আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীসহ জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সর্বশক্তি দিয়ে বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমরা সুখে-দুঃখে জনগণের পাশে আছি এবং থাকব। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। এখন বৃষ্টি হচ্ছে, বন্যা হচ্ছে বা কোথাও নদীভাঙন বা পাহাড় ধস হতে পারে। প্রতিনিয়ত কোথায় কী ঘটছে তার খবর নিচ্ছি। কার কী দায়িত্ব সেটা দেওয়া আছে, তারা সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এখানে শৈথিল্যের সুযোগ নেই। তাদের কাজ করে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে মেসেজ দিয়ে জানাতে হয়। দেশের চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জনমত যেন পক্ষে থাকে সেদিকে নজর দিতে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল শুক্রবার গণভবনে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সূচনা বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিকাল চারটায় উপদেষ্টা পরিষদ এবং বিকাল সাড়ে চারটায় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক শুরু হয়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বৈঠক দুটিতে সভাপতিত্ব করেন। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর নেতৃবৃন্দের রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
নৌকার বিরোধিতায় শাস্তির মুখে ৬২ মন্ত্রী-এমপি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের বিরোধিতাকারীদের শাস্তি দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিপক্ষে যেসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-এমপি বা আওয়ামী লীগের নেতা কাজ করেছেন তাদের শোকজের (কারণ দর্শানো) চিঠি পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া যারা নৌকার বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন, তাদের সাংগঠনিক পদ স্থগিত করার পাশাপাশি শোকজ করা হচ্ছে। শোকজের পর দায়িদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত জানান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সিদ্ধান্তের ফলে ৬২ জন মন্ত্রী-এমপি দলীয় শাস্তির মুখে পড়তে পারেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-এমপিদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। জানা গেছে, এ সংক্রান্ত চিঠি শিগগিরই কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের মদদদাতাদের কাছে ডাকযোগে পাঠানো হবে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে জবাব চেয়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার এ চিঠি যাবে। জবাব পেলে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড তা যাচাই-বাছাই করে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থানদের চূড়ান্ত সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
সূচনা বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তুলে বাংলাদেশকে একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে রেখে গিয়েছেন। আমরা তাঁরই পথ ধরে এগিয়ে গিয়ে আজকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। আমাদের চলার পথ কিন্তু খুব সহজ ছিল তা না। অগ্নিসন্ত্রাস, খুন, নির্যাতন অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে। তারপরেও আমরা এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি। ইতিমধ্যে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। আমরা আরো সামনে যেতে চাই। আমরা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়তে চাই। আমাদের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখেছি।
সরকারের সমালোচনাকারীদের প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটাও ঠিক যে আমাদের দেশে কিছু লোক থাকেই কোনো কিছুই ভালো লাগে না। এই যে আমরা অর্থনৈতিকভাবে যতদূরই এগিয়ে যাই, কিছু লোকের সব সময় এটাকে ভিন্ন একটা চোখে দেখার অভ্যাস আছে। এরা আসলে কখনো গণতান্ত্রিক ধারা চায় না। গণতান্ত্রিক ধারা থাকলে তাদের মনে হয় দমবন্ধ, তারা মনে হয় নিঃশ্বাস নিতে পারে না—এরকম একটা ভাব তাদের।’ তিনি বলেন, ‘দেশে অস্বাভাবিক একটা অবস্থা থাকলে তাদের খুব দাম বাড়ে। কাজেই দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা অব্যাহত থাকুক সেটাই আমরা চাই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা খুব বড়ো বড়ো উন্নত দেশের মতো উন্নয়ন হয়তো করতে পারব না। কিন্তু প্রতিটি মানুষই তার জীবনটাকে অর্থবহ করবে, দারিদ্র্যের হাত থেকে তারা মুক্তি পাবে, তারা সুন্দরভাবে বাঁচতে পারবে। তাদের জীবনের যে লক্ষ্যগুলো তা পূরণ করে অন্তত সেইভাবে আমাদের দেশটাকে গড়ে তুলতে চাই। এই বাংলাদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধ। সোনার দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে, যেটা জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল।’
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের আরো সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপদেষ্টারা থিংকট্যাংকের মতো। আমি এইটুকু চাইব আপনাদের সবাইকে আরেকটু সক্রিয় হতে হবে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। তা ধরে রাখতে হবে। আর এখানে রাজনৈতিক শক্তি খুব বেশি প্রয়োজন।
সূত্র জানায়, বৈঠকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে সংসদ প্রাণবন্ত হয়েছে। বিএনপিসহ সবাই পার্লামেন্টে এসেছে। এটা শেখ হাসিনার কৌশলের বিজয়। ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত সংগঠনকে আরো গতিশীল করার ওপর গুরুত্বারোপ করে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল দ্রুত নিরসন করতে হবে। তিনি বলেন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যারা নৌকার প্রার্থীর বিরোধিতা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নইলে দলে শৃঙ্খলা থাকবে না।
জানা গেছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের শিগগিরই দলীয় পদ স্থগিত করে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী হওয়ার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হবে। ১৫ দিনের মধ্যে নোটিশের জবাব দিতে বলা হবে। জবাব সন্তোষজনক না হলে বহিষ্কার করা হবে। আর সারাদেশে নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের সহায়তাকারীদের সনাক্তে কাজ করবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী গঠিত ৮টি সাংগঠনিক টিম। এসব টিমের সমন্বয়কারীদের দ্রুত অভিযুক্তদের নামের তালিকা চূড়ান্ত করে জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা।
এছাড়া বৈঠকে ৫ আগস্ট শহীদ শেখ কামালের জন্মদিন, ৭ আগস্ট কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুবার্ষিকী, ৮ আগস্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস, ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলা দিবস, ২১ আগস্ট শেখ হাসিনা হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা দিবস, ২৪ আগস্ট আইভী রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী ও ২৭ আগস্ট কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু বার্ষিকীর কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ।
