প্রশ্ন :আপনি বলেছেন, জীবনের উচ্চতর মাত্রাগুলোকে অনুভব করতে হলে জীবনের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। এই সংবেদনশীলতা কী? এটা কি জন্মগতভাবে আসে, না অর্জন করা যায়?
উত্তর :বলুন তো, এটা কি জন্মগতভাবে আসা উচিত? যদিও আমরা চাই সব শিশুই একরকম হোক, এটা নিশ্চয়ই লক্ষ করে থাকবেন যে প্রত্যেকটা শিশুই একে অপরের থেকে আলাদা। জন্ম থেকেই, তারা কীভাবে কাঁদে, কীভাবে হামাগুড়ি দেয়, কীভাবে হাত-পা নাড়ায়, তাদের চাউনি— এ সবই আলাদা। তারা একই ধরনের, এটা ভাবা বোকামি। ঠিক বড়োদের মতোই, তারা প্রত্যেকে আলাদা। একেকজন একেকরকম সহজাত দক্ষতা নিয়ে জন্ম নেয়। কিন্তু জীবনের প্রতি সংবেদনশীলতা কেবল জন্মসূত্রে প্রাপ্ত হয় না।
জন্মসূত্রে কিছু হয়ত পাওয়া যায়। কিন্তু, গাড়ির রেসে প্রথম শুরু করেও আপনি শেষ স্থান অর্জন করতে পারেন, বা সংঘর্ষ হয়ে ছিটকে যেতে পারেন। আবার এটাও সম্ভব যে শেষ থেকে শুরু করেও প্রথম হলেন, যা নির্ণয় করবে আপনার জীবন।
তাহলে, কীভাবে হবেন জীবনের প্রতি সংবেদনশীল? জীবনের প্রতি সংবেদনশীল হতে গেলে, প্রথমে আপনাকে প্রকৃত অর্থে জীবিত হতে হবে। আচ্ছা, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কতোগুলো মুহূর্ত আপনি স্রেফ একটা জীবনের টুকরো হিসেবে কাটান? বেশিরভাগ সময়ই আপনি একটি চিন্তা অথবা আবেগ কিংবা ধারণা বা মন্তব্য বা দর্শন বা সম্পর্ক, এরকম কিছু হয়েই কাটান। যদি জীবনের প্রতি সংবেদনশীল হতে চান, তাহলে প্রথমে স্রেফ ‘জীবন’ হতে শিখুন।
যদি আপনার শরীর এবং মনের থেকে একটু দূরত্ব তৈরি করে চলতে পারেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল হয়ে উঠবেন। যোগের নামে যা কিছু করা হচ্ছে এখানে কেবল সেই উদ্দেশ্যেই করা। সংবেদনশীল হলেই কেবল আপনি বাস্তবের সঙ্গে ঐকতানে নিবদ্ধ হবেন। এখন আপনার সংবেদনশীলতা রয়েছে শুধু আপনার অহং-এর জায়গায়। আপনি হয়ত বলেন ‘আমি খুবই সংবেদনশীল।’ কিন্তু আদতে যেটা বলতে চাইছেন সেটা হলো আপনার অহং বিশাল বড়ো।
সংবেদনশীল হওয়া মানে এই নয় যে আপনি প্রত্যেকটি ঘটনাতে কষ্ট পাবেন বা রেগে যাবেন বা বিরূপ হবেন। আপনি সংবেদনশীল হলে বাকি জীবন নিজের মধ্যেই অনুভব করবেন। কারণ আপনি নিজেই জীবন। আপনার চারপাশে যে জীবন রয়েছে, তাদের আর আপনার মধ্যে কোনো তফাত নেই। স্রেফ এক টুকরো জীবন হিসেবে যদি আপনি অবস্থান করতে পারেন, তাহলে এটা আপনি সহজাতভাবেই অনুভব করবেন। যদি কোনো চিন্তা বা ভাবনা হিসেবে অবস্থান করেন, তার মানে আপনি অস্তিত্বের বাকি সবকিছুর থেকে বিচ্ছিন্ন। স্রেফ জীবন ছাড়া আপনি যাই হোন না কেন, সেটা কৃত্রিম, বাস্তব নয়।
সংবেদনশীল হতে চাইলে একটা সহজ অভ্যাস করতে পারেন। এটা ভাবুন যে আপনার সব ভাবনা ও আবেগগুলোর গুরুত্ব অত্যন্ত কম। একদিন করে দেখুন এটা। দেখবেন, হঠাত্ করে মৃদুমন্দ বাতাসকে অনুভব করতে পারছেন, বৃষ্টি, ফুল, মানুষ সকলকেই অন্যরকমভাবে অনুভব করছেন। জীবন যেন নতুন করে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে আপনার অনুভবে। তখন আপনি জীবনের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে উঠবেন এবং এটা একবার হলে তখন আর ফিরে তাকানোর ব্যাপার থাকবে না। কারণ তখন আর নিজের শরীরের সঙ্গে নিজেকে চিহ্নিত করবেন না বরং চারদিকে তাকিয়ে এটাই দেখবেন যে পুরোটাই তো কেবল আপনিই। তখন সংবেদনশীলতাই আপনার প্রকৃতি হয়ে উঠবে।
এই জীবনের প্রতি সংবেদনশীল হওয়াটা কোনো ব্যায়াম নয়, কোনো তত্ত্ব নয়, কোনো দর্শনও নয়। আপনি যদি স্রেফ জীবন হোন, আপনি এমনিই সংবেদনশীল হবেন। কিন্তু সমস্যা হলো, আপনি জীবন ছাড়া বাকি সবকিছু হওয়ার চেষ্টা করছেন। আপনি চেষ্টা করছেন একটা চিন্তা হতে, একটা আবেগ হতে, একটা ভাবনা, একটা সিদ্ধান্ত, একটা মতবাদ, একটা দর্শন আরো কত কিছু হতে। আপনি যদি এটা বুঝতে পারেন যে আপনার শরীর, মন আর আবেগ কোনোটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাহলে দেখবেন হঠাত্ই আপনি প্রচণ্ড সংবেদনশীল হয়ে উঠেছেন জীবনের প্রতি।
সৌজন্য :ঈশা ফাউন্ডেশন
