নিউমোনিয়া চিকিত্সায় বাংলাদেশি চিকিত্সকের গৌরবময় সাফল্য

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০০

সহজে প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিত্সাযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সারা বিশ্বে পাঁচ বছরের নিচের বয়সের শিশুদের অন্যতম একটি ঘাতক ব্যাধি হল নিউমোনিয়া। নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া বেশিরভাগ শিশু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে দরিদ্র পরিবারের হয়ে থাকে। বাংলাদেশে শুধু ২০১৬ সালেই পাঁচ বছরের নিচের বয়সের ১৬ হাজার ৬৯০ শিশু নিউমোনিয়ায় মারা গেছে, যা হিসাব করলে দাঁড়ায় ঘন্টায় ২টি করে জীবন। শিশুর মারাত্মক নিউমোনিয়া ও হাইপোক্সিমিয়ার হাত থেকে বাঁচাতে বাংলাদেশের গবেষক চিকিত্সক ডা. মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতী আবিষ্কার করেছেন সহজ এক পদ্ধতি।

আইসিডিডিআরবি-র ঢাকা হাসপাতালে গত কয়েক বছর ধরে এই চিকিত্সা পদ্ধতিতে আরোগ্য লাভ করেছে হাজারো শিশু। ইথিওপিয়ার ২৪টি হাসপাতালে এই পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হচ্ছে। পদ্ধতি চালু করার জন্য নেপালের সাথে হয়েছে সমঝোতা চুক্তি। বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এই পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হওয়ার কার্যক্রম চলমান। সহজ এ পদ্ধতির মাধ্যমে নিউমোনিয়ার রোগীর মৃত্যুহার ৭৫ শতাংশ কমানো সম্ভব। এটি ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষিত ডাক্তার, নার্স ও টেকনোলজিস্টেরও দরকার হয় না।

সম্প্রতি আইসিডিডিআরবিতে কথা হচ্ছিল আবিষ্কারকের সাথে। জানালেন মারাত্মক নিউমোনিয়ার চিকিত্সা ব্যয়বহুল এবং প্রশিক্ষিত লোকবলের উপর নির্ভরশীল। উন্নত দেশগুলোতে কৃত্রিম ভেন্টিলেটর ব্যবহার করে রোগীর ফুসফুস সচল রাখা হয়। এরকম একটি যন্ত্র কিনতে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। যা আমাদের মতো দেশের সাধারণ হাসপাতালগুলোর নাগালের বাইরে। তার আবিস্কার সাধারণ ব্যবহূত প্লাস্টিকের শ্যাম্পুর বোতলের মাধ্যমে এমন এক প্রক্রিয়া যা খরচও কম, সফলতাও বেশি। নতুন এ উদ্ভাবিত বাবল সিপিএপি পদ্ধতিটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পদ্ধতির চেয়ে উত্তম বলে প্রমাণিত। আইসিডিডিআরবির গবেষক ডা. চিশতী জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পদ্ধতিতে চিকিত্সায় ব্যর্থতার শতকরা হার ২৪ হলেও তাদের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে এ হার মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ। একইভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পদ্ধতিতে শতকরা মৃত্যুহার ছয় ভাগ হলেও নতুন উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে মৃত্যুহার মাত্র শতকরা ৪ ভাগ।

এই সহজ পদ্ধতিতে অনেক শিশুর প্রাণ বাঁচানো আবিষ্কারকের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁয়ের- উস্থিহরিপুর গ্রামে। উচ্চশিক্ষার জন্য ২০০৮ সালে যান অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের রয়েল চিলড্রেন হসপিটালে। সেখানে ডা. যোবায়ের নতুন একটি চিকিত্সা পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হন। এই পদ্ধতিতে ফুসফুসে লাগাতার বায়ুর চাপ প্রদান করা হয়। ফলে ফুসফুসের কার্যক্রম সচল থাকে। এটিই তার উদ্ভাবনের জন্য কাজে আসে। তিনি জানান, আইসিডিডিআরবি ও দি সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল চাইল্ড হেলথ অ্যাট দি ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের একদল গবেষক ২০১১ সালের আগস্ট মাস থেকে ২০১৩ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত আইসিডিডিআরবির ঢাকা হাসপাতালে মারাত্মক ধরনের নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২৫ শিশুর ওপর গবেষণা চালান। ডা. যোবায়ের চিশতী জানান, আমি ও আমার সহকর্মীরা কয়েকটি বোতলে কিছু পানি ভরি। বোতলের এক প্রান্তে একটি নল যুক্ত করে দেই। অক্সিজেনের উত্স থেকে শিশু অক্সিজেন গ্রহণ করছে এবং শ্বাস ত্যাগ করছে। ত্যাগ করা শ্বাসটি নাকে যুক্ত পাইপের মাধ্যমে চলে আসছে ওই পানি ভর্তি বোতলে। শ্বাস ফেলার ফলে বোতলের মধ্যে যে বুদবুদ তৈরি হচ্ছে তা আবার এক উপায়ে ফুসফুসের সঙ্গে যুক্ত। বায়ুর বুদবুদ চাপ গিয়ে লাগে ফুসফুসে। বহির্মুখী চাপের ফলে ফুসফুস সচল থাকে, সংকুচিত হয়ে যেতে পারে না। এ কারণে শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন পায়। অক্সিজেনের অভাবে সে মরে যায় না।

এমবিবিএস পাস করার পর থেকেই নিউমোনিয়া সংক্রান্ত অনেক গবেষণার সঙ্গে ডা. যোবায়ের চিশতী সম্পৃক্ত হন। নিউমোনিয়ার ওপর তার অনেকগুলো বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র আছে। তার চিকিত্সায় অনেক শিশু সুস্থ হয়েছে ইতোপূর্বে এবং বর্তমানেও অনেক শিশু চিকিত্সাধীন। তিনি বলেন, এখন সবাইকে বুঝিয়ে এক জায়গাতে আনা বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করতে হবে।