জার্মানির আন্তর্জাতিক সম্প্রচার মাধ্যম ডয়চে ভেলের বিরুদ্ধে ইসরায়েলপন্থী এবং ফিলিস্তিনবিরোধী পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন নিজেদের কর্মীরা। সেই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, জ্যেষ্ঠ নিউজরুম ব্যক্তিত্বরা গাজার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে প্রতিবেদন করার দায়িত্বে থাকা সাংবাদিকদের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলছেন।
বর্তমানে ডয়চে ভেলের হয়ে কাজ করা ১৩ জন কর্মী, ফ্রিল্যান্সার এবং একজন প্রাক্তন দীর্ঘমেয়াদী সংবাদদাতা আল-জাজিরাকে এমনটাই বলেছেন। বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) কাতারভিত্তিক সংদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ডয়চে ভেলের কর্মীরা অভিযোগ করেছেন, তারা সহকর্মীদের মুখে ফিলিস্তিনি এবং বার্লিন অফিসে বিক্ষোভকারীদের সম্পর্কে ইসলামোফোবিক এবং অমানবিক মন্তব্য করতে শুনেছেন। আল-জাজিরার সঙ্গে বেশ কয়েকটি অভ্যন্তরীণ নথিও শেয়ার করেছেন তারা।
কিছু নথিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলো নিয়ে সংবাদ করার জন্য পৃথক 'গাইডলাইন' অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের অবহিত করা হয়, 'প্যালেস্টাইন' বা ফিলিস্তিন শব্দটি মিডিয়া কভারেজে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, এটি এখনো কোনো 'রাষ্ট্রের মর্যাদা অর্জন করেনি'।
'ইহুদি-বিদ্বেষ সচেতনতা প্রশিক্ষণ ইভেন্ট' আছে সেখানে, যার হ্যান্ডআউট থেকে বোঝা যায়, ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা 'জায়নিস্ট' বা 'ইসরায়েলিদের' মতো কোড ব্যবহার করে প্রকাশ করা হয়। আর অর্থ, ইসরায়েলের সমালোচনাও ইহুদিবিদ্বেষের একটি রূপ হতে পারে।
গাজায় ইসরায়েলি বোমা হামলায় ১৭ হাজার শিশুসহ অন্তত ৪৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পরও যুদ্ধের বার্ষিকীর একটি পরিকল্পনা নথিতে 'ইসরায়েলি দুর্ভোগকে' অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
'অবিরাম ভয়ের অনুভূতি'
ডয়চে ভেলে ছেড়ে যাওয়া আর্জেন্টিনীয় ইহুদি সাংবাদিক মার্টিন গাক আল-জাজিরাকে 'সিনিয়র স্টাফদের দ্বারা সর্বদা ভয়ের অনুভূতি'র কথা জানিয়েছেন।
১০ বছর ধরে ডয়চে ভেলের ধর্মবিষয়ক সংবাদদাতা এবং রাজনৈতিক সাক্ষাত্কার শো 'কনফ্লিক্ট জোন'র সিনিয়র প্রযোজক হিসাবে কাজ করা মার্টিন গাক জানান, সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে ডয়চে ভেলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতার মতো মহৎ ধারণা দিয়ে মুখ ভরিয়ে রেখেছে। তবে এগুলো কেবল 'মাউথওয়াশ' হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
গাক ব্যতীত সমস্ত সাক্ষাত্কারকারীরা নিজেদের 'নিরাপত্তার ভয়ে' নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।
গাইডলাইনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি বর্ণবাদী ভাষা ব্যবহার আমরা সহ্য করি না, যা ফিলিস্তিনি জনগণকে অবমাননা করার লক্ষ্যে কাজ করে। তবে বেশ কয়েকটি সূত্র বলেছে, কর্মীরা নিউজরুমে প্রকাশ্যে ইসলামোফোবিক এবং আরববিরোধী গালি ব্যবহার করেন।
বর্তমানে ডয়চে ভেলের হয়ে কাজ করা অ্যান্ড্রু বলেন, আমি একটি প্রতিবেদন করছিলাম। ভিডিও ফুটেজে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে কাঁদতে কাঁদতে বলতে শোনা যায়, বোমা পড়েছে এবং আমার বাবা ও আমাকে আমার চাচার লাশ বহন করতে হয়েছে।
অ্যান্ড্রু শিশুদের 'ট্রমাটিক ক্লিপ' ব্যবহারের নৈতিকতা সম্পর্কে কথোপকথন করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত আমাদের বার্তাকক্ষে বিতর্ক তৈরি হয়। আমি এটি (শিশুর কথা) রেখেছিলাম, কিন্তু এই বার্তাকক্ষের নির্বাহী তার যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন: আমরা কীভাবে জানব, যদি এই বাচ্চাটি অভিনয় করে থাকে?
