ডেঙ্গু নির্মূলে টিকার পাশাপাশি সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন

আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৯, ২২:০৭

বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু লইয়া আতঙ্ক নূতন কিছু নহে। প্রতিবারই এই আতঙ্কের পারদ একটু একটু করিয়া চড়িতে থাকে। এইবারও ডেঙ্গুর দাপট অব্যাহত রহিয়াছে। মূলত ঢাকায় ডেঙ্গু প্রকটভাবে দেখা দিলেও এইবার চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কুষ্টিয়া ও মাদারীপুরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হইবার খবর পাওয়া গিয়াছে। সুতরাং ঢাকার অব্যাহত আতঙ্ক অন্য জেলাগুলিতে ছড়াইয়া পড়িবার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বের ১২৫টি দেশের প্রায় ৩৯০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে আছে। বত্সরে প্রায় ৩৯ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়, যাহাদের মধ্যে প্রায় ৫ লক্ষ হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এমন পরিস্থিতি হইতে সুরক্ষার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্ব হইতে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার কমপক্ষে ২৫ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ কমাইয়া আনিবার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন মানবদেহে ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেয়।

তবে নানান কারণে আমাদের দেশে এখনো ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন চালু করা সম্ভব হয় নাই। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্যসব ভ্যাকসিনের চাইতে ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন কিছুটা আলাদা চরিত্রের। এই ভ্যাকসিন প্রয়োগের বয়সসীমা বাঁধিয়া দেওয়া হইয়াছে ৯ হইতে ৪৫ বত্সর। বয়সের সীমাবদ্ধতা ছাড়াও বর্তমানে প্রচলিত ভ্যাকসিনের আরেকটি সমস্যা হইল ইহা কেবল তাহাদের উপর প্রয়োগ করা যাইবে যাহারা একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইয়াছে। কিন্তু যাহার একবারও ডেঙ্গু হয় নাই কিংবা কাহারো যাহাতে ডেঙ্গু না হয়—এই উদ্দেশ্যে প্রচলিত ভ্যাকসিন প্রয়োগ করিলে উলটা বিপদ হইতে পারে। এমনকি কাহারো ডেঙ্গুর উপসর্গ হইলেও পরীক্ষায় ‘সেরো-নেগেটিভ’ হইলে তাহাকেও দেওয়া যাইবে না। এই ভ্যাকসিনের আরো একটি সমস্যা হইল—ডেঙ্গু ভাইরাসগুলির জিনোমে থাকা রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিডের (আরএনএ) খুব দ্রুত হারে ‘মিউটেশান’ হয় বিধায় ইহাদের আচার-আচরণ খুব তাড়াতাড়ি বদলাইয়া যায়। তাই দুই-তিন বত্সর পর হয়তো দেখা যাইবে ঐ টিকা আর কাজে লাগিতেছে না। তখন আবার নূতন টিকা তৈরি করিতে হইবে। তবে যেহেতু দ্বিতীয়বার কেহ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইলে উহা অধিক বিপজ্জনক রূপ ধারণ করিবার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়, সেই কারণে ডেঙ্গুর প্রচলিত ভ্যাকসিন আমাদের দেশের জন্য এই মুহূর্তে যথোপযুক্ত বলিয়া মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তাহা ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেই শর্তে এই ভ্যাকসিন বিভিন্ন দেশে ব্যবহারের অনুমোদন দিয়াছে সেই শর্ত আমাদের এখানে পূরণ করিয়াছে। বিশেষ করিয়া আমাদের দেশে ডেঙ্গু সেরোটাইপ পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। সুতরাং ডেঙ্গু ভ্যাকসিন চালু করাটা যথোপযুক্ত বলিয়া মনে করিতেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। অনেকের মতে, ভ্যাকসিন চালু না করিতে পারিলে ডেঙ্গু নির্মূল করা তুলনামূলক কঠিন হবে।

তবে শুধু টিকাই ডেঙ্গু-প্রতিরোধে প্রধান উপায় নহে। বরং ইহা সহযোগী মাত্র। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ হইতে শুরু করিয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। ইহার কোথাও ফাঁকি থাকিলে ডেঙ্গুবাহিত অ্যাডিস মশার বিস্তার প্রতিহত করা সম্ভব হইবে না।