নোবিপ্রবি নিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ১৩:৪৮

৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান নতুন বাংলাদেশের সূচনা করেছে। পরিবর্তনের এই জোয়ারে শিক্ষার্থীরাও দেখছেন নতুন আশার আলো, যেখানে শিক্ষার পরিবেশ হবে নিরাপদ, নৈতিক, এবং র্যা গিংমুক্ত। উচ্চশিক্ষার আঁতুড়ঘর হিসেবে বিবেচিত বিশ্ববিদ্যালয়। 

নতুন বাংলাদেশে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতামত ও দাবিগুলো উঠে এসেছে নতুন করে। শিক্ষার পরিবেশে পরিবর্তন ও সংস্কারের এই প্রয়াস নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাবনাগুলো তুলে ধরেছেন — সাবিহা তাসমিম

মানসম্মত গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন
ফজলে এলাহী ফুয়াদ, ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেশন সায়েন্সেস, নোবিপ্রবি

নোবিপ্রবি এমন একটি প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলবে। বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে উন্নত ল্যাব এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত না হলে যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। আর আবাসন ব্যবস্থা উন্নত করতে হলে নতুন হল নির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে পরীক্ষার ফি, কোর্স রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া আরও সহজ এবং অনলাইনে করার ব্যবস্থা হওয়া উচিত। এছাড়া, ক্যাম্পাসে উচ্চগতির ইন্টারনেট, লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত বই, এবং অনলাইন পদ্ধতিতে পরীক্ষার ফি ও কোর্স রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীদের সময় এবং শ্রম কমে যাবে, এবং নোবিপ্রবি বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

শিক্ষার পরিবেশের সংস্কার দরকার 
আবু সুফিয়ান, আইন অনুষদ, নোবিপ্রবি

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ এবং সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। শিক্ষাঙ্গনে দুর্বৃত্তায়ন রোধ করতে পারলে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে সবাই নজর দিতে পারবেন। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি, র্যা গিং, মাদক এবং অস্ত্রবাজি নির্মূলের মাধ্যমে শিক্ষার সঠিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে; বিভাগগুলোতে শিক্ষক সংকট নিরসন করে পর্যাপ্ত ক্লাসরুম এবং সেমিনার রুম নিশ্চিত না করলে দ্রুত এগিয়ে চলা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলা সম্ভব হবে না। পাশাপাশি, লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষকরাজনীতি নিষিদ্ধ করে শিক্ষকদের শিক্ষক হয়ে ওঠার প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। তাছাড়া শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া সংস্কারসহ শৃঙখলা বিষয়ক ইস্যুর সঠিক সমাধানের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় আইনে উল্লেখিত কমিটিগুলোর ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য আইনের কাঠামোগত পরিবর্তনও অপরিহার্য।

নোবিপ্রবির উন্নয়ন ও জবাবহিদিতামূলক প্রশাসন
সাঈদ মুহাম্মাদ সানোয়ার, শিক্ষা অনুষদ, নোবিপ্রবি

ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের পূনর্জন্ম হয়েছে। গত প্রায় ১৫ বছরের অপশাসনে দেশের সব ধরনের প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতির বিষাক্ত কালো ধোঁয়া থেকে মুক্ত ছিল না বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও। শিক্ষক সহ প্রশাসনিক ভবনের পিয়ন থেকে শুরু করে উপাচার্য দপ্তর পর্যন্ত- সবখানে ছিল এক দলীয় রাজনীতির দাপট। নোবিপ্রবির একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ করে স্বচ্ছতা ও জবাবহিদিতামূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ‘লাঞ্চের পর আসুন’- এই আমলাতান্ত্রিক বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না কাউকে। নোবিপ্রবি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি করলে এটি বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান পেতে পারবে। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের শারীরিক এবং মানসিক বিকাশের জন্য আধুনিক মেডিকেল সেন্টারের প্রয়োজন এবং একটি স্বাস্থ্য সম্মত ক্যাফেটেরিয়া এখন সময়ের দাবি। প্রতি বছর নতুন নতুন বিভাগ না খুলে শিক্ষক-ক্লাসরুম-আবাসন সংকট নিরসন করে গণরুম-গেস্টরুমের সংস্কৃতি চিরতরে বিলুপ্ত করতে হবে। সর্বোপরি বৈষম্যহীন যে নতুন বাংলাদেশের সূর্য উদয় হয়েছে তার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠুক আমাদের ১০১ একর।

রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ ও উন্নত সুবিধা
সায়মা আক্তার, ব্যবসা প্রশাসন অনুষদ, নোবিপ্রবি

নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি রাজনীতিমুক্ত, সমান অধিকারভিত্তিক পরিবেশ হওয়া উচিত। শিক্ষার্থীরা চান যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির প্রভাব কমিয়ে একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা হোক, যাতে সবাই সমান সুযোগ পায়। বর্তমানে, ক্লাসের সংকট সবচেয়ে বড় সমস্যা, কারণ ২৮টি ডিপার্টমেন্টের জন্য দুটি একাডেমিক ভবন যথেষ্ট নয়। এজন্য দ্রুত একাডেমিক ভবন ৩-এর সংস্কারের প্রয়োজন। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্লাবের সাথে যুক্ত থাকা শিক্ষার্থীরা যেন তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা আরও বৃদ্ধি করতে পারে তার জন্য ক্লাবগুলোকে প্রশাসনের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং ক্লাবের জন্য প্রশাসনের সুপরিকল্পনা প্রত্যাশা করে শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও পড়ালেখা সুষ্ঠু ভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত মেডিকেল সেন্টার, ভালো ডাক্তার এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা উপকরণ চায় শিক্ষার্থীরা, যাতে করে কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে সে যেন পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা পায়। শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতা শিক্ষার অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরম পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রশান্তি প্রদান করে। পড়াশোনার জন্য একটি উন্নত সেমিনার এবং পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণসহ লাইব্রেরি প্রয়োজন, যা বর্তমানে অনেক ছোট এবং অপ্রতুল।

গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও জীবনমুখী পাঠ্যক্ৰম
মো: কায়সার‌ আহমেদ আবিদ, বিজ্ঞান অনুষদ, নোবিপ্রবি

নোবিপ্রবি নানা সমস্যায় জর্জরিত, যার কারণে র্যাং কিংয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে দলীয় প্রভাব, পুরোনো শিক্ষা কারিকুলাম, গবেষণার প্রতি উদাসীনতা, সৃজনশীলতার অভাব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সমন্বয়হীনতা, অনুপযুক্ত পরিবেশ, পুষ্টিকর খাবারের অভাব, একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ না করা এবং পার্টটাইম কাজের সুযোগের অভাব। এসব বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির পথে বাধা। শিক্ষা কারিকুলাম এবং গবেষণার উপর গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে সৃজনশীলতা ও নতুনত্বের অভাব দেখা যাচ্ছে। তবে নোবিপ্রবি বাংলাদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হতে পারে, যদি ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক উন্নত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করা হয়। নোবিপ্রবি ইন্ডাস্ট্রি ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যেখানে প্রোডাক্ট উদ্ভাবন এবং মানোন্নয়ন হবে। গবেষণার বাজেট বৃদ্ধি, উন্নত শিক্ষার পরিবেশ, জীবনমুখী পাঠ্যক্ৰম এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি ও এনজিওগুলোর আস্থার জায়গা হতে পারে।

ইত্তেফাক/এনএন