গত সোমবার চাঁদপুরে মেঘনা নদীতে লাইটার জাহাজের সাত শ্রমিক হত্যার বিচার, নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান ও নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে বৃহস্পতিবার দিনগত রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কর্মবিরতি পালন করছেন লাইটারেজ নৌযান শ্রমিকেরা যা গতকাল শনিবারও অব্যাহত ছিল, যা রাতে প্রত্যাহার করা হয়। সাত খুনের ঘটনার পর পরই প্রশাসনের কাছে চার দফা দাবিতে ৭২ ঘণ্টা সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। নৌযান শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে সারা দেশে নৌপথে লাইটার জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন নদীবন্দরে নোঙর করা বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় ভেঙে পড়েছে দেশের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, নৌযান শ্রমিকদের কর্মবিরতি অব্যাহত থাকায় গতকাল শনিবার দ্বিতীয় দিনের মতো চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজ বা লাইটারেজ ভেসেলে সব ধরনের পণ্য খালাস বন্ধ ছিল। কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটসহ দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-রুটে পণ্য পরিবহন হয়নি। ভেঙে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সারা দেশের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহনের সাপ্লাই চেইন। এতে পণ্যমূল্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন ব্যবসায়ী ও বন্দর স্টেকহোল্ডার সূত্র সমূহ।
নৌযান ধর্মঘটের ফলে চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্রপথে আসা খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ জরুরি পণ্যের সাপ্লাই চেইন গত দুদিনে সম্পূর্ণ অচলাবস্থার মুখে পড়েছে। এর ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে নৌবন্দর থেকে সড়ক পথের পণ্য পরিবহনও। শত শত ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান সদরঘাট, বাংলাবাজারঘাটসহ নানা স্থানে দুদিন ধরে অলস সময় কাটাচ্ছে।
শত শত লাইটারেজ জাহাজ নানা স্থানে নোঙর করে আছে। বহির্নোঙরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে অন্তত ২০টি বিদেশি মাদার ভেসেল। ফলে প্রতিদিন প্রতিটি জাহাজের ফিক্সড অপারেটিং কস্ট (এফওসি) বা দৈনিক খরচ পণ্য পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বলে জানান একটি শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সূত্র।
এদিকে লাইটার জাহাজ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের তথ্য অনুযায়ী, নৌযান শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে দেশের ৪৫টি ঘাটে ৭৩৮টি জাহাজে আটকা পড়েছে প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জাহাজ আটকা পড়েছে যশোরের নোয়াপাড়া ঘাট, নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ঘাট, মেঘনা ঘাট ও সিরাজগঞ্জের ঘোড়াশাল ঘাটে। কর্ণফুলী নদী এবং এখানকার ১৬টি ঘাটেও বিপুল সংখ্যক লাইটারেজ জাহাজ পণ্য নিয়ে অলস ভাসছে।
এছাড়া বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ৩৫টি জাহাজে দেশের বন্দরে নেওয়ার জন্য বোঝাই করা হয়েছিল ৫০ হাজার টনের বেশি পণ্য। আমদানি পণ্য সময়মতো খালাস না হওয়ায় জাহাজগুলো নির্ধারিত শিডিউল অনুসারে ছেড়ে যেতে পারছে না। আবার বন্দরের বহির্নোঙরে ২০টি মাদার ভেসেলে গতকাল পর্যন্ত কমপক্ষে ৫ লাখ টন পণ্য খালাসের অপেক্ষায় ছিল।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বন্দর বিষয়ক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন ইত্তেফাককে বলেন, এই নৌযান ধর্মঘটের কারণে দেশ ইতিমধ্যে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ধরনের সমস্যা হলে মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজের মালিকরা আমাদের মতো দেশে পণ্য পরিবহণে জাহাজের ভাড়া বেশি চেয়ে থাকে। ফলে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এই সময় বন্দরে সীমিত সংখ্যক লাইটারেজ জাহাজ থাকায় ধর্মঘট পরবর্তী সময়ে সেগুলোর সংস্থানে অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়তেই থাকে। শিল্পের কাঁচামাল এবং আটকে পড়া খাদ্যপণ্যের ওপর ডেমারেজ চার্জ আরোপিত হয়। সেই বাড়তি খরচ বর্তাবে আমদানি-রপ্তানিকারকের ওপর। ফলে তারা সেই ক্ষতি পোষাতে পণ্যের দাম বাড়াবে। যার চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে ভোক্তা সাধারণের ওপর।
বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন চট্টগ্রামের সভাপতি মিজানুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে টেলিফোনে ইত্তেফাককে বলেন, নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন ও সহযোগী সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। তারা সেই মুহূর্তে ডিজি শিপিং কমডোর মোহাম্মদ মাকসুদ আলমের মিটিংয়ে আসার অপেক্ষায় ছিলেন।
স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ জানান, নৌশ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও মেঘনা নদীতে লাইটার জাহাজের চলাচল বন্ধ আছে। নদীর বিভিন্ন স্থানে জাহাজগুলো নোঙর করে রাখা হয়েছে।
অভয়নগর (যশোর) সংবাদদাতা জানান, যশোরের অভয়নগর উপজেলার নৌযানশ্রমিকেরা কর্মবিরতি পালন করায় নৌযান থেকে সকল প্রকার পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ বন্ধ থাকায় নওয়াপাড়ায় ভৈরব নদে সাড়ে চার শতাধিক পণ্যবোঝাই নৌযান অলস পড়ে আছে। ফলে দ্বিতীয় দিনের মতো অচল হয়ে পড়ে নওয়াপাড়া নদীবন্দর।
সর্বশেষ খবর : মেঘনা নদীতে জাহাজে সাতজনকে খুনের ঘটনার বিচার ও নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে চলা নৌযান শ্রমিক ধর্মঘট অবশেষে স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল শনিবার রাত সোয়া ৯টার দিকে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুরোধে কর্মবিরতি স্থগিত করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ নৌযান ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম।

