রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের বিশেষায়িত দুইটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ৮৩ জন। হাসপাতালের বিছানায় অলস সময় কাটছে তাদের। বয়সে অধিকাংশই তরুণ। যাদের স্কুল-কলেজ মাঠে দূরন্ত সময় পার করার কথা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত হয়ে তারাই এখন চার দেওয়ালে কিছুটা বন্দি জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় অনেকটা ক্লান্ত তারা। চোখেমুখে যন্ত্রণা আর অবসাদের চিহ্ন স্পষ্ট। তবুও স্বপ্ন বুনে চলছে আব্দুল্লাহ আহমেদ, ইয়াসিন আরাফাত, মনির, সাদ আব্দুল্লাহ কিংবা গোলাম মোস্তফারা।
বি-৪১ নম্বর বিছানায় দীর্ঘ সময় ধরে আছেন আব্দুল্লাহ আহমেদ। ঢাকা আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। আন্দোলনে ডান পায়ে গুলি লাগে তার। একাধিক অস্ত্রোপচারের পর এখন স্টিলের রিং পরানো আছে। এই রিং পরেই থাকতে হবে আনুমানিক এক বছর। আব্দুল্লাহ বলেন, এভাবে শুয়ে বসে থাকতে কার ভালো লাগে? লেখাপড়া শুরু করে দিয়েছি। এইচ এসসি পরীক্ষা দিব। একটা বছর কোনোভাবেই নষ্ট করতে চাই না। চিকিত্সকেরা জানিয়েছেন, উন্নতি হচ্ছে। তবে সুস্থ হতে সময় লাগবে। পায়ে খাঁচা রাখতে হবে দেড় বছরের মতো। আব্দুল্লার ইচ্ছা ছিল, আর্মি অফিসার হবে। কিন্তু এখন এইচএসসি পাশ করে একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফেরাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাশেই বি-৪২ নম্বর বিছানায় বসে আছে ১৯ বছরের সাদ আব্দুল্লাহ। অস্ত্রোপাচারে ডান পায়ের গুলি বের হয়েছে, তারও পুরো পা জুড়েই স্টিলের রিং দিয়ে বাঁধানো। সাদ বলেন, চিকিত্সক জানিয়েছেন আমার পায়ের এই রিং খুলতে সময় লাগবে একবছর। বলেন, আর বিছানায় শুয়ে বসে থাকতে ভালো লাগে না। ইচ্ছে হয় একটু বাইরে ঘুরে আসতে।
ইয়াসিন আরাফাত রাজধানীর যাত্রাবাড়ী সবুজবিদ্যাপীঠের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এই শিক্ষার্থীর বাবা একজন ফলের দোকানের কর্মচারী। চার ভাইবোনের মধ্যে ইয়াসিন তৃতীয়। ইচ্ছে ছিল লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হওয়ার কিন্তু শুরুতেই যেন শেষ হয়ে গেল বলে জানান তার বড় বোন মারুফা বেগম। তিনি তার ভাইয়ের জন্য সহযোগিতা চান। ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানার সামনে গুলিতে আহত হন ইয়াসিন।
ইয়াসিন, সাদ কিংবা আবদুল্লাহর মতো আরো আছে-৮৩ কিশোর-তরুণ। ৪৫ নম্বর বিছানায় আছেন মো. এমিলি। ৩৯ বছর বয়সি এই তরুণ চাকরি করতেন একটি কসমেটিকসের দোকানে। মাসে ২০ হাজার টাকা বেতন পেতেন। তার আট বছর ও ১১ বছরের দুই ছেলেমেয়ে আছে। অর্থাভাবে দুই ছেলেমেয়েরই স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, খুব কষ্টে দিন কাটছে আমার স্ত্রী-সন্তানরা ও বৃদ্ধ মায়ের।
একই অবস্থা রিকশাচালক গোলাম মোস্তফার (৩৫)। ১৯ জুলাই রামপুরা বনশ্রীতে ডান হাতের কবজিতে গুলি বিঁধে তার। গত ২৩ জুলাই থেকে পঙ্গু হাসপাতালে আছেন। তিনি বলেন, ঘরভাড়া বাকি পড়েছে দুই মাসের। ছোট বাচ্চাটার দুধ কিনতে পারেন না, ১৪ বছর বয়সি ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী, মেয়েটার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। গোলাম মোস্তফা বলেন, শখ ছিল মেয়েটারে লেখাপড়া শেখাবো, কিন্তু নিজের এই অবস্থায় পাঁচ জনার সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান বলেছে, ১৭ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আহত ৭৬৯ জন এই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন। তাদের মধ্যে ৪০৯ জন ছিলনে গুলিবিদ্ধ। ভর্তি হয়েছেন মোট ৪২৫ জন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭ জনের পা ও চার জনের হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। আন্দোলনে আহতদের ৮৩ জন এখনো চিকিৎসাধীন। তাদের প্রায় সবারই হাত বা পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাকিরা চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে গেছেন বা পরবর্তী চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে গেছেন। তবে সবাইকে নিয়মিতভাবে হাসপাতালে আসতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করছে তাদের সুস্থতা। চিকিত্সকেরা জানান, এখনো ভর্তি থাকা ব্যক্তিদের সুস্থ হতে আরো এক বছরের বেশি লাগবে। কারো কারো লেগে যাবে দুই বছর।
