রম্য লেখক-কার্টুনিস্ট ও উন্মাদ সম্পাদক আহসান হাবীব সম্প্রতি আমেরিকা ঘুরে এসেছেন। প্রায় দুই মাসের সফর ছিল। অনেক ঘোরাঘুরি করেছেন, অনেক কিছু দেখেছেন তিনি। বেশ মজার ছিল সময়টা। তার অভিজ্ঞার ঝুলি থেকে ঠাট্টার পাঠকদের জন্য কিছু মজার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন এখানে
ঘড়ি বিভ্রাট
আমেরিকা গিয়ে সবচেয়ে প্রথম যে সমস্যাটায় পড়েছিলাম, সেটা হলো সময়ের ধাঁধা। ওখানে রাত সাড়ে নয়টায় সন্ধ্যা হয়। তখন ছিল রোজার মাস। রোজা রেখে ইফতার করতে খবর হয়ে যাওয়া অবস্থা। এর মধ্যে হাতঘড়ি গেল বিকল হয়ে। বুদ্ধি করে ঢাকা থেকে দুটো হাতঘড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে অবাক করে দুটোই একসঙ্গে বিকল হলো। এ অবস্থায় যখন কিনব কিনব করছি, তখন আবার দেখি একটা ঠিক হয়ে গেছে। তারপর অবশ্য আর আমেরিকা থেকে কিনতে হয়নি।
এক ঘণ্টায়
ডালাস ভ্রমণ
আমি টেক্সাসে এসেছি শুনে হোসেন তৌহিদ জুয়েল বলল, ‘চলেন আপনাকে ডালাস শহর পুরোটা ঘুরিয়ে দেখাব।’ বললাম, ‘দেখার তো ইচ্ছে ছিল কিন্তু হাতে তো সময় নেই।’ জুয়েল বলল, ‘এক ঘণ্টা সময় দিতে পারবেন তো, তাহলেই হবে।’ জুয়েলের কেরামতি দেখতে ওর বিএমডাব্লিউ গাড়িতে চড়ে বের হয়ে পড়লাম। ও মুহূর্তে নিয়ে এল বিশাল একটা টাওয়ারের নিচে। ৫০ তলা উঁচু, ইউনিয়ন টাওয়ার। যার ওপরে এসে টাওয়ারের চারদিকে হাঁটলেই পুরো ডালাস দেখা হয়ে যায়। আমরাও তাই করলাম, একটা চক্কর দিলাম। আসলেই পুরো ডালাস এক নজর দেখা হয়ে গেল। জুয়েল কথা রেখেছে। আমাকে পুরো ডালাস দেখিয়ে দিল দশ মিনিটে!
প্লেন ভীতি প্লেন প্রীতি
আমার আগে থেকেই প্লেন ভীতিটা ছিল। এবার আমেরিকা ট্যুরে ১১ বার ঘুরে সেই ভয়টা কেটে গেছে। তবে এর মধ্যেও বিপদে পড়েছিলাম একবার।
ঝড়ের জন্য আমাদের ফ্লাইট গেল ক্যানসেলড হয়ে। ফ্লাইট ছিল বিকাল ৩টায়। ঠিক হলো সেটা ছাড়বে রাত সাড়ে ৮টায় অথবা পরদিন সকাল ১০টায়।
মূল এয়ারপোর্টের ভেতর ঢুকে আমরা হতভম্ব! শত শত মানুষ গিজ গিজ করছে! সিটে বসার জায়গা নেই। কার্পেট পাতা মেঝেতে কেউ শুয়ে আছে কেউ বসে আছে, সে এক ভয়াবহ অবস্থা! আমাদের বারোটা বাজিয়ে শেষ পর্যন্ত ঘোষণা এল বারোটায় প্লেন ছাড়বে। বোর্ডিং কার্ড দেখিয়ে সবাই উঠে গেলেও আমরা তিনজন আর দুজন বৃদ্ধ আমেরিকান মহিলা আটকে গেলাম। বিষয় অতীব করুণ, আমাদের সিট নেই। কারণ রাত ৮টার টিকিট আমাদের দেওয়া হয়েছিল স্ট্যান্ড বাই হিসেবে। এখন কেউ যদি না যায় তবে তার জায়গায় আমরা উঠতে পারব নইলে কাল সকাল দশটায়। দেশে হলে হাউ কাউ লাগিয়ে দিতাম হয়তো। এখানে সেটা করা যাচ্ছে না বলে দাঁত কিড়মিড় করে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু না, অবশেষে আমরা ৫ জন উঠতে পারলাম। প্লেন ছাড়ল, ঈশ্বর মনে হয় তখন আবার মুচকি হাসলেন।
প্লেনে না যেন হামানদিস্তায় উঠেছি। আবহাওয়া খারাপ ফলে প্রবল টারবুলেন্স। মোটামোটি ডিব্বার ভেতর ঝাল মুড়ির মতো ঝাঁকুনি খেতে খেতে যাচ্ছিলাম। কতক্ষণ যে ঐভাবে ছিলাম, কে জানে? ল্যান্ড করার সময় দেখা গেল প্লেন ল্যান্ড করতে পারছে না প্রচণ্ড ঝড়ের কারণে। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল বাইরে ঘন ঘন বিদ্যুত্ চমকাচ্ছে! অবশেষে পাইলট ঘোষণা দিল এখানে সম্ভব না, আমরা অন্য এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করতে যাচ্ছি। রাত আড়াইটায় প্লেন মাটি স্পর্শ করল নর্থ ক্যারোলিনার এক অচেনা এয়ারপোর্টে—শার্লট ডগলাস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট!
