কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ। তিনি বেঁচে থাকলে এবং বাংলাদেশের এখনকার ক্রিকেট দেখলে হয়তো লিখতেন উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে ক্রিকেট। নামে টাইগার হলেও ব্যাট হাতে নামার সঙ্গে সঙ্গে বিপরীত হয়ে যায় সেই অভিধা।
দুই যুগের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়মিত ক্রিকেট খেলছে বাংলাদেশ। অথচ এখনো চলতে হচ্ছে খুঁড়িয়ে। একের পর এক হারের ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলছেই। ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার পরে এবার আফগানিস্তান। প্রথম ওয়ানডে নাজমুল হোসেন শান্তরা হেরেছেন শোচনীয়ভাবে। আজ দ্বিতীয় ওয়ানডে আফগানদের বিপক্ষে। হারলেই লাল-সবুজ প্রতিনিধিরা আরো একটি সিরিজ হারের কবলে পড়বেন। আর জিতলে রক্ষা হবে সিরিজ। সেই বিষয়ে মুখে শতভাগ জানিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
গতকাল শারজায় দাঁড়িয়ে মিরাজ বলেছেন, ‘একটা ম্যাচ হেরেছি, এখনো দুইটি ম্যাচ রয়েছে। দ্বিতীয় ম্যাচটি আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেহেত সিরিজে পিছিয়ে আছি। একটা ম্যাচ খেলেছি এখানে, অনেক দিন পর আমরা ওয়ানডে খেলেছি। সাত-আট মাস আগে আমরা খেলেছি। সবার ভেতরে ঐ জিনিসটাও একটু কাজ করছিল যে, অনেক দিন পর আমরা ওয়ানডে খেলছি। এবার প্রস্তুতিটা সেভাবে নিয়েছি। আশা করি, যেহেতু অনেক দিন পর খেলেছি, এই মাঠের ব্যাপারে একটা ধারণা হয়েছে। ভালো মোমেন্টাম কীভাবে নিতে হবে, সেজন্য অনুশীলন করছি।’
শোচনীয় হার নিয়ে বাংলাদেশের অলরাউন্ডার মিরাজ বলেছেন, ‘আফগানিস্তানের বিপক্ষে এর আগে আমরা অনেক ম্যাচ জিতেছি। এর আগে ওয়ানডেতেও জিতেছি, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ, দেশের মাটিতে সিরিজ জিতেছি। এটা এমন নয় যে, একটা ম্যাচ হেরেছি আমাদের সবকিছু চলে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিটি দল ভালো অবস্থানে থাকে। কখনো কোনো দলকে ছোট বলা যাবে না। আমরা একটা ম্যাচ হেরেছি, যেভাবে আশা করেছিলাম, উইকেট সেভাবে আচরণ করেনি। এর দায় আমাদের নিতে হবে।’
দায় কাঁধে নিয়ে মিরাজ বলেছেন, ‘আমি আর শান্ত যখন ব্যাটিং করছিলাম, তখন আমাদের দুই জনের কাছে উইকেট সহজ মনে হচ্ছিল। কিন্তু ২০ ওভার পর বল যখন একটু নরম হয়েছে, পুরোনো হয়েছে, তখন হঠাৎ করেই বাঁকটা বেশি নেওয়া শুরু হয়েছে। তাতে আমি আর শান্ত ভুগেছি। হ্যাঁ, আমরা দুই জন যেভাবে থিতু ছিলাম, আমাদের মধ্য থেকে এক জনের শেষ করা উচিত ছিল। আমি শান্তকে বারবার বলছিলাম, আমাদের দুই জনের যেহেতু সমস্যা হচ্ছে খেলতে, তাই পরের ব্যাটারদের জন্য অনেক কঠিন হবে। হঠাৎ করেই উইকেট এমন টার্নিং (বাঁক) হচ্ছিল, স্লো টার্নিং হচ্ছিল, সোজা আসছিল। আগে থেকে ধারণা করা যায়নি কোন বল সোজা আসবে, কোন বল বাঁক নেবে। এটা হঠাৎ করে হয়েছিল।’
নিজেদের ভুল স্বীকার করে মিরাজ বলেছেন, ‘ঐ সময়ে আমরা ভুল করেছি। শান্তও ভুল করেছে। এটা নিয়ে আমরা কথা বলেছি। এই উইকেটে আমার মনে হয়, সেট ব্যাটারদের খেলা শেষ করা উচিত ছিল। এটা অবশ্যই, আমি ও শান্ত দুই জনেই ভুল করেছি।' নিজের বোলিং নিয়ে তিনি বলেছেন, 'আমার কাছে যতটা প্রত্যাশা ছিল, ততটা আমি পূরণ করতে পারিনি। যেমন ধরুন, মাঝের ওভারগুলোয় আমি ও রিশাদ যদি ২টি উইকেট বের করতে পারতাম, তাহলে আমাদের জন্য সহজ হতো। হয়তো রান কম দিয়েছি, কিন্তু আমার কাছে দল উইকেট প্রত্যাশা করে। কারণ, দলে আমার ভূমিকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি উইকেট নিতে পারলে ও রান করতে পারলে বাংলাদেশের ম্যাচ জয়ের জন্য ভালো ভূমিকা পালন করে।’
তবে পেসারদের নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মিরাজ। বলেছেন, ‘পেস বোলাররা খুব ভালো বোলিং করেছে। দারুণ শুরু করেছেন। ফিজ, শরিফুল, তাসকিন- তিন জনই।’
আজকের ম্যাচে দলে দেখা যেতে পারে নাসুম আহমেদ- নাহিদ রানাদের। ভিসা জটিলতায় দলের সঙ্গে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতে যেতে পারেননি। অন্যদিকে চোটে ছিটকে গেছেন অভিজ্ঞ ব্যাটার ও উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিম। কেবল আফগান সিরিজ নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজেও মুশফিক খেলতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। মিরাজ তাকে নিয়ে বলেছেন, ‘মুশফিক ভাইয়ের চোট আমাদের জন্য দুঃখজনক। মুশফিক ভাই দলে কত গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আমরা সবাই জানি। কারণ, তিনি যেভাবে ক্রিকেট খেলেন এবং দেশকে সার্ভিস দিয়ে গেছেন, সেটা অসাধারণ।’
বাংলাদেশ যখন ক্রিকেটপাড়ায় পরিচিত মুখ, বড় দলগুলোকে হারানো কিংবা ধবলধোলাইয়ের স্মৃতি নিয়ে বেড়ে উঠছে, তখন আবির্ভাব হয়েছে আফগানিস্তানের। সেই আফগানিস্তান এখন চোখে চোখ রেখে লড়াই করে। অথচ বাংলাদেশের সেই মানসিকতাই এখনো তৈরি হয়নি। একটা সময়ে দেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের লড়াই দেখে ভক্তরা গর্ব করতেন। হেরে গেলেও পরের ম্যাচে আশা দেখতেন ভালো কিছুর। কিন্তু এখন দেশের ক্রিকেট এমন পর্যায়ে গেছে যে, আমিনুল ইসলাম বুলবুলরা ভয় পান ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা হয়তো অন্য কোনো খেলা নিয়ে নিবে।