অ্যান্ড্রু বলেন, বার্লিনের নিউজরুমের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এটা পরিষ্কারই ছিল যে, শিশুটি অভিনয় করছিল না।
অভিযোগের কথা উল্লেখ করে ডয়চে ভেলের কাছে মন্তব্যের অনুরোধ করে আল-জাজিরা। একজন মুখপাত্র ই-মেলের মাধ্যমে বলেন, তাদের নেটওয়ার্কটি 'ইসলামফোবিক, বর্ণবাদী, অমানবিক বা বৈষম্যমূলক মন্তব্য' গ্রহণ করে না। ডয়চে ভেলে বৈষম্যবিরোধী কর্মকর্তা নিয়োগ করে, যিনি সবার জন্য উপলব্ধ।
ডয়চে ভেলের বার্লিন অফিসে কর্মরত কারেন বলেন, সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে আমি অনেক মুসলিমবিরোধী ও আরববিরোধী মনোভাব এবং ইসরায়েলের প্রতি তীব্র পক্ষপাতের কথা শুনেছি।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এটা হাস্যকর। আমি একজনকে বলতে শুনেছি, 'আমরা সবসময় শুনি যে গাজায় যাওয়ার জন্য কোনো নিরাপদ জায়গা নেই, তবে কেন তারা (ফিলিস্তিনি বেসামরিকরা) হামাসের টানেলে যায় না? এ থেকে ডয়চে ভেলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের চোখে ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রার অমানবিকতা ফুটে ওঠে।
'উপর থেকে নিচ পর্যন্ত নার্ভাসনেস'
যুক্তরাষ্ট্রের পর জার্মানি ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। ইসরায়েলের প্রতি জার্মান সমর্থনকে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব এবং হলোকাস্টের প্রায়শ্চিত্ত করার উদ্দেশ্যের অংশ হিসাবে দেখা হয়।
হামাসের হামলার কয়েকদিন পর চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘোষণা দেন, জার্মানির একটিমাত্র জায়গা আছে, আর তা হলো ইসরায়েলের পাশাপাশি থাকা।
আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের আইনজীবীরা শলৎস সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যায় সহায়তার অভিযোগ এনেছেন। অ্যাক্টিভিস্টরা দেশটিতে নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনপন্থী কণ্ঠস্বরকে দমন করার অভিযোগও করে।
রাষ্ট্রীয় তহবিলপ্রাপ্ত ডয়চে ভেলে ১৯৫৩ সালে জার্মান ফেডারেল সরকার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মিডিয়ার গাইডে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রতি জার্মানির বিশেষ দায়িত্বের অর্থ এই নয় যে 'ইস্রায়েলি নীতির সমালোচনা করা যাবে না' এবং 'সব ক্ষেত্রে, আমরা নিরপেক্ষভাবে রিপোর্ট করার জন্য আমাদের বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করে চলেছি'।
একজন ব্যবস্থাপক ই-মেইলে আল-জাজিরাকে বলেছেন, আমরা এই যুদ্ধের (গাজা যুদ্ধ) পুরো ব্যাপ্তি, সমস্ত পক্ষের মানবিক মূল্য দেখাতে চাই। সাংবাদিক হিসেবে ইসরায়েলি নীতির সমালোচনামূলক কাভারেজ আমাদের কাজের অংশ।
তবে আল-জাজিরার সাক্ষাৎকার নেওয়া বেশ কয়েকজন কর্মী আশঙ্কা করছেন, ডয়চে ভেলের তহবিল মডেল সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে বিপন্ন করবে।
ডয়চে ভেলের অ্যান্ড্রু বলেন, উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একটা নার্ভাসনেস আছে, যা পুরো ফ্লোরজুড়ে ছড়িয়ে আছে। তিনি এটিকে 'সম্পাদকীয় নীতি' বলে বর্ণনা করেন এবং দ্বিচারিতার অভিযোগ তোলেন।
ফিলিস্তিন শব্দটি ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি এটিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করি। আমরা তাইওয়ান বলতে পারি, আমরা কসোভো বলতে পারি, পশ্চিম সাহারা এবং অন্যান্য জায়গার কথা বলতে পারি।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