দেখা গেল, এই এয়ারপোর্টে আমরা প্রায় দু শর মতো যাত্রী ছাড়া আর কেউ নেই। দোকানপাট সব বন্ধ। নিঃশব্দ এয়ারপোর্ট। ঘণ্টা খানেক পর একজন এল এবং ঘোষণা দিল আমাদেরকে কাল সকাল ৯টায় আরেকটা প্লেনে করে সাউথ ক্যারোলিনার গ্রিনভিল এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেবে। আমাদের চিন্তার নাকি কোনো কারণ নেই।
কিন্তু চিন্তার যথেষ্টই কারণ ছিল। এমনেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডা তার ওপর সবাই ক্ষুধার্ত! তারচেয়েও আশঙ্কার কথা, প্যাসেঞ্জারদের বেশির ভাগই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এয়ারপোর্টে কিছু কম্বল দেওয়া হলো বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের। তবে আমরা ভাগে পেলাম না (ভেতরে ভেতরে খুশিও হলাম, আমাকে তরুণ মনে করে দেয়নি বোধহয়)।
দুঃসহ রাত পাড়ি দিয়ে একসময় এয়ারপোর্টের ঘুম ভাঙল। এয়ারপোর্ট জাগলে হবে কী, প্লেন জেগে ওঠার কোনো খবর নেই। ওদিকে ৯টা বাজল, প্লেনের খবর নেই। ১০টা বাজল, বলা হলো প্লেন আছে, পাইলট নেই। ১১টা বাজল, এবার বলা হলো, দুজন পাইলট চলে এসেছে কিন্তু কে চালাবে এখনো সেটা ঠিক হয়নি।
অবশেষে সাড়ে ১১টায় আমরা প্লেনে উঠলাম। মাত্র বিশ মিনিটে পৌঁছে গেলাম সাউথ ক্যারোলিনার গ্রিনভিল এয়ারপোর্টে। মনে মনে ভাবলাম মাত্র বিশ মিনিটের জন্য এত কাহিনি। আগে জানলে তো হেঁটেই রওনা দেওয়া যেত!
আরেক মজার অভিজ্ঞতা
একবার এক এয়ারপোর্টে চেকিং চলছে। আমাকে যিনি চেকিংটা করছিলেন উনি খুবই কড়া চেকিং চালালেন আমার ওপর দিয়ে। চেহারা দেখে ভেবেছিলাম উনি বুঝি ইন্ডিয়ান। কড়া চেকিংয়ের পর যখন বের হয়ে আসছিলাম, তখন লোকটা এক গাল হাসি উপহার দিয়ে খাঁটি বাংলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘স্যার, উন্মাদ কি এখনো বের হয়?’
অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি বাংলাদেশি? আমাকে চেনেন? তাহলে এত চেক করলেন কেন আপনারা?’ লোকটা বিব্রত হয়ে বলল, ‘আসলে আমাদের কিছু করার ছিল না। রেনডম চেকিংয়ে আপনি আটকে গিয়েছিলেন।’
এবং একটি ফ্রি টিপস
পাঠক, পাঠিকা, লেখক, লেখিকা, কার্টুনিস্ট, ক্রিয়েটিভ সবাইকে বলব একবারের জন্য হলেও দেশের বাইরে যাওয়া উচিত। অনেকেই ভাবে বাইরে গেলে বড় খরচের ব্যাপার আছে। আসলে তা না। টাকা-পয়সার চেয়েও জরুরি ব্যাপার হলো প্ল্যানিং। প্ল্যানিং করে গেলে খরচটা অনেকটা কমে তো আসেই, অনেক ঘোরাও যায়। বাইরে গেলে যেটা হয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলায়। বাইরে কোথায় কী হচ্ছে, আমরা কী দেখছি, আমাদের সঙ্গে তাদের পার্থক্যটা কী—এসব শেখা যায়।
অনুলিখন সত্যজিত্ বিশ্বাস
