পালিয়ে ব্রিটেনে প্রিন্সেস হায়া!

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৯, ২১:০৬

এম এ আলআমিন

 

দুবাইয়ের প্রিন্সেস হায়া বিনত আল হুসাইন সম্প্রতি সঙ্গোপনে দেশ ছেড়েছেন। হায়ার স্বামী দুবাইয়ের শাসক মুহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম পরিবারে নারীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে এখন তীব্র সমালোচনার মুখে। ৪৫ বছর বয়সী হায়া বর্তমানে লন্ডনে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সঙ্গে আছে তার দুসন্তান জায়েদ (৭) ও জালিলা (১১)। তিনি আশঙ্কা করছেন দুবাইর কর্তৃপক্ষের পৃষ্ঠপোষকতায় তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। তার পরিবারে পালিয়ে আসা নারীদের আবার অপহরণ করে ফেরত আনার নজির আছে। শেখ মাকতুমের ৩৩ বছর বয়সী মেয়ে প্রিন্সেস লতিফা অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। আমিরাতের কমান্ডো বাহিনী ভারতের অদূরে সাগর থেকে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনে। ঘটনাটি ঘটে গত বছর।

প্রিন্সেস লতিফার ঘটনা মাথায় রেখেই প্রিন্সেস হায়া এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৪ জুলাই বিবিসি ‘এস্কেপ ফ্রম দুবাই: দি মিস্ট্রি অব মিসিং প্রিন্সেস’ ডকুমেন্টরিটি পুনঃপ্রচার করে। এতে প্রিন্সেস লতিফার কাহিনী বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। ধারণা করা যায় নিজের সুরক্ষার জন্য প্রিন্সেস হায়া কূটনৈতিক দায়মুক্তি চেয়ে থাকবেন। তিনি লন্ডনে অ্যাক্রিডেশন নিয়েছেন কি না জানা যায়নি। তবে গত মাসে এক সরকারি নথিতে দেখা গেছে তিনি ইতিপূর্বে জর্দানি কর্মকর্তা হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। নথিটি ২০১১ থেকে ১৩ সালের। ঐ তালিকায় তার নাম লেখা হয়েছে প্রিন্সেস হায়া বিনত আল হুসাইন, পদবী ফার্স্ট সেক্রেটারি (কালচারাল অ্যাফেয়ার্স)। তিনি লন্ডনে জর্দানের দূতাবাসে যোগাযোগ করে থাকতেও পারেন। দূতাবাস এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। তার অবস্থান নিয়ে জল্পনা এখন তুঙ্গে। তিনি হয় মধ্য লন্ডনে কেনসিংটন প্যালেসের কাছে উচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টিত এক ভবনে থাকতে পারেন। ২০১৭ সালে তিনি ভবনটি লক্ষ্মী মিত্তালের কাছ থেকে সাড়ে আট লাখ পাউন্ডে কিনেছিলেন। অথবা তিনি জার্মানিতেও আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারেন। সেখানেও তার নিজস্ব সম্পত্তি রয়েছে। নিজের দেশ জর্দানে না গিয়ে তিনি ইউরোপকে বেছে নিয়েছেন। কারণ জর্দানে গেলে আমিরাত সহজেই তাকে ফেরত আনতে পারত। সম্ভাব্য অপহরণ ঠেকাতে প্রাইভেট সিকিউরিটি ফার্মের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করে থাকতে পারেন। কারণ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সহায়তা তিনি নেননি। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার জন স্টেভান্সের মালিকানাধীন ফার্ম করে। এই ফার্ম পরে শেখের গোডলফিন ফার্মে ঘোড়ার ডোপিংয়ের অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত করে।

প্রিন্সেস হায়া শেখ রশিদের ষষ্ঠ স্ত্রী। তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উভয়ের দাম্পত্য সম্পর্ক এখন আদালতে গড়িয়েছে। প্রখ্যাত আইনজীবী ফিওনা শ্যাকেলটনের ল’ ফার্ম পাইন হিকস বিচ এখন তাদের সম্পর্কের আইনী দিকটি দেখাশোনা করছে। ১৯৯৬ সালে ফার্মটি প্রিন্স চার্লস এবং প্রিন্সেস ডায়ানার বিয়ে বিচ্ছেদ তত্ত্বাবধান করেছিল। প্রিন্সেস হায়া আরব বিশ্বের শাসক পরিবারের এক ব্যতিক্রমী নারী চরিত্র। ফেডারেশন ফর ইকুয়েস্ট্রিয়ান স্পোর্টসের (এফইআই) অন্যতম পৃষ্ঠপোষক প্রিন্সেস ও তার স্বামী শেখ মাকতুম। তাকে শেখ মাকতুমের সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সম্মানিত অতিথিদের স্বাগত জানাতে ও স্বাগত ভাষণ দিতে দেখা গেছে। তিনি জাতিসংঘ শুভেচ্ছা দূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। রানি এলিজাবেথ ও প্রিন্স চার্লসের সঙ্গেও তিনি নানা সময় অনেক ছবি তুলেছেন। আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট মেরি রবিনসন তার অন্যতম ব্যক্তিগত বন্ধু। প্রিন্সেস হায়ার অনুরোধে মেরি গত বছর ডিসেম্বরে আমিরাত সফর করেন।

আমিরাত থেকে পারিবারিক নিগ্রহের মুখে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের আইনী সহায়তা দিয়ে থাকে ব্রিটেনভিত্তিক এনজিও ‘ডিটেইনড ইন দুবাই’। আইনজ্ঞ রাদা স্টারলিং ২০০৮ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। লেডি শ্যাকেলটনের কাছে তিনি লিখেছেন আমিরাতে পারিবারিক নির্যাতনের মামলায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কি ধরনের আচরণ করা হয়ে থাকে তার প্রমাণ তার কাছে রয়েছে। শ্যাকেলটন চাইলে তিনি এগুলো তার কাছে হস্তান্তর করবেন। রাদা গত বছর প্রিন্সেস শামসার আপাত অপহরণের বিষয়ে তদন্ত শুরু করার জন্য কেমব্রিজশায়ারের পুলিশের কাছে অনুরোধ করেন। প্রিন্সেস লতিফার বিষয়টিও তার তালিকায় রয়েছে। রাদা বলেছেন, এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে লতিফাকেই ব্রিটেনে ডেকে পাঠানো হতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রিন্সেস হায়ার প্রসঙ্গটি এখন ব্রিটেন ও ইউএইর মধ্যে আরেকটি গলার কাঁটা হতে চলেছে। দেশ দুটি পরস্পরের মিত্র। শুধু তাই নয়, জর্দান আমিরাত সম্পর্কেরও অবনতি ঘটতে পারে। ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের পাশাপাশি তারাও অংশ নিয়েছে। দুবাইর কর্তৃপক্ষ প্রিন্সেস হায়াকে দেশে ফেরত পাঠাতে যুক্তরাজ্যের প্রতি আহবান জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য অবশ্য এখনো এতে সাড়া দেয়নি।