বিশ্ব ঐতিহ্যে নতুন নাম

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৯, ১৭:৫১

আহসান জোবায়ের

 

প্রতিবছর বিশ্বের প্রাকৃতিক নিদর্শন ও নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে তার গুরুত্বের জন্য বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির অনুমোদনক্রমে প্রতিবছরই নতুন নতুন ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত হয়। আবার যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হলে ঘোষিত ঐতিহ্যস্থল তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি বিশ্বের ২১টি দেশের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত। কমিটি ৪ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। এ কমিটি পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যস্থলগুলোর ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি করে।

বিশ্ব মানবতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত স্থান বা স্থাপনাকে এই মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। ঘোষণার পর ওই স্থানগুলোকে আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীনে সুরক্ষা দেওয়া হয়। নতুন যে স্থানগুলো এই মর্যাদা পেতে পারে তা নির্ধারণের জন্য জাতিসংঘের বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি সম্প্রতি আজারবাইজানের বাকুতে এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিল। নতুনভাবে স্থান পাওয়া ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকার স্থানগুলো নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন—

 

 

বাগান, মিয়ানমার

বাগানকে বলা হয় মন্দিরের শহর। কম্বোডিয়ার অ্যাঙ্কর ওয়াট শহর এবং ভারতের বেনারসকেও মন্দিরের শহর বলা হয়। তবে বাগানকে মন্দিরের শহর বলা হলেও মন্দিরগুলো মূলত বৌদ্ধধর্মের উপসনার জন্য নির্মিত। খ্রিস্টীয় নবম থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত এখানে নির্মিত হয় প্রায় ১০ হাজার মন্দির। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকতে না পারায় হারিয়ে গেছে অনেক পবিত্র স্থাপনা। তবে এখনো প্রায় ২ হাজার ২০০টির মতো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ টিকে আছে। আর আদি কাঠামো নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে ৪টি মন্দির, যার মধ্যে একটি আনন্দ মন্দির। বাগান দর্শনে গেলে আরো যেসব মন্দির ও জাদুঘর চোখে পড়বে, সেসবও পবিত্রতা, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও জ্ঞানের ধারক।

বাগান মিয়ানমারের মান্দালয় অঞ্চলের ঐতিহব্যবাহী ও প্রাচীন জনপদ। খরস্রোতা নদীর তীরে বাগানের সবুজ সমতল ভূমির অপূর্ব দৃশ্য আর ফুলের মতো থোকায় থোকায় ছড়িয়ে থাকা মন্দির-প্যাডোগার অপরূপ সৌন্দর্য সহজেই মন ছুঁয়ে যায়। পা বাড়াতে থাকলে মনে হবে ২ হাজার বছরের ইতিহাসের ওপর দিয়ে আপনি হাঁটছেন। মন্দির-প্যাগোডার পবিত্র ছায়ায় দাঁড়িয়ে বুদ্ধের মহামন্ত্র ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে। জাল-জঞ্জাল ছিঁড়ে নির্ভোল জীবনের কিছুটা মুহূর্ত হয়তো ধরা দেবে এখানে। বাগানের অসংখ্য মন্দিরের মাঝে আনন্দ মন্দিরে বুদ্ধের মূর্তির সামনে দাঁড়ালে মোহমুক্ত জীবনের ভাবনা কাজ করতে শুরু করবে, যদি কারো ভেতরে সামান্য বুদ্ধ ভক্তি থেকে থাকে।

কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, খ্রিস্টীয় নবম শতকের মাঝামাঝি গোড়াপত্তন হয় বাগান জনপদের। তখন এর নাম ছিল পাগান। আদি বার্মিজ শব্দ পাগান থেকে বিবর্তিত হয়ে আধুনিক বার্মিজ ভাষায় বাগান নাম হয়েছে। এই বাগানের ঐতিহ্যবাহী ও নন্দিত স্থাপনার মাঝে আনন্দ মন্দির একটি।

 

