ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও সিএসসি
জীবনবৃত্তির সাধনা ও জীবিকা নির্বাহের তাড়নার অভিপ্রায়ে সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ কর্মপ্রচেষ্টায় নিজেকে সংশ্লিষ্ট করেছে। এরপর থেকে তার ধ্যান, জ্ঞান, সম্পদ, ক্ষমতা, সমৃদ্ধি—সবকিছুই আবর্তিত হয়েছে এই কর্মপ্রচেষ্টার প্রক্ষেপণবিন্দুকে কেন্দ্র করে। এই জগত্-সংসারে প্রাণিকুলের যে কর্মপ্রচেষ্টা তা তার সহজাত প্রবৃত্তির তাড়না মাত্র। কিন্তু জ্ঞান, নৈতিকতা এবং কর্মপ্রেরণার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানুষ প্রাণিজগতের সেই সহজাত প্রবৃত্তির সংকীর্ণগণ্ডিকে অতিক্রম করে মানবসত্তায় উন্নীত হয়েছে। এ কারণেই প্রাণিকুলের কাছে যে কর্মপ্রবৃত্তির তাড়না মাত্র তাই মানুষের কাছে জীবনসাধনার আকাঙ্ক্ষালব্ধ প্রয়াস। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দর্শন ও দূরদর্শিতার অপূর্ব সংমিশ্রণের মাধ্যমে মানুষকে তার কর্মপন্থা নির্বাচন করতে হয়। শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে নয় বরং মানুষ হয়ে ওঠার জন্য কর্মসাধনা করতে হয়। নচেত্ সে জীবন প্রাণিত্বের বন্ধন অতিক্রম করে মনুষ্যত্বলোকে উত্তীর্ণ হতে পারে না।
কর্মবাদের নিয়ম বিশ্বজগতের নিয়ম-শৃঙ্খলার অন্তর্গত। আমাদের চির পরিচিত প্রকৃতির গ্রহ-নক্ষত্র, চন্দ্র-সূর্য সবকিছুই এক অলঙ্ঘনীয় নিয়মে ক্রীয়মাণ হয়ে ছুট চলছে। এ সবকিছু এক নিখুঁত নিয়মে চলছে বলেই ফলস্বরূপ আমাদের পৃথিবী এত সুন্দরভাবে তার জীববৈচিত্র্য নিয়ে টিকে আছে। কিন্তু প্রকৃতির এই নিয়ম-শৃঙ্খলায় যদি সামান্য ব্যত্যয় ঘটে, তাহলে ফলস্বরূপ বিশ্বজগত্ ধ্বংস হয়ে যাবে। অর্থাত্ বিশ্বপ্রকৃতিতে এই কর্মবাদের নিয়ম অনুসারে প্রতিটি কর্মই একটি ফল উত্পাদন করে। এখানে নিয়ম-শৃঙ্খলাপূর্ণ তথা ভালো কাজের ফল ভালো, প্রেমময়, সুশ্রী ও সুন্দর হয় এবং নিয়ম-শৃঙ্খলাবহির্ভূত তথা মন্দ কাজের ফল মন্দ হয়, যা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস বয়ে আনে। কর্মবাদের এই অলঙ্ঘনীয় নিয়ম ব্যক্তিমানুষ, সমাজ ও বিশ্বজীবনকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করে চলছে। কিন্তু প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মানুষের শুধু জীবসত্তাই নয় বরং মানবসত্তার প্রতিও দায়বদ্ধতা রয়েছে। প্রাণিত্বকে টিকিয়ে রাখা তথা জীবনধারণের জন্য মানুষকে প্রতিনিয়ত কর্মপ্রচেষ্টা চালাতে হয়, এ কথা সত্য। কিন্তু প্রাণিত্বই যদি মুখ্য হয়ে ওঠে, তাহলে কর্মপ্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। আসলে মানুষ যখন থেকে একটি সমাজকাঠামো তৈরি করেছে তখন থেকেই ব্যক্তির ক্ষুদ্র কর্মপ্রচেষ্টা বৃহত্তর সমাজের অগ্রগতিতে অসামান্য অবদান রেখে চলছে। এভাবেই শিশুকাল হতে যৌবনপ্রাপ্ত হওয়ার মতোই আমাদের সমাজব্যবস্থা বিকশিত হয়ে বর্তমান অবস্থায় রূপলাভ করেছে। এখানে একজন মানুষের সামান্য কাজও সমাজের বৃহত্তর উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যবহূত হয়। আত্মকেন্দ্রিক ভোগলিপ্সা, স্বার্থপরতা ও সংকীর্ণ মানসপ্রবণতা দ্বারা পরিচালিত কর্ম সমাজের সেই বৃহত্তর উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
নীতি-নৈতিকতা হলো কাজের আত্মা। তা ধর্মেরও অন্যতম বৈশিষ্ট্য বটে। যে ধর্ম নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত তা কখনো ধর্ম হতে পারে না। একটি কাজের ভালো-মন্দ নির্ভর করে কাজটি নীতি-নৈতিকতার সঙ্গে কতটা সম্পর্কযুক্ত তার ওপর ভিত্তি করে। ধরুন একটি কলার খোসা রাস্তায় ফেলে দেওয়া পশ্চিমা দেশের কোনো মানুষের কাছে যতটা নৈতিকতাবিরোধী, আমাদের দেশের মানুষের কাছে ততটা নয়। তাই এই কাজটি পাশ্চাত্যে যতটা মন্দ কাজ বলে বিবেচিত হয় আমাদের কাছে ততটা হয় না। আবার কোন কাজ কতটা নৈতিক বা অনৈতিক তা নির্ভর করে সেই কাজের উদ্দেশ্যের ওপর। ধরুন একজন ব্যক্তিকে টাকা দেওয়া হলো। এ ক্ষেত্রে এই টাকা দেওয়া কাজটির পেছনে বিভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কেউ তা ঘুষ হিসেবে দিতে পারে, কেউ সুদ নেওয়ার জন্য দিতে পারে, কেউ কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে দিতে পারে, কেউ-বা দয়ায় বশবর্তী হয়ে নিছক দান করার উদ্দেশ্যে দিতে পারে। অর্থাত্ কাজের পশ্চাতে নিহিত উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে কাজটি কতটা নৈতিক বা অনৈতিক।
