আজ যেসব এলাকা হানাদারমুক্ত হয়

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৫১

ইত্তেফাক ডেস্ক

আজ ৪ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকা হানাদার মুক্ত হয়। দিবসটি উপলক্ষে নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। এ বিষয়ে প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো রিপোর্ট:

লক্ষ্মীপুর:লক্ষ্মীপুরের দামাল ছেলেরা ১৭ বার সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদারদের প্রতিহত করে আজকের এই দিনে লক্ষ্মীপুরকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন ৯ মাসে লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন স্থানে ১৭টি সম্মুখযুদ্ধসহ ২৯টি দুঃসাহসিক অভিযান চালায় মুক্তিযোদ্ধারা। এসব যুদ্ধে সৈয়দ আবদুল আলীম বাসু, মুনছুর আহমদ, আবু ছায়েদ, আবুল খায়ের, নজরুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন, আতিক, মোস্তাফিজুর রহমান, আলী আহাম্মদ (ইপিআর)সহ ৩৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এ ছাড়াও পাক-হানাদার বাহিনীর হাতে আরো জানা অজানা অসংখ্য নারী-পুরুষ শহীদ হয় এই জেলায়। দিবসটি পালন উপলক্ষে র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

জামালপুর:আজ বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে ১১ নং সেক্টরের গুরত্বপূর্ণ  কামালপুর এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। সশস্ত্র পাক হানাদার বাহিনী এদিনে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসর্মপণ করে। ১৯৭১ এর ১২ জুন থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাকবাহিনির ক্যাম্পে মোট ৮ বার আক্রমণ করে। সবচেয়ে বড় এবং রক্তাক্ত যুদ্ধ হয় ৩১ জুলাই রাতে। অবস্থা বেগতিক দেখে অস্ত্রসহ পাকবাহিনীর ১৬২ জনের একটি দল আনুষ্ঠানিকভাবে এদিনে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। হানাদারমুক্ত হয় কামালপুর রণাঙ্গণ।

জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা):এই দিনে ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলা হানাদার মুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর তুমুল প্রতিরোধের মুখে পাকহানাদার বাহিনী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর জীবননগর ছেড়ে পার্শ্ববর্তী জেলা ঝিনাইদহ অভিমুখে পালিয়ে যায়। এরপর স্বতঃস্ফূর্ত মুক্তিপাগল মুক্তিযোদ্ধারা জীবননগরের মাটিতে প্রথম উত্তোলন করে স্বাধীন বাংলার পতাকা। জীবননগর মুক্ত দিবস হিসেবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আজও এ দিনটি পালন করে আসছে।

 খোকসা (কুষ্টিয়া):খোকসা হাইস্কুল, শোমসপুর হাই স্কুল, গনেষপুরের গোলাবাড়ীর নিলাম কেন্দ্র, মোড়াগাছা রাজাকার বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি ছিল। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩ ডিসেম্বর রাত ১১ টার দিকে মুজিববাহিনী কমান্ডার আলাউদ্দিন খান, কে এম মোদ্দাসের আলী, আলহাজ সদর উদ্দিন খান, নুরুল ইসলাম দুলাল, আলহাজ সাইদুর রহমান মন্টু, রোকন উদ্দিন বাচ্চু, তরিকুল ইসলাম তরুর নেতৃত্বে ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা থানা দখলের জন্য চারদিক থেকে আক্রমণ করে। রাতভর গুলি বিনিময়ের পর প্রত্যুষে ১০৫ জন পুলিশ ও রাজাকার সদস্য আত্মসমর্পণ করে। ৪ ডিসেম্বর খোকসা থানায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন জানিপুর পাইলট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আলতাফ হোসেন।

 ঝিনাইগাতী (শেরপুর):১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে মিত্র বাহিনীর সহযোগিতায় বীর মুক্তিযোদ্ধারা এ উপজেলাকে শত্রুমুক্ত করে। ৩ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক দেড়টায় শালচূড়া ক্যাম্পের পাক হানাদার বাহিনী কামালপুর দুর্গের আগাম পতনের সংবাদ পেয়ে পিছু হটতে শুরু করে। তারা আহম্মদনগর পাক হানাদার বাহিনীর হেড কোয়ার্টারে অবস্থানরত সৈনিকদের সাথে নিয়ে রাতেই মোল্লাপাড়া ক্যাম্প গুটিয়ে শেরপুরে আশ্রয় নেয়। এভাবে রাতের আঁধারে বীর মুক্তিযোদ্ধারা এ উপজেলা শত্রুমুক্ত করে লাল সবুজের পতাকা উড়ায়।

দেবিদ্বার (কুমিল্লা):১৯৭১ সালের এই দিনে  মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমণে হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে মুক্ত করা হয় দেবিদ্বারকে। একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে হানাদারদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করে। এইদিন মুক্তিবাহিনী কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের কোম্পানীগঞ্জ ব্রিজটি মাইন বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয়। মিত্র বাহিনীর ট্যাংক বহর বুড়িচং ও ব্রাক্ষণপাড়া হয়ে দেবিদ্বার আসে। ট্যাংক বহরটি দেবিদ্বার থেকে চান্দিনা হয়ে ঢাকা অভিমুখে রওনা হলে মোহনপুর এলাকায় ভুল বুঝাবুঝির কারণে দুই মিত্র গ্রুপে গুলি বিনিময়কালে ৬ মিত্র সদস্য নিহত হন। এভাবেই ৪ ডিসেম্বর দেবিদ্বার শত্রুমুক্ত হয় এবং উল্লাসিত জনতা স্বাধীন বাংলার লাল সবুজের পতাকা নিয়ে বিজয়ের আনন্দে মেতে উঠেন।

মতলব দক্ষিণ (চাঁদপুর):এ দিনে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী মতলবের মাটি থেকে বিতাড়িত হয় এবং মতলব স্বাধীন হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মতলবের ১৮জন মু্ক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। মতলব মুক্ত দিবস পালন উপলক্ষে অন্যান্য বছরের মতো এবারও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ব্যাপক কর্মসূচি হতে নিয়েছে।

ফুলবাড়ি (দিনাজপুর):১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আজকের এইদিনে এলাকার মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী যৌথভাবে চতুর্মুখী আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি খানসেনাসহ তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ ফুলবাড়িকে মুক্ত করেন। পরে মুক্তিবাহিনী স্থানীয় সড়ক ও জনপথ ডাক বাংলো চত্বরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে বিজয়ের উল্লাস করেন।

সাঘাটা (গাইবান্ধা):পরদিন ৪ ডিসেম্বর ভোরে গেরিলা কমান্ডার সামছুল আলমের দলটি সর্বপ্রথম পুলিশ স্টেশন আক্রমণ করে উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলা ও গুলিবর্ষণ শুরু করলে অপর তিনটি দলের মুক্তিযোদ্ধারাও চারদিক থেকে গোলা বর্ষণের মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাশিবিরের দিকে এগুতে থাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফুলছড়ি পুলিশ স্টেশনের পুলিশ সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসর্মপণ করে। ওই দিনই ফুলছড়ি থানা ও তিস্তামুখ রেলওয়ে ফেরিঘাট হানাদার মুক্ত হয়।