এরশাদ অধ্যায়ের অবসান

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৯, ০১:৩৭

সাবেক রাষ্ট্রপতি, সাবেক সেনাপ্রধান, জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান ও বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এইচ এম এরশাদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) গত ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর গতকাল রবিবার সকাল পৌনে ৮টায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে জন্মগ্রহণ করেন এরশাদ। সেই হিসাবে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর ৬ মাস ১৩ দিন। যদিও এরশাদ নিজে জন্মদিন পালন করতেন প্রতিবছরের ২০ মার্চ।          পৃষ্ঠা ১৫ কলাম ২সর্বশেষ এ বছরও ২০ মার্চ তিনি ৯০তম জন্মদিন পালন করেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে উত্খাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন তত্কালীন সেনাপ্রধান এরশাদ। যদিও এরশাদ প্রায়ই বক্তব্যে বলতেন, ‘অসুস্থ হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষমতার কারণে বিচারপতি সাত্তার স্বেচ্ছায় আমার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। সেদিন আমার অবস্থানে যিনিই থাকতেন, তাঁকেই সেই দায়িত্ব গ্রহণ করতে হতো।’ মৃত্যুর আগে বহুবার বিভিন্ন বক্তব্যে এরশাদ বলেছিলেন, ‘আমিই দেশের সর্বশেষ সামরিক শাসক, এরপরে বাংলাদেশে আর সামরিক শাসন আসবে না।’

স্বৈরাচারবিরোধী প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশে ‘স্বৈরাচার’ তকমাটি কেবল এরশাদের সঙ্গেই এঁটে আছে। গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেও আলোচনা-সমালোচনা আর নানা বিতর্কের মধ্যে তিনি টিকে ছিলেন রাজনীতিতে। এটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসেই বিরল ঘটনা। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে বৈচিত্রপূর্ণ ও বিতর্কিত একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটল। গত তিন দশকে ৪২টি মামলার দায় থেকে মুক্ত হতে পারলেও মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যা মামলাটি বিচারাধীন। এই মামলা মাথায় নিয়েই চিরবিদায় নিলেন এরশাদ।

রাজনীতিতে আলোচিত-সমালোচিত থাকলেও সর্বশেষ এ বছরের ২০ মার্চেও নিজের ৯০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এরশাদ বলেছিলেন, ‘এদেশে আমার মতো নির্যাতিত-নিষ্পেষিত রাজনীতিবিদ আর নেই। বিনা অপরাধে আমাকে ছয়টি বছর জেলে রাখা হয়েছিল। আমার জীবনের সেই ছয়টি বছর কে ফিরিয়ে দেবে? কোনো সরকারের আমলেই আমি ন্যায়বিচার পাইনি, ক্ষমতা ছাড়ার পর সব সরকারের আমলেই আমি অবিচারের শিকার হয়েছি। এটাই হয়তো আমার জীবনের শেষ বক্তব্য।’

গতকাল সকালে মৃত্যুর খবর শুনে পরিবারের সদস্যরা ও দলীয় নেতা-কর্মীরা সিএমএইচে যান। ছেলে সাদকে সঙ্গে করে স্বামীর মরদেহ দেখতে হাসপাতালে যান স্ত্রী রওশন এরশাদ। দলীয় কর্মীদের কেউ কেউ যান এরশাদের বনানী কার্যালয়ে। স্বজনদের কেউ যান এরশাদের বারিধারার বাসায়, কেউ যান রওশনের গুলশানের বাসায়।

গতকাল বাদ জোহর মরহুম এরশাদের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা সেনানিবাসে সেনা কেন্দ্রীয় মসজিদে। এরশাদের পরিবার ও জাপার পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, আজ সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দ্বিতীয় জানাজা হবে। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কাকরাইলে জাপার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। পরে বাদ আসর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তৃতীয় জানাজা হবে। জানাজা শেষে মরদেহ আবারও নিয়ে যাওয়া হবে সিএমএইচের হিমঘরে। সেখান থেকে আগামীকাল মঙ্গলবার সকালে হেলিকপ্টারে করে এরশাদের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে তাঁর নির্বাচনী এলাকা রংপুরে। সেখানে চতুর্থ জানাজা শেষে বিকালে ঢাকায় এনে সামরিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

প্রথম জানাজার জন্য এরশাদের মরদেহ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসা হয় ঢাকা সেনানিবাসের সেনা কেন্দ্রীয় মসজিদে। জোহরের নামাজের আগে মসজিদের ইমাম মাইকে ঘোষণা দেন, ‘নামাজ শেষে সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। এরপর নামাজে জানাজা হবে।’ নামাজ শেষে মোনাজাতে ইমাম বলেন, ‘তিনি দেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। জানা, অজানা যত ভুলত্রুটি করেছেন, হে আল্লাহ তুমি তাঁকে ক্ষমা করে দাও। দোষে-গুণেই মানুষ। তিনি ৯০ বছরের ঊর্ধ্বের বয়সী মানুষ ছিলেন। তাঁর জীবনে অনেক নেক কাজ আছে। দেশের মানুষের প্রতি তাঁর অনেক অবদান রয়েছে। হে আল্লাহ, তুমি তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব কোরো।’

