বদলে দিয়েছিলেন ছবির ভাষা প্রথমে স্থিরচিত্রে পরে চলচ্চিত্রে। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণে তার ক্যামেরা ধরে রেখেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস। চলচ্চিত্রে তার ক্যামেরার ভাষা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক ভাষা। সেই বিরল প্রতিভাধর আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনকে শ্রদ্ধা জানাল সর্বস্তরের মানুষ। মানুষের ভালবাসা পেলেও তার জীবনে জোটেনি কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট না থাকায় মুক্তিযুদ্ধের পরেও পেলেন না রাষ্ট্রীয় সম্মান।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে গতকাল সোমবার সকালে সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদনের পরে বাদ জোহর ঢাকা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। আলোকচিত্রী চঞ্চল মাহমুদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ফ্রান্স প্রবাসী আনোয়ার হোসেন গত ২৮ নভেম্বর বাংলাদেশে আসেন। পরদিন শনিবার সকালে পান্থপথের একটি হোটেল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন বলেন, একাত্তরে অসীম সাহসিকতায় ধারণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ দৃশ্যপট। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তুলেছিলেন সেসব। অন্যদিকে সিনেমাটোগ্রাফিতে যখন যুক্ত হলেন সেখানেও সৃষ্টি করলেন নতুন ধারা। অথচ এমন একজন গুণী অবহেলিত হয়েছেন।
সূর্যদীঘল বাড়ির নির্মাতা মসিহউদ্দীন শাকের বলেন, ছাত্রাবস্থাতেই দেখতাম ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়াতো দেশের পথে-প্রান্তরে। পুনে থেকে সে যখন সিনেমাটোগ্রাফির ওপর পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরেছে তখন আমরা সূর্যদীঘল বাড়ি নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ওই ছবিতে তাকে চিত্রগ্রাহক হওয়ার অনুরোধ করলাম। কোনো টাকা-পয়সার হিসাব ছাড়াই সেও রাজি হয়ে গেল। শুটিং করার সময় দেখেছি সিনেমাটোগ্রাফির বিষয়ে কখনো আপস করত না। তার কম্পোজিশন সেন্স ছিল অসাধারণ। পাশাপাশি দৃশ্য ধারণে আলো-ছায়ার খেলাটা খুব বুঝতেন।
চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম বলেন, তার সৃজনশীল ছবিগুলো আলোকচিত্রের শিল্পমান সম্পর্কে বদলে দেয় আমাদের ধারণা। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, আনোয়ার হোসেন সাদা-কালো ছবিতেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবগাঁথাকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন। অন্যদিকে চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক হিসেবে গল্পকে অতিক্রম করে যেন কবিতা হয়ে উঠতো তার ধারণকৃত দৃশ্যকল্প।
একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী আমানুল হক বলেন, আনোয়ার হোসেনের ছবি কথা বলতো।
চিত্র-সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ বলেন, আনোয়ার হোসেন ছিলেন ক্যামেরা হাতের মুক্তিযোদ্ধা।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, মানুষের প্রতি যারা নিবেদিত থাকেন, মানুষও ভালোবাসার মাধ্যমে সেই প্রতিদান দিয়ে যান। আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেন তার প্রমাণ।
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকি বলেন, আনোয়ার হোসেনের আগমন আলোকচিত্রী হিসেবে হলেও চলচ্চিত্রকে নতুন মর্যাদায় তুলে ধরেছেন।
‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’, ‘পুরস্কার’, ‘অন্য জীবন’, ‘লালসালু’, ‘শ্যামলছায়া’ চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান আনোয়ার হোসেন। কমনওয়েলথ গোল্ড মেডেলসহ ৬৮টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
যেসব সংগঠন শ্রদ্ধা জানায়: সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বাধীনতা শিক্ষক সোসাইটি, জাতীয় কবিতা পরিষদ, স্থপতি ইন্সটিটিউট, প্রাচ্যনাট, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফি সোসাইটি, দৃক ও পাঠশালা, মুভ্যিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি, শর্ট ফিল্ম ফোরাম, মুক্তিযোদ্ধা ৭১, সেক্টর কমান্ডার্স ফেরাম, বিডি ফটোগ্রাফার্স, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক এসোসিয়েশন, প্রথম আলো, চিত্রালী পাঠক-পাঠিকা চলচ্চিত্র সংসদ, কাউন্টার ফটো স্টুডেন্ট ফোরাম, চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি, রণেশ দাসগুপ্ত চলচ্চিত্র সংসদ, বাংলা একাডেমি, আর্কিটেকচার এলামনাই এসোসিয়েশন অব বুয়েট, শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগ, বেগ আর্ট ইন্সটিটিউট।
