সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর
নিরানব্বই নাম্বার রিকশাটাও না করে দিল। সোজাসাপ্টা জবাব তার— যামু না।
হিরু চায় না এই ‘যামু না’র সংখ্যাটা কোনোক্রমেই সেঞ্চুরির দেখা পাক। দুরুদুরু বুকে আরো একটি রিকশার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ও। ‘যামু’ শোনার আশায় এতক্ষণ ধরে করে আসা প্রশ্নখানাই শুকনো গলায় করল আবার, ‘রিকশাওয়ালা ভাই, যাবেন?’
কোনো জবাব এল না। ‘কালা নাকি?’ নিজ মনে প্রশ্নটা করে আবারও জানতে চাইল হিরু, ‘যাবেন?’
এবারও একই চিত্রনাট্য। কোনো জবাব নেই। বরং মনে হলো মহামান্য বিরক্ত হয়েছেন। চরম বিরক্ত! ‘যামু না’ বলার জন্য বুঝি তাকে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট রাখতে হবে!
এর আগে দু-একজন ‘কোথায় যাবেন?’ জানতে চেয়েছিল। হিরু গন্তব্য বলার পরে আর কোনো কথা বলেনি। যাবে কি যাবে না—সেটা পর্যন্তও না।
সেঞ্চুরি করার পরে ব্যাটসম্যানরা বুনো উল্লাস করে। একজন খেলোয়াড়ের কাছে সেঞ্চুরি তো পরম আরাধ্য। কিন্তু আজ হিরুর দশা হলো আফগান বোলার রশিদ খানের ন্যায়। ওদিকে সেঞ্চুরি হয়ে গেছে। উদযাপনও করতে ইচ্ছে করছে। আবার করাও যাচ্ছে না। হঠাত্ হিরুর হতাশায় ভরা মনে আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। আরেকটা রিকশা আসতে দেখে হিরু যথাসম্ভব মুখটা হাসি হাসি করে তার পথ আগলে দাঁড়াল। ‘মামা, যাবা?’
‘কই যাবা, ভাগিনা?’
‘ভাগিনা’ সম্বোধন শুনে হিরু আবেগে আপ্লুত হয়ে গেল। এই ইট-পাথরের নগরীতে কেউ একজন ওকে ভাগিনা সম্বোধন করেছে, হিরুর অবস্থা ‘আবেগে কাইন্দালাইচি’ টাইপ না হলে আর কী হবে! টুপ করে রিকশায় চেপে বসল ও। খেয়াল করল না—এই রিকশাওয়ালা মহাশয়ও ওর গন্তব্য শুনে কিছু বলেনি।
হিরুকে রিকশায় উঠতে দেখে বেচারা হইহই করে উঠল। বয়সে হিরুর কাছাকাছি বয়সী লোকটা হিরুকে বলল, ‘আরে ভাগিনা, আমি তো ওদিকে যামু না।’
‘কিন্তু তুমি তো সেটা বলোনি।’
‘আমি বলেছি। তুমি শোনোনি।’
হিরু টাসকি খেয়ে মনে মনে বলল, ‘মনে মনে বললে শুনব কী করে!’
‘কিছু বললে?’
‘না, কিছু বলিনি।’ হিরু মুচকি করে হাসার চেষ্টা করল।
রিকশাওয়ালা ছেলেটা বলল, ‘তোমার গন্তব্যের দিকে যাব না। অন্য রিকশা দেখো।’
হিরু বলল, ‘আমি গন্তব্য পরিবর্তন করেছি। আরেক জায়গায় যাব। চলো।’
‘এরই মধ্যে গন্তব্য পরিবর্তন! বেশ। কোথায় সেটা?’
হিরু কিছু না বলে মুখটা একটু নাড়াচাড়া করল।
‘ভাগিনা কোথায় যাবে বললে না তো!’
‘বলেছি তো মামু, তুমি শুনতে পাওনি?’
