চট্টগ্রামে আইনজীবী হত্যা

হত্যায় অংশ নেয় ২৫-৩০ জন, মৃত্যুর পরও লাশের ওপর নির্মমতা চালায় খুনিরা

পুলিশের ভূমিকায় ক্ষোভ আইনজীবীদের

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:০০

চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যায় ২৫ থেকে ৩০ জন অংশ নিয়েছিল। এদের অধিকাংশকেই শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশ। পুলিশের তদন্ত সূত্রে এমনটাই জানা গেছে। সূত্র বলছে, সাইফুলকে কোপানোয় অংশ নেন চার জন। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ ইতিমধ্যে আট জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এছাড়া পুলিশের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের হওয়া তিন মামলায় গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল নগরীর বাকলিয়া এলাকা থেকে বাবলা ধর ও সজল শীল নামে দুই জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জড়িত আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রাম আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সনাতনী সম্প্রদায়ের নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর জামিন নামঞ্জুর হয়। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর জন্য প্রিজন ভ্যানে তোলা হলে তার অনুসারীরা প্রিজন ভ্যান আটকে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে পুলিশ, বিজিবি লাঠিপেটা করে ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপরই শুরু হয় সংঘর্ষ। এ সময় আইনজীবীদের গাড়ি ভাঙচুর, ইটপাটকেল নিক্ষেপের প্রতিবাদে মিছিল বের করেন কিছু আইনজীবী। প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবীরা জানান, মিছিল শেষে ফেরার পথে হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে যান সাইফুল। তখন তাকে চট্টগ্রাম আদালত ভবনের অদূরে কোতোয়ালি থানাসংলগ্ন সেবক কলোনির একটি বাসার সামনের রাস্তায় কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

এক আইনজীবী বলেন, ‘সাইফুলসহ কিছু আইনজীবী প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে কোতোয়ালির বান্ডেল রোডে যান। ঐ সময় সশস্ত্র লোকজন ধাওয়া দিলে হাঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে যান সাইফুল। অন্যরা দৌড়ে প্রাণে বেঁচে যান। এ সময় কিরিচ দিয়ে তাকে কোপাতে থাকে চন্দন দাস নামে এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। পুলিশ জানায়, চন্দন দাসসহ ২৫ থেকে ৩০ জন হত্যায় অংশ নেন। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ৫২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজের সূত্র ধরে পুলিশ বলছে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে সাইফুলকে কোপান ওম দাশ, চন্দন ও রনব। সাইফুলের নিথর দেহ রাস্তায় পড়ে থাকলেও লাঠিসোঁটা দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকেন সেখানে থাকা আরো ২৫-৩০ জন। তাদের মধ্যে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে রমিত দাস, সুমিত দাস, গগন দাস, নয়ন দাস, বিশাল দাস, আমান দাস, মনু মেথর ও রাজীব ভট্টাচার্যকে মঙ্গলবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বেশির ভাগই পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এছাড়া শুভ দাস নামে একজন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থীও ছিলেন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় দাস ব্রহ্মচারীর জামিন নামঞ্জুরকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চিন্ময়কে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় কেন তার প্রিজন ভ্যান তিন ঘণ্টা আদালত এলাকায় অবস্থান করছিল, চিন্ময়ের হাতে হ্যান্ডমাইক কীভাবে গেল, এসব বিষয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নানা বিতর্কের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের দক্ষিণ জোনের দুই কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। এরা হলেন, দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার লিয়াকত আলী খান এবং কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফজলুল কাদের চৌধুরী। ঘটনার দিন রাতেই লিয়াকত আলী খানকে সিএমপির পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স একটি প্রতিবেদনে তাকে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত মন্তব্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তবে সিএমপির এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, লিয়াকতের সঙ্গে কথা না বলেই রয়টার্স প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিল। সিএমপির বিবৃতির পর সংবাদ থেকে লিয়াকতের মন্তব্য সরিয়ে নেয় রয়টার্স। অন্যদিকে, ফজলুল কাদের চৌধুরীকে নগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের বন্দর জোনে বদলি করা হয়েছে। কোতোয়ালি থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন নগর পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মো. আব্দুল করিম।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে ঘিরে আদালত প্রাঙ্গণের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নাজিম উদ্দিন চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার আদালত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি বলেন, ‘পুলিশের প্ররোচনায় সেদিন হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে সব কর্মকাণ্ড আদালত ভবনে সংঘটিত হয়েছে। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে যখন কারাগারে নেওয়ার জন্য প্রিজন ভ্যানে তোলা হলো, তখন পুলিশ কেন নিষ্ক্রিয় ছিল। কাদের ইন্ধনে চিন্ময় কৃষ্ণকে তিন ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। তাকে হ্যান্ডমাইক দেওয়া হয়েছিল কেন। প্রিজন ভ্যান থেকে তিনি কীভাবে বক্তৃতা দিলেন। এসব বিষয়ে তদন্ত করার জন্য পুলিশ কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’ তিনি কারাগারে চিন্ময় দাসকে দেওয়া ডিভিশন প্রত্যাহারের দাবিও জানান। অন্যথায় কারাগার ঘেরাও করার হুমকি দেন। পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (জনসংযোগ) কাজী তারেক আজিজ বলেন, ‘পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারি ও ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। দায়িত্ব পালনে কেউ অবহেলা করেননি।

নিহত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের স্মরণে দোয়া মাহফিল আয়োজন করে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াত। গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা নগরীর দেওয়ান বাজার এলাকায় দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দোয়া মাহফিলে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ প্রধান অতিথি ছিলেন। তিনি অবিলম্বে সাইফুলের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এছাড়া ইসকন নিষিদ্ধের দাবি ও অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম আলিফের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে গতকাল বাদ জুমা নগরীর দামপাড়া জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের সামনে সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম।

ইত্তেফাক/এনএন