আর্জেন্টিনাতে সদ্য-অনুষ্ঠিত জি ২০ শীর্ষ সম্মেলন হইতে অনুমেয়ভাবেই তেমন কোনো ফল লাভ হয় নাই। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাইবার মানসে এক দশক পূর্বে এই শীর্ষ সম্মেলনের সূচনা হয়। বিশেষ করিয়া বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে তত্কালে এই সম্মেলনের উপরে অনেকেই গুরুত্বারোপ করিয়াছিলেন। কিন্তু সর্বশেষ সম্মেলনটি হইতে এই বার্তাটিই স্পষ্ট হইয়াছে যে, বিশ্ব-সম্পদের ৮৫ ভাগ নিয়ন্ত্রণকারী দেশগুলির এই জোটটি ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে সফল হইতে পারে নাই। অনেক বিশ্লেষকের মতে, জি ২০ শীর্ষ সম্মেলন বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি প্রসঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছাইবার প্রচেষ্টার পরিবর্তে জনপ্রিয়তাবাদী নেতাদের দাপট দেখাইবার একটি মঞ্চে পরিণত হইয়াছে।
এইবারের জি ২০ শীর্ষ সম্মেলনের জন্য তিনটি মূল আলোচ্য ছিল। এইগুলি হইতেছে বিশ্ব শ্রমবাজারের ভবিষ্যত্, উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা। একটু খেয়াল করিলেই দেখা যাইবে যে, এই আলোচ্যগুলির পরিবর্তে একাধিক পরাশক্তির দ্বিপাক্ষিক বিরোধ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কয়েকটি বিষয় সংবাদমাধ্যমের যাবতীয় দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া লইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ, এইবারের সম্মেলন শুরুর আগে হইতেই আমেরিকা-চীন বাণিজ্য বিরোধ তথা দুই দেশের প্রেসিডেন্টের মধ্যকার বৈঠকের ফলাফল লইয়াই সকল পক্ষকে উদগ্রীব থাকিতে দেখা গিয়াছে। বিশেষ করিয়া বাণিজ্য বিরোধের জের ধরিয়া এই দুই পরাশক্তির সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকটতর হইয়া উঠে কিনা তাহা লইয়া দুশ্চিন্তা তুঙ্গে উঠিয়াছিল। পরমাণু অস্ত্র বিষয়ে গত কিছুদিন ধরিয়া আমেরিকা-রাশিয়া মতানৈক্যও এইবারের সম্মেলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। ইউক্রেন প্রসঙ্গে রাশিয়ার ভূমিকার বিরোধিতা করিয়া আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সহিত শীর্ষ বৈঠক বাতিল করিলেন, তাহাও সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য হইয়া উঠিল। এইদিকে, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ব্রেক্সিট লইয়া প্রচণ্ড রাজনৈতিক বিপাকের মধ্যে থাকা অবস্থা হইতে রক্ষা পাইবার জন্য এইবারের জি ২০ শীর্ষ সম্মেলনটিকে ব্যবহার করিয়াছেন। রাজপরিবারের কট্টর সমালোচক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ড লইয়া প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থাকা সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও নিতান্ত এজেন্ডাবহির্ভূত কারণে ব্যাপক প্রচার পাইয়া গেলেন এইবারের সম্মেলনে। পুতিনের সহিত তাঁহার দুরন্ত হ্যান্ডশেক লইয়াই যাবতীয় আলাপ-আলোচনা চলিতেছে। এইদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান আবার খাশোগি হত্যাকাণ্ড লইয়া সৌদি যুবরাজকে শায়েস্তা করিবার বাসনা-তাড়িত হইয়া সম্মেলনের দুইদিন ধরিয়া দৌড়ঝাঁপ করিয়াছেন। বস্তুত জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশ এবং সংগঠন হিসাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) ব্যতিরেকে অন্যদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অপেক্ষা রাজনৈতিক বিষয়াদিই যেন প্রধান হইয়া উঠিয়াছিল।
ট্রাম্প, পুতিন, থেরেসা মে, সালমান ও এরদোগানের কথাবার্তা হইতে একটি বিষয় স্পষ্ট হইয়াছে যে, বিশ্ব অর্থনীতির সুস্বাস্থ্য নহে, বরং নিজ-নিজ দেশে ভোটারদের মধ্যে সমর্থন বাড়াইবার বিষয়টিই যেন এইবারের সম্মেলনে তাঁহাদের প্রধান বিবেচনা হিসাবে স্থান পাইয়াছে।