হিরুর এই কথায় ছেলেটা চমকে গেল। সে ভেবে পেল না—আসলেই কি যাত্রী তাকে গন্তব্যের কথা বলেছে! দ্বিতীয়বার তাই জানতে চাইল সে, ‘আরেকবার বলো না ভাগিনা।’
হিরু স্মিত হেসে বলল, ‘তোমাকে গন্তব্য বলে কী লাভ! তুমি তো সেদিকে যাবা না। এমনকি ‘যামু না’ কথাটাও মুখ ফুটে না বলে চুপচাপ বসে থাকবা!’
‘তাইলে?’ রিকশাওয়ালা হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘গন্তব্য না বললে কই যামু?’
‘তোমার যেদিকে যেতে মন চায় সেদিকেই যাও।’
রিকশাচালক গাড়ি চালাতে শুরু করে দিয়েছে। হিরুও টুকটাক কথা বলে তার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে সে চালকের নাম জেনে নিয়েছে—জামাল। অধিকাংশ যাত্রীই রিকশায় উঠলে চালকের সঙ্গে কথা বলে না। যারা বলে তারা ‘দেশের বাড়ি কোথায়?’ ‘রিকশা কোন গ্যারেজের’ এই টাইপ কথা বলে। রিকশাওয়ালার নাম খুব কম লোকই জিজ্ঞেস করে। হিরু সেই খুব কম লোকদের একজন। ওর এই আচরণে জামাল বেশ অবাক হয়েছে। কিন্তু তারচেয়েও বেশি অবাক সে নিজের নাম বলা নিয়ে মিথ্যে বলার কারণে! হিরু যখন তার নাম জানতে চায়, তখন সে ভীষণভাবে চমকে ওঠে। মনের অবচেতন অংশই তাকে মিথ্যে বলতে প্ররোচিত করেছে। কামালের বদলে জামাল বলে তার কী এমন লাভ হলো ভেবে পাচ্ছে না সে।
রিকশায় বসে হিরু গলা ছেড়ে গাইতে লাগল, ‘চলে আমার রিকশা হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া...’
জামাল হঠাত্ বলে উঠল, ‘ভাগিনা, রিকশাখানা তো আমার। তুমার না।’
হিরুর গানে ছেদ পড়ল।
একটু এগোতেই রাস্তায় হিরুর এক পরিচিত মেয়ের সঙ্গে দেখা হলো। বালিকা হাসিমুখে হিরুকে রিকশা থামাতে ইশারা করল। হিরু রিকশাওয়ালাকে ইশারা করার আগেই যেন রিমোট কন্ট্রোল মেশিনের ন্যায় রিকশাটা থেমে গেল।
‘হিরু ভাই, লিফট প্লিজ!’
বালিকা লিফট চায় শুনে হিরু ভড়কে গেল। রিকশাওয়ালাদের যে মর্জি! একজনের জায়গায় দুজন উঠলে তারা মেনে নিতে পারে না। তাছাড়া, হিরুর মনে শঙ্কা জাগল—এতক্ষণ ধরে রিকশাটা যেভাবে পিঁপড়ের গতিতে চলছিল, যাত্রী একজন বেড়ে যাওয়ায় না জানি রিকশার চলনই থেমে যায়। কিন্তু হিরুকে অবাক করে দিয়ে রিকশা এবার পঙ্খিরাজের ন্যায় ছুটতে লাগল...
কিছুদূর এগোনোর পরে হিরু দেখল, তার এক পরিচিত ছোটভাই মোটর সাইকেল চালিয়ে তাদের ক্রস করে চলে যাচ্ছে। ‘এই কামরুল...’ হিরু তাকে ডাক দিতে গিয়েও দিল না। ‘না জানি বেচারার কত ব্যস্ততা...’
এরপর কাঁটায় কাঁটায় দুই মিনিট কেটে গেছে। এবার হিরুকে অবাক করে দিয়ে সেই ছোটভাই কামরুল হন্তদন্ত হয়ে উল্টোপথে গাড়ি ঘুরিয়ে ছুটে আসতে লাগল! হিরুকে দেখে গাড়িটা থামাল। ‘হিরু ভাই, সামনে রাক্ষস! যেও না।’
হিরু অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘সামনে কী?’
