৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন যশোরের পাঁচ তারকাবিশিষ্ট ১৬ তলা অভিজাত হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে আগুনের ঘটনায় ২৪ জনের প্রাণহানিতে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়।
জেলা শহরের বহুতল ভবনগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের আগুন নেভানোর সক্ষমতার প্রশ্নটি আবারও চলে আসে সামনে। জাবিরের আগুন নেভানোর জন্য ৬৪ কিলোমিটার দূরের বিভাগীয় শহর খুলনা থেকে আনতে হয় টার্ন টেবল লেডার বা টিটিএল। আর এমন অগ্নিনির্বাপণ ঝুঁকির মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন গুরুত্বপূর্ণ এই জেলা।
অপরিকল্পিত নগরায়ন ও সুউচ্চ ভবন গড়ে ওঠা, সরু রাস্তা, পুকুর-জলাশয় ভরাট হওয়ায় পানির উৎস না থাকা এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার সামগ্রির অপর্যাপ্ততা এই শহরের ঝুঁকির মাত্রাকে বাড়িয়ে তুলেছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সম্প্রতি বৃহত্তর যশোরের আওতাধীন জেলা সদর ফায়ার স্টেশনে টিওঅ্যান্ডই প্রাধিকারভুক্ত বিশেষ ধরনের অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার গাড়ি/পাম্পের চাহিদা পাঠিয়েছে। চাহিদাপত্রের ঐ চিঠিতে বলা হয়: 'বৃহত্তর যশোর জেলায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন যশোর সেনানিবাস, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, যশোর বিমানবন্দর, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, বেনাপোল স্থলবন্দর, মেডিক্যাল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়াও জেলা শহরে বেশকিছু আবাসিক ও বাণিজ্যিক বিদ্যমান বহুতল ভবন, বহুতল আবাসিক হোটেলসহ নির্মাণাধীন বহুতল ভবন, মার্কেট, শপিংমল, পাটকল, পাটগুদামসহ অন্যান্য মিল কল-কারখানা রয়েছে। তাছাড়া যশোরের আওতাধীন ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল জেলাতেও অনুরূপ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, আবাসিক বাণিজ্যিক বহুতল ভবনসহ নির্মাণাধীন ভবন, মার্কেট, শপিংমলসহ অন্যান্য মিল কল- কারখানা বিদ্যমান রয়েছে। এতে করে আওতাধীন এলাকায় অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।' ২৪ অক্টেবর ২০২৪ পাঠানো এই চিঠিতে ইতিপূর্বে ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল ও ২৫ অক্টোবর অনুরূপ চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে হোটেল জাবিরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে এটাও বলা হয়, খুলনা হতে টিটিএল গাড়ির সাহায্য চাওয়া হয় এবং ঐ গাড়ি দ্বারা অগ্নিনির্বাপণের ছাদ হতে একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
যশোর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক ও পরিদর্শন কমিটির সভাপতি দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ভবন নিয়মিত পরিদর্শন করছি এবং করণীয় বিষয়ে অবহিত করছি। পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনেক স্থানেই ফায়ার সেফটি প্ল্যান নেই। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ। আবার কোল্ড স্টোরেজে অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে, দুর্ঘটনায় প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান বা ভবনকে সতর্কীকরণ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গতমাসের পরিদর্শনে শহরের বঙ্গবাজার মার্কেটটিকে ব্যাবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যশোর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সহকারী পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ জানান, এখানে এমন সব বড় বড় ভবন গড়ে উঠেছে যার টপ ফ্লোর বা ওপরের দিকে আগুন লাগলে নেভানোর মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। জাবিরের আগুন লাগার ঘটনা আমাদের বড় উদাহরণ। বিশেষ করে, যশোর বিমানবন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দর এবং সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কসহ বেশ কয়েকটি ১২-১৪ তলা ভবন রয়েছে, যেখানে আগুন নেভানো অত্যন্ত কঠিন। আবার প্রাচীন এয়ারপোর্টের জন্য যে ধরনের ফোম টেন্ডার লাগে, সেটাও এখানে নেই। বহুতল ভবনের আগুন নেভানোর জন্য ৫৬ মিটার টার্ন টেবল লেডার (টিটিএল), উদ্ধার কাজের পরিপূর্ণ কোমিক্যাল টেন্ডার, ফোমটেন্ডার, ইমার্জেন্সি টেন্ডার (ইটি) এবং সাড়ে ৬ হাজার লিটারের বিশেষ পানিবাহী গাড়ি, লাইটিং ইউনিট, টোয়িং ভেহিক্যাল ও পোর্টেবল পাম্পের অপর্যাপ্ততার কথা জানিয়ে চিঠি লিখেছি। এসব পাওয়া গেলে এই জেলাকে আগুনের উদ্ধার কার্যক্রমের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া যাবে।
তিনি উল্লেখ করেন, সামনে অগ্নি মওসুম। আমরা পরিদর্শন কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি সচেতনতা সৃষ্টিতেও কাজ করছি।

