ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিববাড়ি যুব অভ্যর্থনা ক্যাম্পে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবক সুলতান উদ্দিন তালুকদার স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হননি। ৭১-এ যুদ্ধাহত মানুষের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিটি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নিজের নাম না দেখার কষ্ট নিয়েই না ফেরার দেশে পাড়ি দেন ২০ বছর আগে। মৃত্যুর পর পাননি রাষ্ট্রীয় মর্যাদাও।
সেবক সুলতান উদ্দিন তালুকদারের জন্ম ১৯৪৮সালের ৩১জানুয়ারি। ছাত্র অবস্থায় লেখাপড়া ছেড়ে তিনি চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিববাড়ি যুব অভ্যর্থনা ক্যাম্পে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দেওয়ার মাধ্যমে যুদ্ধে অংশ নেন বলে জানায় তার পরিবার। ২০০৪ সালের ৯ মে মৃত্যুবরণ করেন লাইমলাইটে না থাকা এই যোদ্ধা। মৃত্যুর পর তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদাও দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
যুদ্ধকালীন সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে তার স্ত্রী আছিয়া সুলতানা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়ি-ঘরে থাকতে পারি নাই। দুই সন্তানকে কোলে আর পেটে আরেক সন্তানকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়েছি। স্বামী মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছে, জানার পর কেউ আশ্রয় দিতে চায়নি। কেউ একদিন থাকতে দিলে, পরের দিন না করে দিয়েছে। স্বামী ফিরে আসবে কি-না; তাও জানা ছিল না। তিনি বলেন, স্বামী দেখে যেতে পারেনি নিজের নামটি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়; আমি কী দেখে যেতে পারবো?
তিনি আরও বলেন, আমার স্বামীর নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হবে, এটা কারো দয়া বা করুণা নয়, এটা হলো আমার স্বামীর কাজের স্বীকৃতি। এ স্বীকৃতি না পেলে পহেলা মার্চ থেকে আমিও আন্দোলনে নামবো। আমি আমরণ অনশন করবো। এ কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার আঁচলে মুখ মুছছিলেন আছিয়া সুলতানা।
স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির জন্য ২০০৬ সালে প্রথম আবেদন করেন আছিয়া সুলতানা। এরপর থেকে বারবার এ দপ্তর, ওই মন্ত্রণালয় ঘুরতে ঘুরতে আজ তিনি ক্লান্ত। সাক্ষাতকার ও যাচাই বাছাইয়ের আসরে যেতে যেতে তিনিও হাঁপিয়ে উঠেছেন। আছিয়া সুলতানার বয়সও ৭০’র কোটা ছাড়িয়েছে। শরীরে বাসা বেঁধেছে বার্ধক্যজনিত নানা রোগ।
পারিবারিক তথ্যমতে, যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে সুলতান উদ্দিন তালুকদার ছিলেন সর্বদা প্রস্তুত। ক্যাম্পে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট পরিচিত এক নাম ছিল সুলতান। এ ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনের জন্য মুজিবনগর সরকারের একজন ভাতাভোগীও ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর তারিখে ৭৫ টাকা সর্বশেষ ভাতাও উত্তোলন করেন তিনি। ভাতাভোগীর ১১জনের মধ্যে তার ক্রমিক নং ৯। এ তালিকার ১০জনই মুক্তিযোদ্ধা গেজেটভুক্ত। শুধু গেজেটভুক্ত হয়নি সুলতান উদ্দিন তালুকাদারের নাম। এছাড়াও আরও একটি মুক্তিযোদ্ধা তালিকা (অন্তর্ভুক্তি) ৪০জনের যে তালিকা প্রস্তুত হয় সেখানে সুলতান উদ্দিন তালুকদারের নাম ১৫নং ক্রমিকে। এ তালিকার অনেকেই গেজেটভুক্ত হয়েছেন। হয়নি সুলতান উদ্দিন তালুকদারের নাম।
তার বড় ছেলে মহি উদ্দিন তালুকদার লিটন জানান, মুক্তিযুদ্ধ করেছে আমার বাবা বিজয়ের ৫৩ বছরেও তালিকাভুক্ত না হওয়ায় দুঃখজনক।
আরেক ছেলে কামরুজ্জামান স্বপন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মা এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি দৌড়েছে আশ্রয়ের জন্য আর আজ স্বীকৃতির জন্য এ দফতর থেকে ও দফতরে যাচ্ছি আমরা, আসলে যুদ্ধটা শেষ হলো কোথায়?
১৯৭২সালের ৯ ফেব্রুয়ারিতে ভারতের শিববাড়ি ইয়ুথ ক্যাম্পের ইনচার্জ ডা: এম.এ সোবহান প্রত্যয়নে লিখেছেন, মো. সুলতান উদ্দিন তালুকদার ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিববাড়ী যুব শিবিরে ১৯৭১ সালের মে মাসে যোগ দেন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ঘোষণা পূর্বপর্যন্ত তিনি ছিলেন এই ক্যাম্পে। শিবিরে দীর্ঘকাল অবস্থানকালীন সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাধিক মূল্যবান ও যুদ্ধাহতদের নিরলসভাবে সেবা দেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এমসিএ হাতেম আলী মিয়া দেয়া প্রত্যয়নপত্রে লিখেন শিবিরে তার দীর্ঘ অবস্থানকালে তিনি সর্বাধিক সেবা ও মুক্তির উদ্দেশ্যে কাজ করেন। সুলতান উদ্দিন তালুকদার মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিমাসে ৭৫ রুপী সম্মানী ভাতা পেতেন। তিনি এ প্রত্যয়ন প্রদান করেন ১৯৭৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারিতে।
স্বামীর নামটি গেজেটভুক্ত করতে সর্বশেষ ২০১৪ সালের ২২মে অনলাইনে আবেদন করেন আছিয়া সুলতানা। আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২৭ জুন যাচাই বাচাই হয়। সেই যাচাই-বাছাই কমিটি সাক্ষ্য ও মুক্তিযোদ্ধার প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে ৬ জনকে তালিকাভুক্ত করার জন্য সুপারিশ করেন। এ তালিকার ১ নাম্বারে ছিল সুলতান উদ্দিন তালুকাদারের নাম। অন্য পাঁচজন তালিকাভুক্ত হলেও বাদ পড়েন শুধু তিনি। ২০২০সালের ১৯জানুয়ারি প্রকাশিত তালিকায়ও তাঁর নাম তালিকাভুক্ত হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, যে তালিকার ৫ জন হলো সেই তালিকার এক নম্বর ক্রমিকের নাম বাদ পড়ে কিভাবে? মুক্তিযুদ্ধ করার পরেও তালিকায় নাম উঠানোর জন্য আরেকটা যুদ্ধ করতে হবে এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনকও।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুর রহিম জানান, যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে তার স্বীকৃতির জন্য জোর সুপারিশ করা হয়েছে। বিষয়টি আপিল বিভাগে রয়েছে।
