিন যাতায়াতে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি।

দিঘলীয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মো. আকাশ আলী, মো.জাকির হোসেন ও আলামিন জানান, আগামী ১০ নভেম্বর পুলিশের চাকুরী জন্য প্রত্যায়ন পত্রের প্রয়োজন। প্রত্যায়ন পত্র না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন তারা। 

উপজেলার দিঘলীয়া ইউনিয়নের দিঘলীয়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মো. ফরমান আলী জানান, তার মেয়ে তাসলিমা আক্তারে জন্ম নিবন্ধনের ভুল সংশোধন করার জন্য গত দুই মাস যাবত চেয়ারম্যান না থাকায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ কাজে গত কয়েকদিন ধরে উপজেলা পরিষদে ঘুরছেন তিনি। প্রতিদিন যাতায়াতে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি।

চাচিতারা গ্রামের মো. শরিফুল ইসলাম জানান, তার মায়ে মৃত্যু সনদের জন্য গত দুই মাসে উপজেলা প্রায় ১৫ দিন যাতায়াতের করেছেন। এতে তার প্রায় ৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন পর্যন্ত মৃত্যু সনদ পাননি।

ভুয়া গ্রামের জাকির মাহম্মুদ জানান, তার ছেলে ও মেয়ে জন্ম নিবন্ধনে স্বাক্ষরে জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে একাধিকবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে ও এ্যাসিল্যান্ডের স্বাক্ষর নিয়ে পারিনি। আজ প্রায় ৬ ঘণ্টা ধরে বসে অপেক্ষা করছেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভুক্তভোগী জানান, তাদের উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলেও আমাদের সময় দেন না। উপজেলা প্রশাসন কার্যালয়ে এসেও সেবা না পেয়ে চলে যান তারা।

এ বিষয়ে দিঘলীয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. হানিফ আলী বলেন, পরিষদের চেয়ারম্যান না থাকলে একটু জটিলতা হবেই। তবে ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীর আহমেদ। জরুরী প্রয়োজনে ভূমি অফিসে গিয়ে স্যারের সঙ্গে দেখা করে পরিষদের কার্যক্রম চলমান রাখছি। সবধরনের কার্যক্রম চলমান আছে। তবে জন্মনিবন্ধন বিষয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শান্ত রহমান বলেন, এই ইউনিয়নে সেবা নিশ্চিত করা ও যাতে জনসাধারণকে সেবা নিতে এসে ভোগান্তি না হয়। সেটি মাথায় রেখেই পরিষদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান রাখতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ্যাসিল্যান্ড দায়িত্ব পালন করছি।

ইত্তেফাক/এএইচপি