আত্মহত্যা মানে নিতান্তই আনকোরা যুবক বা যুবতীর লাইমলাইটে চলে আসা। আর ঠিক তখনই ওই মানুষটার হদিস পাই। তার আগে শত অবসাদে গুড়িয়ে যেতে থাকলেও সে তার পাশে কাউকে পায় না। আমরা আত্মহত্যার খবরটা লুফে নেই। তারপর তার চৌদ্দপুরুষের সন্ধানও পেয়ে যাই। বেশ কিছুদিন ওই আত্মহত্যাটা নিয়ে পড়েও থাকি। আমরা তার প্রায়শ্চিত্য করতে থাকি। তার আত্মহত্যার খবরটা তাবত্ দুনিয়াকে জানিয়ে দেই। কিছুদিন সমবেদনায় মেতে থাকি। তারপর দায়িত্ব শেষ।
একদিন, দুইদিন অথবা বড়জোড় তিনদিন পর থেকে আমাদের গলা দিয়ে দিব্যি আগের মতোই ভাত নেমে যায়। কোনোই সমস্যা হয় না। নিজের সঙ্গে নিজের অলিখিত এক লড়াই চালিয়ে যেতে যেতে একজন মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে যায় তখন ভিন্ন উপায় খোঁজে; নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। তখনই বেছে নেয় হীন এই পথ। তাছাড়া মাদকের করাল গ্রাস, পারিবারিক কলহ, প্রেমের ব্যর্থতাও আত্মহত্যা করার অন্যতম কারণ। আমাদের দেশে বড় অংশ আত্মহত্যা করে অতিমাত্রায় আবেগতাড়িত হয়ে আর এক্ষেত্রে উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীরা এগিয়ে। এছাড়া নারীদের সংখ্যাও কম নয়। ইভটিজিং, যৌতুক, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং অর্থনৈতিক অসক্ষমতা এসব কারণে নারীদের একটা বড় অংশ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি তাদের জানা থাকার কথা। আর যারা জানেন না তাদের উদ্দেশ্যে বলি; খুব সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মহত্যার সংখ্যা উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণের কথা অনেকের মনে থাকার কথা। তরুণ আমার ইয়ারমেট অথচ এই ছেলের সঙ্গে ক্যাম্পাসে আমার কখনো দেখা কিংবা কথা হয়নি। সে চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলাতে পারেনি। চরম অবসাদগ্রস্ততা, তার পঠিত বৈষয়িক বিষয়ের অত্যধিক চাপ, নৈরাশ্যবাদ তার আত্মহত্যার মূল কারণ। হয়তো কারণগুলো খুব ঠুনকো। কথাগুলো এক ফুত্কারে উড়িয়ে দেবার মতোই। আমরা ফুত্কারে উড়িয়ে দিতে দিতে মানুষকেও উড়িয়ে দেই। এই নৈরাশ্যবাদীদের নৈরাশ্যবাদের দিকে ঠেলে দেবার পেছনে আমরাও অগোচরে কিছুটা কলকাঠি নেড়ে যাই। হাসি-তামাশা করে নৈরাশ্যবাদী মানুষটাকে আরো নিরাশ করি।
আমাদের সমাজ এমন কিছু দৃষ্টিভঙ্গি পুঁষে রেখেছে যা টপকানো দুঃসাধ্য। আমাদের সংস্কৃতি কখনোই মানসিক অবসাদগ্রস্ততা কিংবা হতাশাকে রোগ হিসেবে দেখে না। কাউকে মনোবিদের কাছে যাওয়া আমাদের কাছে সুখকর ঠেকে না। ভেবে নেই সে হয়তো পাগলপ্রায়। অথচ পশ্চিমা বিশ্বে মানসিক সমস্যাকে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। খুব সম্প্রতি ব্রিটিশরা আত্মহত্যা বিষয়ক একজন মন্ত্রীও নিযুক্ত করেছে। অথচ বহির্বিশ্ব থেকে আমরা মানসিকতভাবে যোজন যোজন পিছিয়ে আছি। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এখন পর্যন্ত মানসিক রোগ নিয়ে খুব বেশি ভাবতে দেখা যায় না; সচেতনতা তো দূরের কথা। আর এ জন্যই প্রচণ্ড হতাশ ব্যক্তিটি সংকোচবোধ করে এবং মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে খানিকটা ইতস্তত বোধ করে। এভাবেই দিনকে দিন হতাশার বোঝা বয়ে বেরিয়ে শেষমেশ নিজে নিঃশেষ হয়ে যায়। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখতে গেলে আত্মহত্যা সংখ্যার ভয়াবহতা চোখে পড়বে। তাই পরিসংখ্যানের ঢাক-ঢোল পিটানোর দরকার নেই। সমাজ জটিল হচ্ছে আর সেই সঙ্গে সামাজিক সমস্যাও জটিল হচ্ছে। আমরা যতই এগিয়ে যাচ্ছি তার সঙ্গে অনেক বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছি। একা বেঁচেবর্তে দিন পার করলেই হবে না, পাশের হতাশ বন্ধুটিকেও বেঁচে থাকার টোটকা দিতে হবে। আগামীর বাংলাদেশের স্বপ্ন কে না দেখে; তবে বাংলাদেশও তো আপনার-আমার মাধ্যমে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে।
n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