পিংক সিটি জয়পুর

জয়পুর শহর গড়ে তোলেন রাজা জয় সিং। তার নামানুসারে এই শহরের নাম জয়পুর করা হয়। জয়পুরের অন্যতম আকর্ষণ হলো হাওয়া মহল। বিচিত্র শিল্প নৈপূণ্যে ভরা এই প্রসাদটি পাঁচতলা বিশিষ্ট। প্রতাপ সিং ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মাণ করেন। স্যার এডুইন এনরোল্ড হাওয়া মহলের সৌন্দর্য দেখে বলেছিল, ‘আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপও এত সুন্দর মহল বানাতে পারতো না।’ শোনা যায়, হাওয়া মহলে বসেই রানিরা উত্সব দেখতেন। ভবনটির পেছনে রয়েছে ৩৬০টি জানালা আর অভ্যান্তরে রয়েছে স্নান কুণ্ড। জয়পুরে আরো দেখার মতো আছে গোবিন্দজির মন্দির, জলমহল, অম্বর প্যালেস, কালীমন্দির, জয়মণি মন্দির, দেওয়ান-ই-আজম, দেওয়ান-ই-খাস, সুখমন্দির, সিটি প্যালেস মিউজিয়াম, নাহারগড় দুর্গ প্রভৃতি। প্রাকৃতিক হ্রদের মাঝে অবস্থিত জলমহলটি সত্যি দেখার মতো। শহর থেকে ৭ কি. মি. দূরে অবস্থিত। এক সময় রাজাদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশের স্থান ছিল এটি। হ্রদটির নাম মানসাগর। এর একটু দূরেই রয়েছে মান সিং দুর্গ। সপ্তাদশ শতকে নির্মিত এই দুর্গের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য রয়েছে কয়েক মাইল দীর্ঘ চওড়া পরিখা। এই জায়গার নাম অম্বর, যা পূর্বে রাজস্থানের রাজধানী ছিল এবং জয়পুর থেকে ১১ কি. মি. দূরে অবস্থিত। মান সিং দুর্গের সিঁড়ি দিয়েই ঢুকে দেখা যাবে কালীমন্দির। অম্বর রাজপ্রাসাদের কাছেই রয়েছে একটি মসজিদ। এটির নাম অম্বর মসজিদ। সম্রাট আকবর এটি নির্মাণ করেন।

কেন্দ্রীয় জাদুঘর পুরাতন নগরীর দক্ষিণাংশে রাম নিবাস গার্ডেনে অবস্থিত। এই জাদুঘর জয়পুরের মহারাজার দুর্লভ পোর্ট্রেট, সাজ পোশাক, জয়পুরের বিভিন্ন স্থানের কাঠের কাজ এবং অন্যান্য অণুচিত্র ও শিল্পকলা স্থান পেয়েছে। এখানে বাগানে ছোট একটা চিড়িয়াখানা ও আর্ট গ্যালারি রয়েছে। অপরূপ সৌন্দর্য আর স্থাপত্যে ভরা শহরটির গল্প তখনই সত্য মনে হবে যখন এক নজর দেখবেন আপন দৃষ্টির আলোয়। শহরের তিন দিকে রয়েছে পাহাড়। এখানে দেখা যায় দুর্গ এবং মিনার। পুরো শহর যেন গোলাপি রঙে  একাকার হয়ে আছে। রাজা দ্বিতীয় রাম সিং গোলাপি রঙ খুব ভালোবাসতেন বলেই প্রতিটি বাড়ি এবং দোকানে গোলাপি রঙ করার আদেশ দেওয়া হয়।

২০১৯ সালের ৬ জুলাই ভারতের রাজস্থান রাজ্যের এই পর্যটন শহরকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো।

 

জাপানের প্রচীন সমাধি

সাকাই, হাবিকিনো ও ফুজিদেরা শহরজুড়ে বিস্তৃত ৪৯টি টিলা নিয়ে গড়ে ওঠা গুচ্ছবদ্ধ মোযু-ফুরুইচি সমাধিস্তুপ চতুর্থ শতকের শেষদিকে এবং পঞ্চম শতকে তৈরি করা হয়। এগুলোর মাঝে চাবি ঢোকানোর ছিদ্র আকারের একটি সমাধিকে সম্রাট পরিবারের ব্যবস্থাপনা এজেন্সি সম্রাট নিন্তোকুর জাঁকজমকপূর্ণ সমাধি হিসেবে গণ্য করে। আনুষ্ঠানিকভাবে দাইসেন কোফুন নামের সেই বিশেষ সমাধি হচ্ছে জাপানে চাবি ঢোকানোর ছিদ্র আকারের সবচেয়ে বড় সমাধি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেসব সমাধিস্তুপ অতীতকালের উচ্চমানের প্রকৌশল প্রযুক্তির প্রতিনিধিত্ব করায় জাপানে প্রচলিত ঐতিহাসিক আচরণ সম্পর্কে বুঝতে পারার গুরুত্বপূর্ণ ধারণা এগুলো দিয়ে থাকে। বাঁধের সমতল বৃত্তাকার যেখানে মাউস সমাধিস্থল হয়। জাপানি প্রাচীন সমাধি ছাড়াও বিশ্বব্যাপী বিল্ডিং থেকে বিলুপ্ত নবপলীয় সময়ের ব্রোঞ্জ যুগ পর্যন্ত অনুমোদিত হয়। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কোর একটি কমিটি পশ্চিম জাপানের ওসাকা জেলার কয়েকটি প্রাচীন সমাধি টিলাকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে নথিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

