বিশ্বের দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, যেখানে প্রায়ই দেখা দেয় বন্যা, খরা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়ছে, যা মোকাবিলায় প্রয়োজন কার্যকরী ব্যবস্থাপনা।
এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ২০০৫ সালে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের অধীনে যাত্রা শুরু করে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামস ইন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট (পিপিডিএম), যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সম্পর্কিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ে অনন্য পরিচিতি পেয়েছে। ২০২৫ সালে এই বিভাগটি ২০ বছরে পা রাখতে যাচ্ছে। দুই দশকপূর্তি উদযাপনের প্রস্তুতিকে উপলক্ষ করে শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) সকালে এক অনুষ্ঠান আয়োজন করে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইন।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির নতুন ক্যাম্পাসের লেকচার থিয়েটারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে পিপিডিএম-এর সার্টিফিকেট ইন হিউম্যানিটারিয়ান ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কোর্সের সনদ বিতরণ, প্যানেল ডিসকাশন, সাংস্কৃতিক পর্ব ও ক্যাম্পাস ট্যুর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মো. মিজানুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মায়ানমার উইংয়ের পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান, ইউএনএইচসিআর-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুম্বুল রিজভী, আইএফআরসি'র কান্ট্রি ডিরেক্টর আলবার্তো বোচানেগ্রা, ড্যানিশ রিফিউজি কাউন্সিলের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমিত্রা মুখার্জী, ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি প্রোগ্রামের সিনিয়র ডিরেক্টর কেএএম মোরশেদ, এবং ব্র্যাকের ক্লাইমেট চেঞ্জ ও আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের ডিরেক্টর ড. মো. লিয়াকত আলী।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইনের ডিন এবং পিপিডিএম-এর প্রতিষ্ঠাতা স্থপতি অধ্যাপক ড. ফুয়াদ হাসান মল্লিক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার ড. ডেভিড ডাউল্যান্ড এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেল ফর অ্যাডাপ্টেশন, রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্সের নির্বাহী পরিচালক স্থপতি-পরিকল্পনাবিদ ড. ইমন চৌধুরী এবং পোস্ট গ্র্যজুয়েট প্রোগ্রামস ইন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের কোর্ডিনেটর মুহাম্মদ ফেরদৌস।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে একটি প্যানেল ডিসকাশন সেশন আয়োজন করা হয়। প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট দুর্যোগে মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় তাত্ত্বিক বিষয়ের পাশাপাশি অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের প্রয়োগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগের সম্ভাবনা, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে চলমান বিভিন্ন কার্যক্রম মূল্যায়নসহ নানাবিধ বিষয় উঠে আসে এতে।
আলোচকরা বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা অনেককিছু শিখেছি। জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে উঠেছে। তবে বাংলাদেশের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা–সম্পর্কিত গবেষণা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে জন্য যে সহায়তা পাওয়া যায়, স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষতা না থাকার জন্য তার একটা বড় অংশ ব্যবহার করা যায় না। সেক্ষেত্রে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। স্থানীয় জনগণ ও এনজিওগুলোর ভূমিকা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান দুর্যোগের সময়ে টিকে থাকা ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।
তারা বলেন, উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও গবেষণা। গবেষণায় উৎকর্ষ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও অবকাঠামো উন্নয়ন বাংলাদেশকে দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও সাফল্য এনে দেবে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির পিপিডিএম-এর কোর্স কারিকুলাম ও বিভিন্ন সার্টিফিকেট প্রোগ্রামের প্রশংসা করে তারা বলেন, এখানে দেশের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরাও পড়তে আসায় এটি অভিজ্ঞতা বিনিময়ের চমৎকার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বিপর্যয় মোকাবিলায় কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও এখানে পড়তে আসছেন, ফলে এটি সকলকে সমৃদ্ধ করছে।
প্যানেল ডিসকাশন সেশন মডারেট করেন অধ্যাপক ড. ফুয়াদ হাসান মল্লিক। পরে নবগঠিত ডিপার্টমেন্ট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ বিভাগের লোগো উন্মোচন করা হয়। এরপর সনদপত্র বিতরণ, কেক কাটা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার। অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা ক্যাম্পাস ঘুরে দেখেন।
