l মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম
নাট্যাভিনেতা মি. প্রিন্সের আমন্ত্রণে ছুটছি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা। পৌঁছাই রাত সাড়ে দশটায় হাজীগঞ্জ বাজার। আকাশ ভেঙে তখন ঝরছিল ঝুম বৃষ্টি। কোনো মতে গাড়ি থেকে নেমেই ঢুকলাম খাবার হোটেলে। আগে থেকেই আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন মি. প্রিন্স। কুশল বিনিময় শেষে পেট পুরে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। খেয়েদেয়ে গাড়ি স্টার্ট। যাচ্ছি এবার সমনভাগ। রাত সাড়ে বারোটায় পৌঁছাই দক্ষিণ সমনভাগ সরকারি চা বাগানের সদর দরজায়। নিরাপত্তা রক্ষী বেশ কিছুটা সময় নিলেন। অতঃপর ভিতরে যাওয়ার অনুমতি মিলল। ঠাঁই হলো অফিসার্স কোয়ার্টারে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পুচকে দুইজন গাইড আর সঙ্গে কিছু চিড়া, মুড়ি, গুড় নিয়ে ছুটলাম এবার বুনো জঙ্গলে ঘেরা পাথারিয়া পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। আজ সারাদিনের জন্য দু পাই সম্বল। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত দক্ষিণ সমনভাগ চা বাগানের ভিতর দিয়ে কাঁচা চা পাতার ঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে ঢুকে যাই ঝোপঝাড় জঙ্গলে। পাথারিয়া পাহাড় নামটাই কেমন যেন অদ্ভুত। এই পাহাড়ের পূর্ব নাম ছিল আদম আইল। প্রায় এক হাজার বছর আগে এই অঞ্চলটি গভীর অরণ্য ছিল। এখানে বসবাস করত পাথরি নামক নাগা জনগোষ্ঠীর একটি উপ-শাখার অধিবাসীগণ। কালক্রমে বসবাসকারীদের নামানুসারে এই অঞ্চলের নাম পাথারিয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। আদম আইলের প্রাকৃতিক মুগ্ধতার পরশে ঝোপঝাড়ে ফুটে থাকা নাম না জানা নানা রঙের ফুলের বুনো গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা রিমঝিম ছন্দের আবেশ সঙ্গী করে, কিছুটা চড়াই-উতরাইয়ের পর প্রথমেই দেখতে পাই ঝুড়ঝুড়ি ঝরনা। এর পর আবারও হাঁটা। একটা সময় চোখ আটকায় ওই দূর পাহাড়ে, প্রথমে বুঝতে ভুল হয় তার পর জানতে পারি হাকালুকি হাওরের পানি। ওহ্ সেই মোহনীয় দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়া সত্যিই কঠিন। বেশ খানিকটা সময় হঠাত্ দেখা অপার্থিব সৌর্ন্দয চোখে ধারণ করে এগিয়ে যাই। অতঃপর পেয়ে যাই বান্দর ডুবা কুম। বান্দর ডুবায় ডুবানোর সুযোগ নেই। এর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দুই নয়ন আর মন দিয়ে দেখতে দেখতে হাইকিং চলে দেহের সাধ্য অনুসারে।
এরপর হাইকিং-ট্র্যাকিং চলে বেশ কিছুটা সময়। অতঃপর খানিকটা সময় ঝিরির পানিতে ট্রেইল শেষে দেখা মিলল পাইথুং ঝরনার। প্রথম দেখায় নজর কেড়ে নেয় আমার। ওয়াও! পুরো পরিবেশটাই বুনো। পানি নির্গমনের ধারাবাহিকতায় অনেকটা বান্দরবানের ত্লাবংয়ের মতো। পানির অমিয় ধারায় সামনে হয়েছে গভীর বেসিন। বহুদিন পর ঝরনার গা থেকে সেই রকম হিম হিম পানিতে দিয়েছি বেশ কয়েকবার লাফ। প্রায় ঘণ্টা খানেক লম্ফঝম্ফ শেষে ছুটি পুছুমের পানে। সঙ্গে ছিল শুকনো খাবার, তাই চিন্তা ছিল না। তবে এবার পানযোগ্য পানির জন্য হয়েছে হাহাকার। জোহরের নামাজের জন্য কিছুটা সময় বিরতি দিয়ে আবারও হাঁটা। কিসমত ভালো, এবার অলসতা না করে সাদাপাতার মিশ্রণে নারকেল তৈল সারা গায়ে মেখেছিলাম। তা না হলে জোঁকের অত্যাচারে দেহের কী হতো তা আল্লাহই মালুম। উঁচু-নিচু পথটাকে বন্ধু ভেবে ঝোপঝাড়ে হয়ে থাকা আবাত্তি জাম্বুরা চিবিয়ে পড়ন্ত দুপুরে নেমে যাই সোজা বড় বড় বোল্ডারে ভরা ঝিরির পানিতে। দিন শেষে আসল মজা যেন এই পথটাতেই। একটু এদিক সেদিক হলে সোজা সিআরপি। সাবধানে এগোই, এভাবেই চলে অনেকটা সময়। এর পরই দেখা মিলে ইয়া উঁচু থেকে গড়িয়ে নামা পুছুম জলের। আনন্দে উচ্ছ্বাসে যখন সবাই দিশেহারা, তখনই আকাশ জুড়ে দেয় মায়াকান্না। মুহূর্তের মধ্যে পুছুম ঝরনার ভাবসাব বদলে যায়। শুরু হয় ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাড যাকে বলে খাঁটি বাংলায় হরকা বান। অপ্রত্যাশিত এমন রূপের পসরা দেখে যখন বিমোহিত সবাই, তখনই ফ্যাকরা বাজায় গাইড মহোদয়। তাদের সাবধান বাণী আমলে নিয়ে ভাগি পাহাড় বেয়ে। যেটা বাকি ছিল দেখার তারও দেখা পেয়েছে আমাদের কেউ কেউ। সেটা হলো পাথারিয়া পাহাড়ের জঙ্গলে বিচরণ করা কালনাগ। ভয় পাবে তো দূরে থাক, উল্টো তাঁরা বেশ পুলকিত। আর যাঁরা না দেখতে পেল তাঁদের ভাবখানা এমন, সারা দিনের ট্র্যাকিংটাই যেন মাঠে মারা গেল। এর পরেও কথা থেকে যায়, দলের সবার জন্যই যেন পুছুম তার সৌন্দর্যের নির্যাস দিয়ে সারা দিনের ক্লান্তি পুষিয়ে দিয়েছে।
যো গা যো গ
ঢাকা থেকে মৌলভী বাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ সমন ভাগ। মাইক্রো নিয়ে গেলে সবচাইতে সুবিধা বেশি হবে। আরা যাঁরা বাসে যেতে চান, তাঁরা সায়েদাবাদ হতে বড়লেখার বাসে যাবেন। ভাড়া ৫০০ টাকা ও বড়লেখা হতে সিএনজি যোগে সমনভাগ পর্যন্ত ভাড়া ৩৫০ টাকা। এছাড়া ট্রেনেও যাওয়া যাবে কুলাউড়া পর্যন্ত। ভাড়া ২৭০-৩৫০ টাকা।