কামরুল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘ভাই সামনে যেও না। বাস-মোটরসাইকেল-রিকশা কোনোটাকেই ছাড় দিচ্ছে না। সবার কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে। দেদারসে মামলাও দিচ্ছে।’ এই বলে কামরুল ওদের উল্টোপথে চলে গেল। হিরুও চিন্তায় পড়ে গেল, ‘রিকশা নিয়ে ওদিকটাতে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? ওটা যে ভিআইপি রাস্তা, রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ...। মামলা খেলে কালো দাগ লেগে যাবে যে!’
যেন ওর মনের কথা পড়তে পেরেই রিকশাচালক জামাল বলল, ‘ভাগিনা, কোনো টেনশন করিয়ো না। দশ টাকার মামলা!’
‘দশ টাকার মামলা মানে?’ হিরু বুঝতে পারল না ব্যাপারটা। দশ টাকায় আবার কিসের মামলা!
জামাল পকেট থেকে দশ টাকার একখানা নোট বের করে সহাস্যে বলল, ‘এটা হাতে গুঁজে দিলেই হবে। কোনো মামলা-টামলা নাই!’
হিরু অবাক। দশ টাকার কারণে কামরুল এভাবে ভাগল! অথচ, প্রথমবার তাকে দেখে ওর মনে হলো—না জানি কত তাড়া আছে! প্রথমে যেভাবে ছুটছিল...
হিরু দুরুদুরু বুক নিয়ে রিকশায় বসে আছে। রিকশাচালক জামাল সিনা টাইট করে ‘চলে আমার রিকশা হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া...’ গানটি গাইতে গাইতে সমানে প্যাডেল চাপছিল।
কিন্তু সামনের সেই ‘রাক্ষস’ ওদের রিকশাকে যেন দেখেও দেখল না। এমনকি জামাল তার দশ টাকায় ভর্তি মুঠোখানা এগিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে কোনো ভাবোদয় হলো না! হাতটা ছুঁয়েও দেখল না সে।
‘তাহলে কি আমাকে দেখেই বেচারা ভড়কে গেছে!’ নিজের অজান্তেই এবার হিরুর সিনা টাইট হয়ে গেল।
একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে জামাল পেছনে ফিরে বিগলিত হাসি হেসে বলল, ‘আইজ ম্যাডাম আছিলেন বইলা বাঁইচা গ্যাছি!’
‘মানে!’ হিরু প্রায় চিত্কার দিয়ে উঠল। ‘মেয়ে দেখে ছেড়ে দিল!’
একটু পরে বালিকা নেমে যেতে হিরু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। জামালকে জিজ্ঞেস করল, ‘সত্যিই কি তাই? ওর কারণে আমাদের ছেড়ে দিয়েছে!’
‘আরে না ভাগিনা। তখন পাশেই এক সাংবাদিক আছিল। তারে দেইখ্যাই তো...’
‘তাহলে ওর সামনে যে বললে...?’
জামাল মুচকি হেসে বলল, ‘ওই... একটু ভাব নিতে হয় না, ভাগিনা!’
হিরু মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘ও নেমে যাবার পরেই তোমার রিকশায় আবার সেই শামুকের গতি। এতক্ষণ ধরে রিকশা নিয়ে উড়াল দেবার পেছনেও কি ‘ও’ ছিল?’
‘এই তো ভাগিনা, বুঝবার পারছ।’
হিরু ইতস্তত বলল, ‘কিন্তু আমি তো জানি পেছনে একলা বালিকা থাকলে তোমাদের রিকশা গতি পায়। আজ তো মেয়ের সাথে একটা ছেলে, আইমিন আমিও মজুদ ছিলাম।’
জামাল লাজুক বদনে বলল, ‘ইয়ে... উনি তো সম্পর্কে তোমার বইন লাগে!’
