বন্ড সুবিধায় আনা বিদেশি সুতা ও কাপড় রপ্তানিকারকের গুদামে আসার আগেই হাতবদল হচ্ছে। অনেক সময় তা বন্দর থেকেই সরাসরি ক্রেতার কাছে চলে যাচ্ছে। ফলে বন্ড লাইসেন্সধারী রপ্তানিকারকের গুদামে সুতা বা কাপড় দেখা যায় না। এসব সুতা ও কাপড় অবৈধ উপায়ে চলে যাচ্ছে টেক্সটাইল মিল অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। ফলে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ, পাবনাসহ আরো কিছু এলাকার বাজার অবৈধ বিদেশি সুতা ও কাপড়ে সয়লাব হয়ে গেছে। এর সঙ্গে বিদেশ থেকে ব্যগেজের মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে আসা বস্ত্রও যোগ হচ্ছে। ফলে স্থানীয় স্পিনিং মিল মালিকরা অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে দিন দিনই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এসব কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এখন হুমকির মুখে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধায় আসা এসব সুতা ও কাপড় গুদামে না গিয়ে অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভিন্ন উপায়ে ক্রেতার কাছে চলে যায়। সেখান থেকে দেশের বস্ত্রশিল্প এলাকায় তা অবাধে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে বন্ডের সুতা অবৈধ বেচাকেনার কেন্দ্রবিন্দু নরসিংদীর বাবুরহাট ও মাধবদী। এর পরই বড়ো বিক্রির স্থান নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এলাকা। এর বাইরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, সোহাগপুর, বেলকুচি ও সিরাজগঞ্জ সদরসহ বস্ত্রকল অধ্যুষিত এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর এলাকার একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, এ সুতা আগে বিক্রি করতাম না। এখন ব্রোকার এনে দিয়ে যায়। সপ্তাহে আট থেকে দশ কার্টন (প্রায় আড়াই হাজার কেজি) বিক্রি হয়। এসব সুতা দিয়ে অপেক্ষাকৃত উন্নতমানের শাড়ি ও থ্রি পিছসহ অন্যান্য পোশাক তৈরি হয়। তিনি বলেন, শুনেছি এসব সুতা বন্ডের। কারখানার মালিকরা বিদেশ থেকে এনে নিজস্ব উত্পাদনে কিছু ব্যবহার করে আর বাকিটা বাইরে বিক্রি করে দেয়। তবে এসব সুতার প্রকৃত উত্স কোথায় তা আমরা জানি না।
সূত্র জানিয়েছে, বন্ডের কাপড় চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে খালাস হয়ে রাতের অন্ধকারে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়। এজন্য কিছু এলাকায় অস্থায়ী গোপন গোডাউনও গড়ে উঠেছে। এসব গোডাউন থেকে সুবিধামতো সময়ে কাপড় হাতবদল হয়।
স্থানীয় বস্ত্রশিল্প মালিকদের একটি সংগঠন সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে এ ধরনের একটি অভিযোগ পাঠিয়েছে। এতে অভিযুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি গোপন তালিকাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বন্দর থেকে সরাসরি গ্রাহককে সুতা ডেলিভারি প্রদান করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করার সুযোগ দিয়ে আসছে সরকার। তবে শর্ত হল—আমদানিকৃত কাঁচামালে উত্পাদিত চূড়ান্ত পণ্য পুরোপুরি রপ্তানি করতে হবে। এসব কাঁচামাল এনবিআর অনুমোদিত ওয়্যারহাউজ বা গুদামে (রপ্তানিকারকের) রেখে পণ্য তৈরি করতে হবে। তবে তা বাইরে বিক্রি করা যাবে না। বিক্রি করতে হলে নির্ধারিত হারে শুল্ককর পরিশোধ করতে হবে। জানা গেছে, গার্মেন্টসের এ ধরনের কাঁচামালের শুল্ককর সবমিলিয়ে ৪০ শতাংশ থেকে ১০৬ শতাংশ পর্যন্ত। কিছু ক্ষেত্রে আরো বেশি শুল্ককরও রয়েছে। এসব কাঁচামাল বাইরে চোরাই পথে বিক্রি করলে শুল্ক পরিশোধ করে আনা স্থানীয় উত্পাদনকারী কিংবা বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন ইত্তেফাককে বলেন, মিথ্যা ঘোষণা ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের কারণে স্থানীয় বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় মিলগুলোর কাজ কমছে। গড়ে সক্ষমতার অর্ধেকই ব্যবহার হচ্ছে না। এ অনিয়ম বন্ধ না হলে স্থানীয় বস্ত্র শিল্প টিকে থাকতে পারবে না। ফেব্রিকের অপব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমানে যতগুলো কারখানা চালু আছে, বন্ড লাইসেন্স তার চাইতে দ্বিগুণ। এক শ্রেণির লোকজন এসব বন্ড লাইসেন্স কেনে এবং কাপড় আমদানি করে। আমদানিকৃত কাপড় বন্দর থেকে খালাস করে বন্ডারের বদলে তার গুদামে চলে যায়।