 

ইরাকের ব্যাবিলন

ঝুলন্ত উদ্যানের জন্য গোটাবিশ্বের কাছেই পরিচিত পেয়েছে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ব্যাবিলন। এক সময় বিশ্বের সপ্ত আশ্চর্যের মাঝে থাকা এ শহরকে বলা হয় আধুনিক মহানগরের প্রথম উদাহরণ। ব্যাবিলন অর্থ ঈশ্বরের দরজা। সম্রাট হাম্মুরাবি ও নেবুচাঁদ নেজারের মতো শাসকের অধীনে ধারাবাহিক সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ব্যাবিলন নব্য ব্যাবিলনীয় সাম্রাজের সৃষ্টিশীলতার সেরা সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে। এই শহরটির ঝুলন্ত উদ্যান প্রাচীন বিশ্বের সপ্ত আশ্চর্যের অন্যতম, এটি বিশ্বব্যাপী শৈল্পিক, জনপ্রিয় ও ধর্মীয় সংস্কৃতিকেও অনুপ্রাণিত করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই স্থানটি বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথমবার হয়েছিল ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণকালে। আর দ্বিতীয়বার হয় ইরাক দখল করে নেওয়া মার্কিন সেনাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের সময়।

ইরাকে অবস্থিত প্রাচীন মেসোপটেমিয়া নগরীকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বহুদিন যাবত্ চেষ্টা চালাচ্ছিল ইরাক কর্তৃপক্ষ। দেশটির যুদ্ধ ও সংঘাতময় রাজনীতির কারণে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাবিলন নগরী। তবে সম্প্রতি এর অতীত গৌরব সংরক্ষণে নানা ধরনের কাজ চলছে।

ইউনেস্কো বলেছে, বিখ্যাত শাসকের অধীনে ধারাবাহিক সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ব্যাবিলন নব্য ব্যাবিলনীয় সাম্রাজের সৃষ্টিশীলতার সেরা সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে। এই শহরটির ঝুলন্ত উদ্যান প্রাচীন বিশ্বের সপ্ত আশ্চর্যের অন্যতম। এটি বিশ্বব্যাপী শৈল্পিক, জনপ্রিয় ও ধর্মীয় সংস্কৃতিকেও অনুপ্রাণিত করেছে। তবে নবঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের এই অংশটি ‘অত্যন্ত হুমকির মাঝে’ রয়েছে জানিয়ে সতর্ক করেছে তাঁরা এবং জরুরিভিত্তিতে এই ঐতিহ্যটি সংরক্ষণ করা দরকার।

 

ভাখনাইওকুল ন্যাশনাল পার্ক, আইসল্যান্ড

আইসল্যান্ডের মোট সীমানার ১৪ শতাংশ জুড়ে রয়েছে এই ভাখনাইওকুল ন্যাশনাল পার্ক। বরফে আচ্ছ্বাদিত ও আগ্নেয়গিরির বৈশিষ্ট্য সম্বলিত পুরো অঞ্চলটি দারুণ দৃষ্টিনন্দন। এখানে বিশাল অঞ্চলজুড়ে রয়েছে শুকিয়ে যাওয়া অগ্নুত্পাত।

 

লাওসের বয়াম সদৃশ প্রাচীন স্থাপনা

লাওসের ঝিংখাওয়াং অঞ্চলে পাথর দিয়ে তৈরি হাজার হাজার বয়াম সদৃশ বস্তু রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করেন, এগুলো লৌহ যুগে তৈরি। কেন এগুলো তৈরি করা হয়েছিল সেটি এখনো অনেক রহস্যময়। অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ মনে করেন, এগুলো সম্ভবত মরদেহ সত্কারে ব্যবহূত হতো।

 

সূত্র: বিবিসি