দ্রুত কমছে তাপ, পক্ষকাল পরেই বড় শৈত্যপ্রবাহ

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২৪, ০২:০২

ঋতুচক্রের নিয়ম মেনেই বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি। ক্রমেই আসছে পাতাঝরার দিন। প্রতিদিন নামছে তাপমাত্রা। সাঁঝ-প্রভাতে এখন দেশের প্রায় সর্বত্রই শীতের আমেজ। আটপৌরে হয়ে আসছে দিন। দিঘল হচ্ছে রাতের প্রহর। সূর্যের তেজ ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে। শেষ রাতে কাঁথা-কম্বলে ওম-উষ্ণতা নিতে হচ্ছে। আসতে শুরু করেছে অতিথি পাখিরা। পঞ্চগড়-দিনাজপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে চলছে ঘন কুয়াশা আর শীতের দাপট। মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে প্রকৃতি। গতকাল তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা নেমেছে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। রাজধানী ঢাকায় ১৮ ডিগ্রি। ইতিমধ্যে সাগরে একটি লঘুচাপ তৈরি হচ্ছে। এ সপ্তাহে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির আশঙ্কা করা যাচ্ছে। ২৮ নভেম্বরের দিকে যা ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্য এবং শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বদিকে আঘাত করতে পারে। এই ঘূর্ণিঝড়ের দূরবর্তী প্রভাবে ২৮ ও ২৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের জেলাগুলোর ওপর হালকা থেকে মাঝারি মানের বারিপাতের সমূহ সম্ভাবনার রয়েছে। 

আবহাওয়া বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় প্রভাবিত বর্ষাক্ষান্ত প্রকৃতিতে অস্বাভাবিক মাত্রায় তাপমাত্রার পারদ পতন ঘটতে পারে। দশপ্রহরণ মেলতে পারে তীব্র শীত, যা ক্রমবর্ধমান হয়ে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আসছে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উপসর্গে এ বছর শীতের তীব্রতা প্রবল রূপ পরিগ্রহ করতে পারে। আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানান, ভৌগোলিক কারণে মধ্য নভেম্বর থেকেই শীতের অনুভূতি শুরু হয়ে গেছে। ঘন হতে শুরু করেছে কুয়াশার চাদর। শীতের আমেজ বাড়ছে। এক্ষণে দিন ও রাতের তাপমাত্রা কিছুটা কমতে থাকবে। 

সাধারণত নভেম্বর মাসে শৈত্যপ্রবাহের নজির নেই। তবে তাপমাত্রা ইতিমধ্যে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। সাধারণত তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এলে শীত অনুভূত হয়। এটি ক্রমান্বয়ে কমতে থাকলে শীত অনুভূত হবে—এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে ঢাকার তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রির ঘরে। আগামী সপ্তাহে এটি আরো কমবে। এ বছর শীত বেশি পড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যদি ৮.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তখন তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। আর যদি তাপমাত্রা ৬.১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, তবে তা হয় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হয় তখনই, যখন তাপমাত্রা থাকে ৪.১ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। আর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে হয় অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ।

আবহাওয়াবিদদের মতে, যখন উত্তরা বাতাস বয়ে যায়, বাতাসে জলীয় বাষ্প কমে আসে, তখনই শীতের তীব্রতা বেশি হয়। এজন্য শীতকালে বাতাসে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি কেমন, সেটি দেখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর প্রভাবে শীত বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। আর দেশে জানুয়ারিকেই সবচেয়ে শীতল মাস বলা হয়ে থাকে। 

আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি তিন মাসের (নভেম্বর-ডিসেম্বর-জানুয়ারি) পূর্বাভাসে এবারের শীত মৌসুমে দেশে ৮ থেকে ১০টি মৃদু (তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) থেকে মাঝারি (৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে জানানো হয়েছে। তবে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে দু-তিনটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ (৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বয়ে যেতে পারে। এবার তীব্র শীতের আগে দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। এ সময় বঙ্গোপসাগরে দুই থেকে পাঁচটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে দু-একটি নিম্নচাপও ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এ সময় দিন ও রাতের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে কমতে পারে। তবে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিক অপেক্ষা কিছুটা বেশি থাকতে পারে।

আবহাওয়া দপ্তরের আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন বলেন, এখন পঞ্চগড়ে শীত প্রকট আকার নিচ্ছে। হিমালয়ের শীতল বাতাসের তীব্রতা বাড়লে রাজধানীতেও শীতের প্রভাব বাড়বে। মূলত, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল—যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরায় কনকনে ঠান্ডা পড়ে। আবার কুমিল্লা, কক্সবাজার, চট্টগ্রামের মানুষ সেই ঠান্ডার অনুভূতি কম পায়। এর কারণ উত্তরা বাতাসের গতিপ্রকৃতি, হিমালয়ের হিমবাহ অন্যতম। ভৌগোলিক কারণে আমাদের দেশে সব জায়গায় তাপমাত্রা একই রকম থাকে না।

কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ আবহাওয়ার বিভিন্ন মডেল বিশ্লেষণ করে জানান, আজ শনিবার সকালে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার জনপদগুলো কুয়াশা আবৃত হতে পারে। চলতি নভেম্বর মাসে দেশের কোনো বিভাগের ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ অতিক্রমের কোনো আশঙ্কা করা যাচ্ছে না। এদিকে আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত কারণে মানুষ ভুগছেন জ্বর-ঠান্ডায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা ঝুঁকিতে। তাদের সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছেন ডাক্তাররা।

এদিকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। শেষ রাত থেকে ভোর পর্যন্ত দেশের উত্তরাঞ্চলের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা এবং অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সারা দেশে রাত ও দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমবে।

ফুলবাড়ীতে বাড়ছে শীতের তীব্রতা, কুয়াশায় ঢেকে থাকছে চারপাশ

ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। মধ্যরাত থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে শুরু করে। সকাল ৯-১০টা পর্যন্ত কুয়াশায় ঢেকে থাকে চারপাশ। এ সময় হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করে যানবাহন। এমন অবস্থায় ভোগান্তি বেড়েছে অটোরিকশাচালক ও খেটে খাওয়া মানুষের। সকালে দেখা গেছে, ঘন কুয়াশার কারণে যানবাহন দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। কুয়াশার সঙ্গে শীতের তীব্রতা বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ। ঘন কুয়াশা ও শীতের তীব্রতা বাড়ায় সময়মতো কাজে যেতে পারছেন না অনেকে। এতে বয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ। কুড়িগ্রামের রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, গত এক সপ্তাহ থেকে এ অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৭-২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ওঠানামা করছে। তবে নভেম্বরের শেষে অথবা ডিসেম্বরের শুরুতে ঠান্ডার তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইত্তেফাক/এনএন