বিখ্যাত বিজ্ঞানী নিউটন বলেছেন, প্রতিটি ক্রিয়ার সমান একটি বিপরীত ক্রিয়া আছে। এই বিষয়টিকে কর্মফলবাদীরা বলে থাকেন ‘প্রতিটি কর্মই একটি ফল উত্পাদন করে।’ এক্ষেত্রে ভালো কাজের ফল ভালো হয় আর মন্দ কাজের ফল মন্দ হয়। কোনো কর্মের ফল যদি সাময়িকভাবে না পাওয়া যায়, তবে তা সুদূর ভবিষ্যতে হলেও পাওয়া যাবে। বিভিন্ন ধর্ম আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলে যে, কর্মের ফল মর্ত্যজগতে না পাওয়া গেলেও পারলৌকিক জগতে পাওয়া যাবে। বিষয়টিকে বস্তুবাদী বা ভাববাদী যেভাবে দেখা হোক না কেন, কর্মফল যে এই বস্তুজগতে আছে তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই কর্মফলের অলঙ্ঘনীয় নীতি মেনে কোনো ফল লাভের প্রত্যাশা না করে আমাদের নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাওয়া উচিত। কারণ ফল লাভের আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে লোভ-লালসা, ভোগলিপ্সা, আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপরতা ও দাম্ভিকতার জন্ম দেয়। সঠিকভাবে কর্মসাধনা করলে এমনিতেই ভালো ফল লাভ করা যাবে। কিন্তু ফল লাভ করার প্রবণতা যখন কর্মসাধনাকে ছাড়িয়ে যায় তখন কর্মসাধনা তার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে। বস্তুতপক্ষে মানুষ তার জীববৃত্তি তথা ভোগলিপ্সার, আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতার কারণে যখন কোনো কর্ম না করে ফল লাভ করতে চায়, তখনই সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং অন্যায়ের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমাদের বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থাসহ সকল ক্ষেত্রেই যে বিশৃঙ্খলা, নীতি ও নৈতিকতার যে অবক্ষয় তার মূলীভূত কারণ নিহিত রয়েছে এই ফলভোগী মনোভাবের মধ্যেই। এর কারণ অবশ্য সুস্পষ্ট। আবহমান কাল থেকেই বাঙালির কর্মপ্রচেষ্টার মূল চালিকাশক্তি বিকশিত হয়েছে জীবনবাদী ভাবধারাকে কেন্দ্র করে। অর্থাত্ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বস্তুতান্ত্রিক ভোগলোলুপতা ও স্বচ্ছন্দকামিতার প্রবণতাই বাঙালিকে আবহমান কাল থেকে কর্মপ্রেরণায় উত্সাহ জুগিয়েছে। একদিকে দীর্ঘকাল বিদেশি শাসক গোষ্ঠীর শোষণ-নির্যাতন ও রাজনৈতিক পালাবদলের দরুণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, অন্যদিকে কর্মবিমুখ হয়েও ভোগলিপ্সা বাঙালির ফলভোগী মানসপ্রবণতার মূলীভূত কারণ। এ কারণেই আমাদের অধিকাংশ পিতা-মাতা সন্তানকে লেখাপড়ায় যে কোনো মূল্যে প্রথম হিসেবে দেখতে চায়, অনেক সময় ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সন্তানের হাতে তুলে দেয়, দুর্নীতি করে সম্পদ উপার্জন করাকে গর্বের বিষয় মনে করে, ঘুষ দিয়ে ঘুষ খেয়ে কার্যসিদ্ধি করার চেষ্টা করে। রাজনীতি করে রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখে, যে কোনো উপায়ে সম্পদ অর্জন করে অর্থ-বিত্তকে অহংকারের সামগ্রীরূপে স্বগৌরবে প্রচার করে। এই অবস্থা আমাদের এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
চাণক্য কোনো কাজ করার পূর্বে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করতে বলেছেন। তা হলো—কাজটি কেন করব, কাজটি কীভাবে করব এবং এর ফল কী? সত্যিকার অর্থে প্রতিটি কাজ করার পূর্বে তার ফলের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করা প্রয়োজন। আমরা যদি সকলে মহত্ উদ্দেশ্য নিয়ে দায়িত্বের সঙ্গে নৈতিকতাপূর্ণ সত্কর্ম সম্পাদন করে যাই, তাহলে আমাদের সমাজ-জীবন আরো সুন্দর হয়ে উঠবে।
n লেখক : অধ্যক্ষ, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা।