‘তুমি কিভাবে জানলে?’
‘তখন আফনেরে ‘হিরো ভাই’ বইল্যা ডাকছিল না? আইচ্ছা ভাইজান, আফনার আসল নাম কী? আফনে কয়ডা মুভি করছেন? ছাকিব খানের ছবি দেখতে দেখতে চক্ষু পইচ্যা গ্যাছে। অহন থাইকা আফনার বই দেখুম।’
‘তুমি হঠাত্ ভাগিনা ছেড়ে ভাইজান ডাকা শুরু করলে যে?’ হিরু কথা ঘোরাতে চাইল।
‘হেঃ হেঃ’, জামাল লাজুক হেসে শেষে বলল, ‘আফারে আফা ডাকলুম। হ্যায় আপনারে ভাই ডাকল, তাইলে আপনে তো আমারও ভাই লাগেন, নাকি?’
হিরু কিছু না বলে চুপ করে রইল। আসলে কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না ও।
জামাল জামার কলার ঠিক করতে করতে বলল, ‘আমারে একটা চান্স দিয়েন।’
‘কোথায়?’
‘কোথায় আবার, সিনেমায়।’
‘কী পার্ট চাও?’
‘নায়ক তো আপনেই হইবেন। অইডা তো ছাড়বেন না। তাইলে আমারে সাইড নায়কের পার্টটাই দিয়েন। দর্শকরে পাশে পাওন যাইব।’
‘আচ্ছা, দেব জামাল। এখন বলো তো—বাস্তব জীবনে এই সাইড নায়কগিরির কোনো অভিজ্ঞতা আছে তোমার?’
‘কী যে বলেন না ভাইজান! সাইড নায়ক না, এক্কেবারে নায়ক হবারই বহুত অভিজ্ঞতা আছে। একবার কী হইছে জানেন—এক গুণ্ডায় মোটর সাইকেলে থাইক্যা আমার রিকশায় বসা এক আপার ব্যাগ টান দিয়া নিয়া গ্যালো। আপায় তো হু হু কইর্যা কান্দাকাটি শুরু কইরা দিল। আমি তহন দিলাম রিকশার গতি বাড়াইয়া। জোরে জোরে প্যাডেল চাইপা ঠিকই গিয়া বাইকআলারে পাকড়াও করলুম। আরেকবার কী হয়েছিল জানেন...’
‘থাক আর বলা লাগবে না। আমরা গন্তব্যে চলে এসেছি।’
জামাল দেখল—হিরু একটা শপিং মলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই মলের কথা হিরু জামালকে একেবারে শুরুতেই বলেছিল। তখন সে না করে দিয়েছে। কিন্তু হিরু তাকে ঘুরপথে ঠিকই এখানে নিয়ে এসেছে!
হিরু ভাড়া মিটিয়ে সামনে পা বাড়াতেই জামাল বলে উঠল, ‘বস, আপনে কিন্তু কথা দিছেন আমারে সিনেমায় পার্ট দিবেন...।’ ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা আর কী!
হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘আমি জামালকে চান্স দেবার কথা বলেছি, কিন্তু তোমার নাম তো জামাল নয়!’
জামাল থুড়ি কামাল থ মেরে রইল। জামাল যে ওর আসল নাম হয়, হিরু এটাও জানে! কিন্তু, কিভাবে?
একটু আগে রিকশা জ্যামে থেমেছিল। তখন এক পরিচিত রিকশা চালকের সঙ্গে কামালের দেখা হয়। বোধহয় একই গ্যারেজের রিকশা ওদের। কিংবা দুজনার বাড়ি একই এলাকায়। সেই রিকশাচালক তখন ওকে কামাল বলে সম্বোধন করে। ব্যাপারটা আর হিরু কামালকে খুলে বলল না। গন্তব্যে আসতে পেরে খুশি মনে মলের ভেতরে ঢুকে পড়ল ও। g