জানাজা শুরুর আগে কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা সংক্ষেপে এরশাদের জীবনী পাঠ করেন। এতে বলা হয়, ‘বিএ-৫০, এনডিপি, পিএসসি, সাবেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আজ সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে হূদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর ৬ মাস ১৩ দিন। ১৯৮৬ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কারও কোনো দেনা-পাওনা থাকলে সংশ্লিষ্টদের তাঁর নিকটাত্মীয় কিংবা সেনাসদরে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

এরপর এরশাদের সহোদর ও জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বড়ো ভাই এমপি ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। ১৯৯১ সালের পর থেকে এক-দুটি নির্বাচন ছাড়া প্রতিটি নির্বাচনেই তিনি জয়ী হন। ৯ বছর তিনি দেশ শাসনের দায়িত্ব পালন করেন। সেনাপ্রধান ছিলেন। দেশ, জাতি, সমাজ, জনগণ ও সেনাবাহিনীর কল্যাণে তিনি অনেক অবদান রেখেছেন। কোনোটা আল্লাহ কবুল করেছেন, কোনোটা হয়তো সঠিকভাবে হয়নি। আমার জানামতে, তিনি তিনবার পবিত্র কাবা শরিফে নামাজ পড়তে পেরেছিলেন, মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা)-এর পবিত্র কবরে হাত রেখে সুরা পাঠ করেছিলেন। মানুষ মাত্রই ভুলত্রুটি হয়ে থাকে। তাঁরও কোনো কোনো কাজ হয়তো অনেকের পছন্দ হয়নি। কারও যদি কোনো ক্ষোভ থাকে, আমি হাতজোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনারা ওনাকে ক্ষমা করে দেবেন। কারও কোনো দেনা-পাওনা থাকলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।’

জি এম কাদেরের বক্তব্য শেষে জানাজা পড়ান আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ধর্মীয় শিক্ষক আহসান হাবীব। জানাজা শেষে আইএসপিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘দাফন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হবে।’ সেনা কেন্দ্রীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত জানাজার সময় এরশাদের মৃতমুখ কাউকে দেখানো হয়নি। জানাজা শেষে এরশাদের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সিএমএইচের হিমঘরে।

জানাজায় তিন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাসহ সশস্ত্র বাহিনীর বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, বিমানবাহিনীর প্রধান, সাবেক সেনাপ্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তা জানাজায় শরিক হন। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, বিএনপির নেতা মে. জে. (অব.) রুহুল আলম চৌধুরী, গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিকল্পধারার প্রেসিডিয়াম সদস্য এইচ এম গোলাম রেজা, জাতীয় পার্টির (জাফর) প্রেসিডিয়াম সদস্য আহসান হাবীব লিংকনও জানাজায় অংশ নেন। জাপা নেতা এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, মসিউর রহমান রাঙ্গা, মুজিবুল হক চুন্নু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, সাহিদুর রহমান টেপা, এরশাদের পুত্র সাদ প্রমুখ এই জানাজায় অংশ নেন।

জাপার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী বুধবার বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে এরশাদের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে মরহুম এরশাদের জন্য বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে ও কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়েছে। আজ থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত শোকবই খোলা থাকবে। অন্যদিকে, সামরিক কবরস্থানে এরশাদকে দাফনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল বিকালে জাপার শতাধিক নেতা-কর্মী বনানী কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন। এ সময় জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, কবরের বিষয়ে মঙ্গলবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এছাড়া রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জাপা নেতা মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা গতকাল রংপুরে সংবাদ সম্মেলনে এরশাদকে হয়তো ঢাকায় জাতীয় নেতাদের পাশে অথবা রংপুরে দাফনের দাবি জানিয়েছেন। গতকাল চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে এরশাদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ স্থানীয় জাপা নেতারা এতে অংশ নেন।

৯০ বছর বয়সি এরশাদ রক্তের ক্যানসার মাইডোলিসপ্লাস্টিক সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরি হচ্ছিল না। শেষ দিকে তাঁর ফুসফুসে দেখা দিয়েছিল সংক্রমণ, ফুসফুসে পানি জমে যায়। রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণও অনেক কমে যায়। এর মধ্যে প্রচণ্ড কাঁপুনি জ্বর নিয়ে গত ২৬ জুন সিএমএইচে ভর্তি হন এরশাদ। ১১ দিন আগে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। পরে তাঁর কিডনি, লিভারসহ কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই আর কাজ করছিল না। কার্যত গত কয়েক দিন তিনি ছিলেন ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’।